নেতাকর্মীদের কঠোর বার্তা দিল বিএনপি

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৩৭ এএম

নেতাকর্মীদের বাড়াবাড়ি দমনে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। দলটির শীর্ষ নেতারা মনে করছেন, এখনই লাগাম টানা না গেলে মানুষের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। তাই যখন যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসবে, ঘটনা বিবেচনায় তাকে তখনই দল থেকে সতর্ক করা, কারণ দর্শানোর নোটিস, পদ স্থগিত কিংবা বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সারা দেশে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। এর পরপরই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিএনপির শীর্ষ নেতারা বলছেন।

দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাদের এসব কর্মকা- থেকে বিরত থাকতে সব সাংগঠনিক জেলা, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সব পর্যায়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের শুরু থেকে গণ-অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত সময়ে বিএনপির আহত ও নিহত নেতাকর্মীদের মামলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহ থেকেই দেশের ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ক্ষতিগ্রস্তরা এ মামলা করবে বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছুসংখ্যক ব্যক্তি ছাত্র-জনতার বিজয়কে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত করছে। তারা বিভিন্ন জায়গায় গোলযোগ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপরে অন্যায়ভাবে হামলার চেষ্টা করছে। আমরা পরিষ্কার ভাষায় বলতে চাই, বিএনপির নেতাকর্মীরা কোনোভাবে এসবের সঙ্গে জড়িত নয়। উপরন্তু বিএনপি চেষ্টা করছে এগুলো বন্ধ করতে।’

দলটির সিনিয়র একাধিক নেতা জানান, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ভিডিও বার্তায় এবং মহাসচিব বিভিন্ন সভা-সমাবেশ থেকে বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটে না জড়ানোর নির্দেশনা দেন। তারেক রহমান এ-ও বলেন, দলের কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিন। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির পক্ষ থেকে মাইকিংও করা হয়। কিন্তু এরপর সারা দেশে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, দখল ও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।

সূত্রগুলো বলছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, সেগুনবাগিচা, খিলগাঁও, মিরপুর, ঢাকার বাইরে সাভার, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট দখল করে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সাইনবোর্ড ঝোলানোর খবর যায় কেন্দ্রে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার সিটি করপোরেশনের উদ্ধার করা আলোচিত সাদেক অ্যাগ্রোর স্থানে অবৈধভাবে দুটি ঘর তুলে সেখানে বিএনপির সাইনবোর্ড লাগানো হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৬ আগস্ট তারেক রহমানের নির্দেশে ঘরগুলো ভেঙে দিয়ে আসেন দলের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্য সচিব আমিনুল হক। রাজধানীর ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির রাইসুল ইসলাম চন্দন সেগুনবাগিচায় বাউল শিল্পীর একটি ঘর দখল করে নেন। দক্ষিণ বিএনপির নেতাদের জানালেও তারা এর সুরাহা করতে পারেননি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের রাতেই বরিশাল শহরে পুকুর দখলের অভিযোগ ওঠে দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরীনের বিরুদ্ধে। পরের দিনই তার পদ স্থগিত করা হয়। বুধবার ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে বিহারি ক্যাম্পের কাছেই রাস্তা এবং ফুটপাতের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা শ্রমিক লীগের কার্যালয় এখন মোহাম্মদপুর থানা যুবদলের দখলে, সাভারের হেমায়েতপুরে মূল সড়ক, সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ডের কাছে দোকানগুলোতে চাঁদা আদায় এমন কয়েকশ অভিযোগ রয়েছে।

বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপির অন্তত ২০ জনের মতো নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর মধ্যে যুবদলের ৫০ জনের বেশি এবং ছাত্রদলের ১৫ জনের মতো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দল, শ্রমিক দলের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আর বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের ৫০ জনের অধিক নেতাকর্মীকে কারণ দর্শনানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে এবং সত্যতা পাওয়া যাচ্ছে; তাদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে অন্যদেরও বার্তা দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠবে এবং সত্যতা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

তবে দলটির স্থায়ী কমিটির এক নেতা জানান, বিএনপির নামধারী কিছু সুবিধাবাদী লোক বিভিন্ন জায়গায় দখল, চাঁদাবাজিতে মেতে উঠেছিল। যার বেশ কিছু খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছে। এগুলো যেন আর আগে না বাড়ে এ জন্য শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, গুরুতর অভিযোগ মিললে সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার করা হয়। দলের শৃঙ্খলা ঠিক রাখতেই এ নির্দেশনা জরুরি ছিল।

ওই নেতা আরও বলেন, বিএনপি একটি বিশাল দল। এদের মধ্যে কেউ লোভে পড়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতেও পারে। আবার দলের সব স্তরের নেতাকর্মী ১৬-১৭ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের নানা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাই গুরুতর অভিযোগ না এলে সরাসরি বহিষ্কার না করে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়ে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

এদিকে গত রবিবার রাতে দলের শীর্ষ থেকে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে তারেক রহমান। এসব বৈঠকে আওয়ামী সরকারের সময় আহত-নিহত, নির্যাতিত নেতাদের মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিটি ওয়ার্ড বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে মামলা করবে। ইতিমধ্যে মামলা করেছেন দলটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিরোধীদলীয় সাবেক চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক। গতকাল রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় এই হত্যা মামলা করেন তিনি। গত রবিবার কারওয়ান বাজারে ২০১৫ সালে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনের বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় মামলা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত