টানা বৃষ্টি ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো। বন্যায় ভেসেছে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারসহ ১২ জেলা। বন্যার পানিতে লাখ লাখ মানুষের বাড়িঘর-ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ৪৮ লাখ ৬৯ হাজার ২৯৯ জন। আর মারা গেছেন ১৫ জন।
বন্যাকবলিত জেলাগুলোর কোনো কোনো জায়গায় গতকাল পানি কিছুটা কমেছে। আবার কোথাও কোথাও নদীর পানির চাপে বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বানভাসি মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ ও বিভিন্ন সংগঠন। দুর্গত এলাকাগুলোতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হলেও অনেক এলাকায় এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে খবর পাওয়া গেছে। ফলে এসব
এলাকার অসহায় মানুষরা চরম উদ্বেগ, অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে।
বন্যা ছাড়াও অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ২৪টি জেলার ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। এতে সরকারের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯২২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। তারা গতকাল বলেছেন, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে আসবে। তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী তিন দিনে বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ নেই।
বন্যা সবচেয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে ফেনীতে। হঠাৎ বন্যায় তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি। মানুষ বাড়ির ছাদে, গাছের ডালে আশ্রয় নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে। যেদিকে চোখ যায় শুধু পানি আর হাহাকার। ফেনী সদর, পরশুরাম, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, দাগনভূঞাসহ প্রায় সব উপজেলায় এখন এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সড়ক ডুবে যাওয়ায় সড়কপথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় ও মোবাইল নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ায় ঠিকভাবে যোগাযোগ সম্ভব হয়ে উঠছে না।
ফেনী, কুমিল্লা, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, লক্ষ্মীপুর ও কক্সবাজার জেলার ৭৭টি উপজেলার ৫৮৯টি ইউনিয়ন/পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে বলে জানিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ১০ লাখ পরিবার। গতকাল সন্ধ্যায় মন্ত্রণালয়ের এক বার্তায় এসব তথ্য জানানো হয়। মন্ত্রণালয় জানায়, বন্যায় গতকাল পর্যন্ত চট্টগ্রামে চার, কুমিল্লায় চার, ফেনীতে এক, নোয়াখালীতে এক, ব্রহ্মণবাড়িয়ায় এক, লক্ষ্মীপুরে এক ও কক্সবাজারে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ২৪টি জেলার ফসলি জমির ক্ষতি হয়েছে। ৩ লাখ ৩৮ হাজার ৯২২ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে। পানি সরে গেলে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ ও কৃষি উপকরণ সহায়তা দেওয়া হবে বলে গতকাল জানিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার পাশ ঘেঁষে রয়েছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। রাজ্যটি থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এ উপজেলাটি। এ ছাড়া চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া কাঁকড়ি ও ডাকাতিয়া নদীর বাঁধ ভেঙে শতভাগ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বর্তমানে উপজেলাটির সব ফসলি জমি পানির নিচে। একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে দেশের ২৪টি জেলায়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বন্যায় মুন্সীগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
নাঙ্গলকোটের সাতবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সামছুল আলম বলেন, ‘আমাদের পুরো গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বেশিরভাগ বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করেছে। ফসলসহ সবকিছু তলিয়ে গেছে। বন্যা আগেও দেখেছি, তবে এমন বন্যা কখনো দেখিনি।’
বন্যাকবলিত জেলায় কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব দপ্তর, সংস্থা বা কৃষিবিষয়ক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। নিজ নিজ স্থানে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কৃষকের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শিগগিরই কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়া হবে। এ ছাড়া আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যাতে নতুন করে বীজতলা তৈরি করা যায়, সেজন্য বিকল্প জেলায় আমন বীজতলা তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ক্ষতি হওয়া ফসলের মধ্যে আউশ আবাদ, রোপা আমন, বোনা আমন, শাকসবজি, আদা, হলুদ, আখ, পান ও কলা ক্ষতি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে রোপা আমন আবাদ।
কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান বলেন, ‘অপ্রত্যাশিত এ বন্যা মোকাবিলায় কৃষকদের সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হবে। পানি নেমে গেলেই পরিপূর্ণ ক্ষতি নির্ধারণ করে কৃষকের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া উপকরণ সহায়তা দেওয়া হবে। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে বিকল্প সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
সরকারের দুই দপ্তরের দুই রকম তথ্য : বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি কমে আসবে। গতকাল সকাল ৯টায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান স্বাক্ষরিত নদনদীর পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসে এ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলেছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। এ সময় এ অঞ্চলের ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার মুহুরী, ফেনী, গোমতী, হালদা ইত্যাদি নদীগুলোর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানির সমতল স্থিতিশীল আছে, যা আগামী ২৪ ঘণ্টায় কমতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়।
একনজরে নদনদীর পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসে বলা হয়, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি সমতল ধীরগতিতে হ্রাস পাচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পূর্বাঞ্চলীয় কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও ফেনী জেলার ভারতীয় ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী অঞ্চলে এবং ত্রিপুরা প্রদেশের অভ্যন্তরীণ অববাহিকাগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়নি এবং উজানের নদনদীর পানি সমতল হ্রাস পাওয়া শুরু হয়েছে। ফলে বর্তমানে মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ফেনী, কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম জেলার নিম্নাঞ্চলের বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির ধীরগতিতে উন্নতি হচ্ছে।
তবে আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী তিন দিনে এ বৃষ্টি কমে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। কিছু এলাকায় মাঝারি থেকে ভারী ও অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে অধিদপ্তর। গতকাল এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘আগামী ৭২ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের যে পরিস্থিতি বিশেষ করে পূর্বাঞ্চল বা উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং দেশের ভূখণ্ডের ভেতরে যে বৃষ্টিপাত, সেটা উন্নত হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা নেই। সোমবারের পর দেশে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে আসবে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ফেনী, কুমিল্লাসহ পাঁচ জেলায় ধীরগতিতে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার তথ্য দিলেও বন্যা আক্রান্ত জেলাগুলোতেও বৃষ্টি কমার সম্ভাবনা দেখছেন না আবহওয়াবিদ মনোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘এখন যেরকম হচ্ছে সেরকমই হবে। আমরা আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে বলেছিলাম এসব এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।’
আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকাল ৯টা থেকে রংপুর, রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে।
পানির নিচে ফেনী : স্মরণকালের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজানের পানির তোড়ে ফেনীর ফুলগাজী-পরশুরামের পর প্লাবিত হয়েছে ফেনী শহর। গত দুদিন ধরে ফেনী শহর পানির নিচে। পুরো শহরের বাসাবাড়ি, সরকারি অফিস পানিতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে পুরো ফেনী সদর উপজেলা পানির নিচে রয়েছে। উজানের পানির চাপ কিছুতেই কমছে না। উৎকণ্ঠা আর কান্নায় স্বজনের খোঁজে প্রিয়জনের শুধু হাহাকার। বিদ্যুৎ, পানি, মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ থাকায় মানবিক সংকট দীর্ঘ হচ্ছে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। মহাসড়কের ফেনী অংশে কোমরসমান পানি। ফেনী শহরের বেশিরভাগ সড়ক, ব্যবসা-বাণিজ্য, বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পাঠানবাড়ি, পেট্রোবাংলা, পূর্ব উকিলপাড়া, পশ্চিম উকিলপাড়া, রামপুর, মাস্টারপাড়া, টাং রোড, পাঁচগাছিয়া এলাকার বাসাবাড়ি কমপক্ষে ১৫ ফুট পানির নিচে রয়েছে। উজানের পানির চাপ বেড়েই চলেছে। মানুষ জীবন বাঁচানোর জন্য আকুল আবেদন করছে। স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য হওয়ায় মানুষের হাহাকার থামছে না।
নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়া ফেনী সদরের লালপোল এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, ‘রাতে দেখি একতলা দালান বাড়ির খাটে পানি উঠে গেছে। কিছুই আনতে পারিনি। বাচ্চাদের নিয়ে কোনোরকম জান নিয়ে বেঁচে এসেছি। হাঁস-মুরগি, টাকা-পয়সা সব ভেসে গেছে।’
ফেনী সদর তলিয়ে পানি ছুটছে সোনাগাজীর দিকে আর নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। দুর্গত মানুষের মধ্যে শুধু কান্না, উৎকণ্ঠা আর হাহাকার। কে কোথায় যাবে। অনেকে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় আশ্রয় নিয়েছে। কিছু মানুষ আত্মীয়স্বজনের বাসাবাড়িতে উঠেছেন। তবে শিশু, বৃদ্ধ আর অসুস্থ রোগীরা বেশি বিপাকে পড়েছেন।
গতকাল বিকেল ৫টার দিকে সোনাগাজী-ফেনী সড়কের ওপর দিয়ে পানি তীব্র বেগে উত্তরের মঙ্গলকান্দি, চরদরবেশ, বগাদানা, মজলিশপুর ইউনিয়নের দিকে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কোথাও দেখা মেলেনি। তবে বিপুলসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক নিজেদের উদ্যোগে দুর্গত মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। স্বেচ্ছাসেবকরা নৌকায় দুর্গত মানুষদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিচ্ছেন, বিতরণ করছেন শুকনো খাবার।
গোমতীর বাঁধ ভেঙে ডুবল বুড়িচং : ভারত থেকে হু হু করে নেমে আসা পানি ও কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ভেঙে গেছে গোমতী নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ। বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ষোলনল ইউনিয়নের বুড়বুড়িয়া গ্রামের কাছে গোমতী নদীর বাঁধটি ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে। এরপর গতকাল বেলা ৩টার মধ্যে পুরো বুড়িচং উপজেলা গোমতীর পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। হঠাৎ নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিশাহারা হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বুড়িচং উপজেলার ৯টি ইউপি প্লাবিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাহিদা আক্তার। ১ লাখ ২০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খোলা হয়েছে ৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র। তার মধ্যে চারটিতে আবার পানি ঢুকে গেছে। যেভাবে তীব্র বেগে পানি বুড়িচংয়ে ঢুকছে, এতে দ্রুতই পাশের ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা থেকে শুরু করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবাও প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে খাবার সংকটে শিশু-বৃদ্ধসহ বিপাকে পড়েছে মানুষজন। গতকাল বুড়িচং উপজেলার মহিষমারা উচ্চ বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে গতকাল সকাল পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মানুষ আশ্রয় নেয়। আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে সেখানে কেউই খাবার ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে যায়নি। যে কারণে ২০ জনের বেশি শিশু ও ১০ জনের বেশি বৃদ্ধকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন আশ্রয়গ্রহণকারীরা। শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক রশিদ আহমেদ বলেন, ‘খাবার না থাকার বিষয়টি আমরা আমাদের স্বেচ্ছাসেবীদের জানিয়েছি। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত, তারাও বিপদে আছে। এখানকার প্রায় ৫০০ মানুষ না খেয়ে আছে। শিশুরা কান্না করছে। বের হওয়ার অবস্থাও নেই। কারণ বিদ্যালয়ের নিচতলা পানিতে ডুবে গেছে।’
মিরসরাইয়ে পরিস্থিতির অবনতি, উন্নতি ফটিকছড়িতে : চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গতকাল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে আরও তিন ইউনিয়ন। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত তিন লাখ মানুষ। রয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র থাকলেও আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারছে না বেশিরভাগ মানুষ। বেশিরভাগ এলাকার বাড়িঘর পানির নিতে তলিয়ে গেছে। কিছু কিছু জায়গার একতলার ছাদে আশ্রয় নিয়েছে মানুষ। তবে দেখা দিয়েছে নিরাপদ পানি ও খাবার সংকট।
তবে জেলার ফটিকছড়িতে বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। বন্যায় এখন পর্যন্ত এক শিশুর মৃত্যু এবং নিখোঁজ রয়েছে দুজন। বৃহস্পতিবার রাতটি ছিল সবচেয়ে আতঙ্কজনক। পুরো উপজেলায় বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে বাঁচার আকুতি, হাহাকার এবং ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অবশ্য বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক সংগঠনের সহযোগিতায় পরিস্থিতির ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধার তৎপরতায় ভূমিকা রাখছে। জেলার হাটহাজারীতে ১৪ ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার দুই লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
হবিগঞ্জে পানি কিছুটা কমেছে : হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টায় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চাকমাঘাট এলাকায় নদীর উৎসমুখে ব্যারাজের গেট বন্ধ করায় পানি হ্রাস পেয়েছে। জেলার পাঁচটি উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। লস্করপুরের রেল ব্রিজ হুমকির মুখে থাকায় সারা দেশের সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। পানি হ্রাস পাওয়ায় আজ শনিবার থেকে ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশন মাস্টার গৌর প্রসাদ দাস।
বন্যায় বালুচাপা কৃষকের স্বপ্ন : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের ধলাই নদীর ভাঙনে বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়। বন্যায় নদীর পানির সঙ্গে আসা বালুতে চাপা পড়েছে কৃষকদের পাকা ও আধাপাকা ধান। গতকাল সকালে উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়ন এলাকায় গিয়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বললে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে।
কক্সবাজারে তিনজনের মৃত্যু : কক্সবাজারের রামু ও চকরিয়ায় বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রামুতে গত বৃহস্পতিবার বানের পানিতে দুজন ভেসে যাওয়ার পর তাদের মরদেহ ওইদিন রাতেই উদ্ধার করে স্থানীয়রা। এ ছাড়া গতকাল সকালে চকরিয়ায় বানের পানিতে ভেসে গিয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে বৃহস্পতিবার কক্সবাজার-মহেশখালী নৌপথে পারাপারের সময় ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হওয়া যুবকের সন্ধান এখনো মেলেনি।
দীঘিনালায় সেনাবাহিনীর ত্রাণ বিতরণ : খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ত্রাণ সহায়তা ও রান্না করা খাবার বিতরণ করেছে দীঘিনালা সেনা জোন।
রাঙ্গামাটিতে পরিস্থিতির উন্নতি : বৃষ্টি কমে আসায় রাঙ্গামাটিতে বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবার পেলেও যারা বাড়িতে রয়েছে, তাদের কোনো ত্রাণ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাঘাইছড়ির মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের (২৭ বিজিবি) দায়িত্বাধীন এলাকায় ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে মুসলিম ব্লক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুসলিম ব্লক হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা এবং উপজেলা অ্যাডমিনিস্টেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আশ্রয় নেওয়া ৫২০ জন বন্যার্ত পরিবারের সদস্যের মধ্যে শুক্রবার রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
আখাউড়ায় কমতে শুরু করেছে পানি : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি। বৃহস্পতিবার রাত থেকে বৃষ্টি বন্ধ রয়েছে। নতুন করে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বানভাসি মানুষের স্বস্তি মিলেছে। তবে ভারতের ত্রিপুরা থেকে পানি নামা অব্যাহত হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম ব্যুরো এবং সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি
