যৌথ নদী কমিশনে ছোট নদীগুলো নিয়েও কাজ করার আছে

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৪, ০৮:৩১ এএম

ফেনীর বন্যার কারণ হিসেবে অনেকে কুমিল্লার গোমতী নদীর পানিকে দায়ী করছেন। ৩০ বছরেও বন্যা হয়নি এখন কেন বন্যা? ফেনী ও নোয়াখালীতে কেন এমন ভয়াবহ বন্যা হলো? এমন অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে পাঠকের মনে।এসব নিয়ে দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে কথা হয় দেশের অন্যতম পানিবিজ্ঞানী ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আইনুন নিশাতের সঙ্গে। কথা বলেছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ভূঁইয়া নজরুল

দেশ রূপান্তর : দেশের পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ এই বন্যার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত : আমরা লক্ষ করছি যে সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী ও পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে বন্যা হচ্ছে। এই জেলাগুলোর অবস্থান লক্ষ করলে দেখা যায়, এগুলোর পূর্ব দিকে ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলের অবস্থান। এখন এই পাহাড়ি এলাকায় যখন হঠাৎ করে অতিবৃষ্টি হবে তখন বন্যা না হওয়াটাই অস্বাভাবিক।

দেশ রূপান্তর : তাহলে কি আপনি মনে করছেন হঠাৎ করে অতিবৃষ্টির কারণে এই বন্যা?

ড. আইনুন নিশাত : হঠাৎ করে শব্দটা পুরোপুরি সঠিক নয়। কোনো এলাকায় যখন ভারী বা অতিভারী বৃষ্টি হবে আবহাওয়া অধিদপ্তর আগে থেকে পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। আমরা যদি ভারতের দিকে দৃষ্টি দিই তাহলে দেখব নয়াদিল্লিতে যখন অরেঞ্জ কালারের বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তখন ত্রিপুরায় দেওয়া হয়েছে রেড কালার। অর্থাৎ, বৃষ্টিপাতের ধরন বিবেচনায় কিন্তু তারা আগে থেকেই একটা পূর্বাভাস দিয়ে রেখেছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসেও কিন্তু বলেছে দেশের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ভারী বৃষ্টিপাত হবে। আমার জানা মতে, ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে গঠিত যৌথ নদী কমিশনের চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যের আদান-প্রদান রয়েছে। তাই ভারী বৃষ্টিপাত হঠাৎ হয়েছে তা শতভাগ বলা যাবে না।

দেশ রূপান্তর : শুধু কি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসের সঙ্গেই এই বন্যার সম্পর্ক?

ড. আইনুন নিশাত : বৃষ্টিপাত হলো বন্যার একটি প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ভারত থেকে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ^রী, সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন, মনু, খোয়াই, তিতাস, গোমতী, ফেনী ও মুহুরীসহ যেসব নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে সেগুলোর পানিপ্রবাহ। এখন উজানে এসব নদীর পানি বেড়ে গেলে কিংবা নদীর কোন পর্যায় পর্যন্ত পানি এসেছে তা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ ও পূর্বাভাস কেন্দ্রের জানার কথা। যৌথ নদী কমিশনের আওতায় উভয় দেশের মধ্যে নদীর পানির উপাত্ত আদান-প্রদানের চুক্তি বলবৎ রয়েছে। আর সেই অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের ওয়েবসাইটে বন্যার একটি পূর্বাভাসও দিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের পূর্বাভাসটি ওয়েবসাইটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই পূর্বাভাস জোনভিত্তিক কালার কোডের মাধ্যমে জনবান্ধব করে প্রচার করলে সাধারণ মানুষ জানতে পারবে।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু ফেনীতে যে আকস্মিক বন্যা হচ্ছে এই বন্যা কি গোমতী নদীর উজানে থাকা ডম্বুর ড্যামের গেইট খুলে দেওয়ার কারণে?

আইনুন নিশাত : এখানে দুই এলাকার দুটি পৃথক পানি প্রবহমান ব্যবস্থা রয়েছে। কুমিল্লার গোমতী নদীর পানি কখনো ফেনীতে যাবে না। ডম্বুর গেইট বাংলাদেশ ভারত সীমান্ত থেকে ১২০ কিলোমিটার উজানে। আর তা খুলে দিলে গোমতী নদীতে পানি বৃদ্ধি পাবে। এতে গোমতীর অববাহিকা অঞ্চল কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার অংশবিশেষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গোমতী দিয়ে পানি মেঘনায় গিয়ে মিলিত হয়ে থাকে। এই পানি কখনোই ফেনীর দিকে যাবে না। তাই ডম্বুরের গেইট খুলে দেওয়া বা না দেওয়ার সঙ্গে ফেনীর বন্যার কোনো সম্পর্ক নেই।

দেশ রূপান্তর : তাহলে ফেনী ও নোয়াখালীসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা কেন হচ্ছে?

আইনুন নিশাত : ওই যে প্রথমেই বলেছি এসব এলাকার পূর্ব দিকের পাহাড়ি এলাকাগুলোতে কম সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত হয়েছে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ এলাকা ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লায়ও প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। উভয় এলাকার বৃষ্টিপাতের পানি প্রবলবেগে পাহাড়ি ঢল আকারে ভাটির দিকে (সাগরের দিকে) নেমে এসেছে। আর এতেই ফেনীতে ব্যাপক বন্যা। এই এলাকার মুহুরী ও ফেনী নদী দিয়ে পানি বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিলিত হয়ে থাকে। পূর্ব দিকের পাহাড়ি এলাকা এবং আমাদের ওপারে ত্রিপুরা এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই এসব এলাকার বন্যা কমে যাবে।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু কুমিল্লার গোমতী নদীতে প্রায় ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পানি প্রবাহিত হচ্ছে। ভারত এই নদীর উজানে ড¤ু^র বাঁধের গেইট খুলে দেওয়ার কারণে এই অতিরিক্ত পানি এ বিষয়টি কি সঠিক?

আইনুন নিশাত : প্রথমেই আমি ড্যাম ও বাঁধ শব্দ দুটি ক্লিয়ার করি। আপনারা মিডিয়ার লোকজন এই ড্যাম ও বাঁধ গুলিয়ে ফেলেন। ড্যাম ও বাঁধ না চিনলে পুরো বিষয়টি ভুলভাবে প্রকাশিত হবে। নদীর উভয় তীরে নদীর সমান্তরালে বা পাশে নদীর পানি লোকালয়ে যাতে প্রবেশ করতে না পারে সেজন্য যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হয় তা হলো বাঁধ। আমাদের অনেক নদীর উভয় তীরে এমন বাঁধ রয়েছে। আর ড্যাম হলো নদীর চলাচলের মাঝখানে আড়াআড়িভাবে ব্যারিকেড দিয়ে পানি আটকে দেওয়া। আর এই ড্যাম দিয়ে পানি চলাচলের জন্য অনেকগুলো গেট থাকে। এই গেটগুলো বন্ধই থাকে। ড্যাম দিয়ে যে জলাধারটি নির্মাণ করা হয় সেই জলাধারে যখন ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত পানি হয়ে যায় তখন ড্যামের গেইট খুলে দিয়ে অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া হয়।

উদাহরণ স্বরূপ, যদি কাপ্তাই ড্যামের ভেতরে যখন বিপদসীমার ওপরে পানি থাকবে তখন কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দেবে। ১৯৬১ সালের আগে চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী ও চট্টগ্রাম শহরে বন্যা হতো। কাপ্তাই ড্যাম হওয়ার পর আর প্রতি বছর বন্যা হয় না। ড্যাম কর্তৃপক্ষ পানি আটকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। এখন যদি পানি ছেড়ে দেয় তাহলে ভাটিতে বন্যা হবে।

গোমতী নদীর উজানে ড¤ু^র বাঁধের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। কুমিল্লার দুঃখ বলে পরিচিত  ছিল গোমতী। কিন্তু গত ৩০ বছর ধরে কুমিল্লা এলাকার মানুষ বন্যা পায়নি। তাই ড্যাম কিন্তু গত ৩০ বছর আমাদের উপকার করে গেছে। এবার অতিবৃষ্টির কারণে ডম্বুর জলাধারের ভেতরে পানি বেড়ে যাওয়ায় ড্যাম রক্ষার জন্য ভারত গেইট খুলে দিতেই পারে। আর খুলে দেওয়াটাও কারিগরি সমাধান। এখন প্রশ্ন হলো এই ড্যামের গেইট খুলে দেওয়ার আগে ভাটিতে থাকা আমার দেশকে অবহিত করেছে কি না? বিধি অনুযায়ী অবশ্যই আমাদের জানানোর কথা।

দেশ রূপান্তর : কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে তারা গেইট খুলে দেয়নি। তাদের এই বক্তব্য কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

আইনুন নিশাত : বিষয়টি তো রাজনৈতিক নয়। এটা সম্পূর্ণ কারিগরি। জলাধারের ভেতরে পানি বেড়ে গেলে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিতেই হবে। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। ভারত কেন অস্বীকার করছে বুঝে আসছে না।

দেশ রূপান্তর : ভারতের সঙ্গে আমাদের নদীর পানি নিয়ে যে লেনাদেনা সেখানে গোমতী নদী নিয়ে কখনো আলোচনা হয়নি। এবার কেন আলোচনায় আসছে?

আইনুন নিশাত : এটা সঠিক। আমাদের যৌথ নদী কমিশন সবসময় পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা এমন তিনটি বড় নদীর পানি হিস্যার আলোচনাকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এসব নদীর দিকেই সবার দৃষ্টি। কিন্তু অবস্থান ও আঞ্চলিকতা বিবেচনায় ছোট ছোট নদীগুলোর পানিপ্রবাহও কিন্তু বন্যা ও কৃষিব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিলেট অঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা, মনু এবং কুমিল্লা অঞ্চলের গোমতী, তিতাস এবং ফেনী অঞ্চলের মুহুরী ও ফেনী নদীর বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

দেশ রূপান্তর : ত্রিপুরার দিকে বৃষ্টিপাত কমছে। কিন্তু সিলেটের ওপারে আসামে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধির আভাস রয়েছে। তাহলে কি সিলেট মৌলভীবাজার এলাকায় বন্যা হতে পারে?

আইনুন নিশাত : আগেও বলেছি নদীগুলোর উজানে যদি বৃষ্টি হয় স্বাভাবিকভাবেই তা ভাটির দিকে নেমে আসবে। এখন ত্রিপুরার দিকে বৃষ্টি কমে গেলে ফেনী এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। আবার যদি আসাম ও সিলেট এলাকায় বেড়ে যায় তাহলে ওই এলাকায় বন্যা দেখা দিতে পারে। এটাই স্বাভাবিক।

দেশ রূপান্তর : দেশের পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন বন্যা না হওয়ায় আমাদের নদীতীরের বাঁধগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ নেই। অথচ লোকালয় রক্ষার জন্যই নদীগুলোর উভয় তীরে বাঁধ তৈরি করা হয়েছিল। বন্যায় কি এই বাঁধের ভূমিকা নেই?

আইনুন নিশাত : বন্যা থেকে রক্ষা করার জন্যই তো বাঁধগুলো তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু এই বাঁধগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ। কারণ বাঁধ কার্যকর না থাকলে বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটাই তো স্বাভাবিক।

দেশ রূপান্তর : নদীগুলোতে পানিপ্রবাহ না থাকায় এগুলো ভরাট হয়ে গেছে। বন্যায় এটাও কি ফ্যাক্টর নয়?

আইনুন নিশাত : দীর্ঘদিন ভরাট হতে হতে নদীর পানিপ্রবাহ কমে যায়। আর পানিপ্রবাহ কমে গেলে পলি সঞ্চয়নের হার বেড়ে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাবে। এতে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে বৃষ্টির সময় অতিরিক্ত পানি ধারণ করতে পারে না। বন্যার এটাও একটা কারণ।

দেশ রূপান্তর : বন্যাপরবর্তী করণীয় কী?

আইনুন নিশাত : এখন আমনের মৌসুম। তাই বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরকে দেশের অন্য এলাকা থেকে আমনের চারা নিয়ে এসে বন্যা উপদ্রুত এলাকায় সরবরাহ করা প্রয়োজন। অন্যথায় কৃষিতে আরেক বিপর্যয় ঘটবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত