কুকুর কীভাবে কুকুর হলো এবং মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে উঠল। গবেষণা প্রতিবেদন থেকে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র
কুকুরকে বলা হয় মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী। তবে কুকুরের রূপ এমন ছিল না। এক সময় মানুষের এ সঙ্গী থাকত বুনো অবস্থায়। তবে খাবারের সন্ধানে তারা মানুষের সংস্পর্শে আসে। ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। কখনো এ প্রাণী হয়ে ওঠে পাহারাদার আবার কখনো শিকারের সঙ্গী। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা কিছু ফসিল আবিষ্কার করেছেন, যার কারণে তারা মনে করছেন নেকড়ে থেকে কুকুরে রূপান্তরের সূত্র তারা পেয়ে গেছেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ডটকম এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হচ্ছে, গৃহপালিত কুকুরের বিবর্তন দীর্ঘ সময় ধরে ঘটেছিল। নেকড়ে এবং কুকুরের কাছাকাছি একটি প্রাণীর আন্তঃপ্রজননের মাধ্যমে এ বিবর্তন ঘটে থাকতে পারে। তারা যে ফসিল আবিষ্কার করেছেন, তার প্রেক্ষিতে এমন অনুমান আরও জোরদার হয়ে উঠেছে। ডিএনএ বিশ্লেষণ, রেডিওকার্বন ডেটিং এবং অ্যাডভান্স মিসারিং পদ্ধতি অবলম্বন করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করেছেন, কুকুর কোথা থেকে এসেছে এবং কখন তারা আমাদের সেরা বন্ধু হয়েছে।
যদিও তাদের গবেষণা কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয় না। কারণ হলো, ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত ফলাফল পাওয়ার সুযোগ কম। কারণ দীর্ঘ সময় মাটির নিচে থাকার কারণে ডিএনএ বিকৃত হয়। আবার এ সময়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে না জেনেও সঠিক সিদ্ধান্তে আসা যায় না। যে কারণে বিজ্ঞানীরা সবসময় বলে থাকেন বিস্তৃত গবেষণার কথা।
প্রারম্ভিক কুকুর
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে জ্যাক ব্রাউন বলছেন, কুকুর জাতীয় প্রাণীর এ ফসিলকে ক্যানিন হিসেবে অভিহিত করছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, কুকুরের জীবাশ্ম বিবেচনা করার ক্ষেত্রে গবেষকরা এ প্রাণীর শারীরিক আকার, আকৃতি, গঠন বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেন। যেমন দাঁতের আকার এবং বিন্যাস, নাকের অংশের আকৃতি এবং চোয়ালের আকার এবং দৈর্ঘ্য এবং মাথার খুলি। গবেষকরা এরপর ওই ফসিলের সঙ্গে আধুনিক কুকুর, আধুনিক নেকড়ে এবং আদি কুকুরের জীবাশ্ম ও প্রাগৈতিহাসিক নেকড়ে জীবাশ্মের তুলনা করেন। প্রাচীন কুকুরের জীবাশ্মের কিছু বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে তাদের মাথার খুলি এবং নাকের অংশ ছিল ছোট। নাকের অংশ ছোট থাকার কারণে দাঁতও ছিল ছোট এবং ঘন। এ ছাড়া তাদের তালু এবং কপাল ছিল চওড়া। উপরন্তু, বিজ্ঞানীরা একটি মাথার খুলির বক্ররেখা বিশ্লেষণ করতে জ্যামিতিক মরফোমেট্রিক্স নামে একটি উন্নত হাড়-পরিমাপক কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। যার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ের কুকুরের শারীরিক পরিমাপ ধারণা করা যায়।
যদিও এসব হাড় ঠিক কোন ধরনের প্রাণীর তা নির্ধারণ করা সবসময় সহজ নয়। বিজ্ঞানীরা বরফ যুগের কিছু জীবাশ্মকে ‘প্রাথমিক কুকুর’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। যার অর্থ এসব প্রাণী বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। যারা পুরোপুরি নেকড়ে নয় আবার গৃহপালিত কুকুরও নয়; তবে এ দুইয়ের মাঝামাঝি কোনো প্রাণী।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই প্রারম্ভিক কুকুরের জীবাশ্ম নেকড়ে-কুকুরের সংকরের মতো, যা গৃহপালিত কুকুরের আদি পুরুষ। এই গোত্রের সবচেয়ে প্রাচীনতম ফসিল একটি খুলি ১৮৬০-এর দশকে বেলজিয়ামের গোয়েটের এক গুহায় পাওয়া যায়। রেডিওকার্বন তারিখ অনুসারে জীবাশ্মটি প্রায় ৩৬ হাজার বছর পুরনো। ওই কুকুরটি প্যালিওলিথিক কুকুর হিসেবে বিবেচিত। যার মাথার খুলি আধুনিক নেকড়েদের তুলনায় আদি কুকুরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। আরেকটি জীবাশ্ম খুলি পাওয়া যায় ১৯৭৫ সালে সাইবেরিয়ার আলতাই পর্বতমালার এক গুহায়। রেডিওকার্বন তারিখ এবং শারীরবৃত্তীয় বিশ্লেষণ অনুযায়ী এটি প্রায় ৩৩ হাজার বছর পুরনো। গবেষকরা এ সিদ্ধান্তেপৌঁছেছেন যে, সাইবেরিয়ায় পাওয়া এই কুকুরের মতো খুলিটি বিবর্তনের প্রাথমিক পর্যায়ের।
মানুষের পরিবারে
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, কুকুরের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে তারা প্রাচীন মানুষ এবং কুকুরের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে অনেক কিছু জানতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, বন-ওবারকাসেল নামে পরিচিত প্রাচীনতম কুকুরের জীবাশ্মটি ১৪ হাজার বছরের কিছু বেশি পুরনো বলে মনে করা হয়। ১৯১৪ সালে জার্মানির ওবারকাসেলের একটি প্রাচীন কবরে এক পুরুষ এবং এক নারীর সঙ্গে কুকুরের দেহাবশেষ পাওয়া গিয়েছিল। বন-ওবারকাসেল কুকুরটি আসলে একটি কুকুরছানা ছিল, যার বয়স প্রায় সাত মাস। ওই জীবাশ্ম নিয়ে আরও সাম্প্রতিক পরীক্ষায় গবেষকরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, কুকুরটি অসুস্থতায় ভুগছিল এবং মারা যাওয়ার আগে তাকে যতœ ও লালন-পালন করা হয়েছিল। এ জীবাশ্মটি মানুষের সঙ্গে গৃহপালিত কুকুরকে কবর দেওয়ার প্রাচীনতম নিশ্চিত প্রমাণও। তবে একা বা অন্য কুকুরের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে যেভাবেই হোক না কেন কুকুরকে কবর দেওয়ার প্রমাণ হলো মানুষের সঙ্গে তাদের সখ্য। যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, কুকুর ক্রমে বন্যপ্রাণী থেকে মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
১৯৭০-এর দশকে ইলিনয়-মিসৌরি সীমান্তের কাছে ইলিনয় নদী উপত্যকায়, কোস্টার নামক একটি প্রতœতাত্ত্বিক স্থানে তিনটি গৃহপালিত কুকুরের কঙ্কালের অবশেষ পাওয়া যায়। অগভীর গর্তে হাড়গুলো আবিষ্কৃত হয়। যা দেখে মনে হয়, কুকুরগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে কবর দেওয়া হয়েছিল। কারণ হাড়গুলোতে কোনো হাতিয়ারের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। কুকুরগুলো প্রাকৃতিক কারণে মারা গেছে বলে ধারণা। রেডিওকার্বন তারিখ থেকে জানা যায়, কোস্টার কুকুরের হাড় ১০ হাজার বছর পুরনো। উত্তর আমেরিকায় গৃহপালিত কুকুরের জীবাশ্ম পাওয়া পর সময়কাল ধারণা করা হয়, ১০ হাজার ১৫০ বছর পুরনো। যদিও প্রাথমিকভাবে হাড়টিকে প্রাচীন ভাল্লুকের বলে মনে করা হয়েছিল। পরে ডিএনএ প্রমাণ করে যে, এটি গৃহপালিত কুকুরের ছিল। ওই জীবাশ্মটি আরও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি ২৩ হাজার বছর আগের সাইবেরিয়ায় বসবাসকারী কুকুরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যা ইঙ্গিত করে যে, বরফ যুগে সাইবেরিয়ান শিকারিদের সঙ্গে গৃহপালিত কুকুর ছিল। বরফ গলতে শুরু করলে মানুষ এবং তার সঙ্গী কুকুর সাইবেরিয়া থেকে উত্তর আমেরিকায় স্থানান্তরিত হয়েছিল।
গবেষকরা কুকুরের জিনোম বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কুকুরের পূর্বপুরুষরা প্রায় ২৩ হাজার বছর আগে সাইবেরিয়ায় বসবাস করছিল। আবার উত্তর আমেরিকায় বসবাসকারী প্রাচীন কুকুরগুলো কয়েক হাজার বছর পর নাই হয়ে যায়। সম্ভবত ইউরোপীয়রা তাদের নিজস্ব জাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আসার কারণে এমনটি হয়েছিল।
বিবর্তন
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, তিনটি প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চল; এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপকে গৃহপালিত কুকুরের উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিজ্ঞানীরা এখনো চূড়ান্তভাবে কুকুরের উৎপত্তি কোথায় তা চিহ্নিত করতে পারেনি। প্রতিটি গবেষণা রহস্য সমাধানে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বেলজিয়াম, সাইবেরিয়া এবং চেক রিপাবলিকে পাওয়া প্রাচীন কুকুরের জীবাশ্মগুলো আনুমানিক ৩৬ থেকে ৩৩ হাজার বছরের পুরনো। ২০২২ সালের গবেষণায় প্রাচীন নেকড়ের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, এ প্রাণীকে গৃহপালিত করার দুটি ফসিল পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া গেছে। ২০২১ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়, গৃহপালিত কুকুরের উৎপত্তিস্থলের একটি প্রমাণ পাওয়া গেছে সাইবেরিয়ায়, যা ২৩ হাজার বছর আগের। এ ছাড়া জাপানে একটি নেকড়ের প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং সেখানে গৃহপালিত কুকুর পাওয়া যায়। যা পরামর্শ দেয় যে, গৃহপালিত কুকুরের পূর্বপুরুষ পূর্ব এশিয়ায় ছিল।
উৎপত্তি
যদিও বিজ্ঞানীরা গৃহপালিত কুকুরের বিবর্তন নিয়ে গবেষণায় অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছেন, তবে গবেষণার বেশিরভাগই পরস্পরবিরোধী। কখন নেকড়ে কুকুর হয়ে ওঠে বা গৃহপালিত কুকুরের উৎপত্তি কোথা থেকে হয়েছে সে বিষয়েও কোনো ঐকমত্য নেই।
বিভিন্ন জীবাশ্ম প্রমাণ, প্রায় ১৪ হাজার বছর আগে কুকুরের গৃহপালিত হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করে। ডিএনএভিত্তিক গবেষণায় নেকড়ে এবং কুকুরের মধ্যে বিভক্তিও পাওয়া যায়। ২০২২ সালে এক লাখ বছর ধরে বিস্তৃত ৭২টি আদি নেকড়ের জিন বিশ্লেষণ করে গবেষকরা এ সিদ্ধান্তেপৌঁছেছেন যে, কুকুর সম্ভবত ৪০ হাজার বছর আগে আবির্ভূত হয়েছিল। ২০১৭ সালে গবেষকরা জার্মানি এবং আয়ারল্যান্ডের তিনটি প্রাচীন বা আদি কুকুরের জীবাশ্ম থেকে জিনোম বিশ্লেষণ করে। এরপর তারা পাঁচ হাজারেরও বেশি আধুনিক কুকুর এবং নেকড়ের জেনেটিক ডেটার সঙ্গে সেই আদি কুকুরের জিনোমের তুলনা করেন। দলটি অনুমান করে যে, কুকুর এবং নেকড়ে ৩৭ হাজার থেকে ৪ বছর আগে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। সেই সমীক্ষা এটা নির্ধারণ হয় যে, কুকুরগুলো ১৭ হাজার এবং ২৪ হাজার বছর আগে দুটি প্রজাতিতে বিভক্ত হয়। একটি পূর্ব এশীয় এবং অপরটি পশ্চিম বা আধুনিক ইউরোপ, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া এবং আফ্রিকান প্রজাতিতে পরিণত হয়। এ সময়সীমার ওপর ভিত্তি করে তাদের অনুমান কুকুর গৃহপালিত হয়েছিল ২০ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে।
কুকুর কীভাবে মানুষের সঙ্গী হলো তা নিয়ে অবশ্য দেশে দেশে রূপকথাও চালু আছে। বিজ্ঞানের গবেষণার সঙ্গে সেসব রূপকথার কিছু মিলও পাওয়া যায়। যার একটি হলো খাবার। কুকুর সহজে খাবার পাওয়ার উপায় হিসেবে মানুষের সঙ্গ বেছে নেয়। নেকড়ের পক্ষে যা সম্ভব হয় না। তারা শারীরবৃত্তীয় কারণে মানুষের কাছাকাছি আসতে পারেনি। কুকুরের ক্ষেত্রে এমনটা হওয়ার কারণ নিশ্চয় জিনগত পরিবর্তন। সে হিসেবে নেকড়ে থেকে তাদের কুকুর হয়ে ওঠার যে বৈজ্ঞানিক প্রস্তাব নিয়ে গবেষণা চলছে, তা ভবিষ্যতে সত্য হিসেবে দেখা দিতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা কখনো অল্প প্রমাণ নিয়ে বড় সিদ্ধান্তে চলে আসেন না। তারা আরও গবেষণার কথাই বলেন। এ বিষয়েও বিস্তৃত গবেষণা কুকুরের উৎপত্তি সম্পর্কে ধারণা দেবে।
