চাপের মুখে সেই ক্রিকেটার সাকিব

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৪, ০৮:২০ এএম

একজন ক্রিকেটার কতটা চাপ নিয়ে মাঠে পারফর্ম করতে পারেন? ম্যাচের পরিস্থিতি, প্রতিপক্ষ দর্শকদের চাপ কিংবা সমর্থকদের প্রত্যাশার চাপ এই তো? সেই ক্রিকেটারটি যদি সাকিব আল হাসান হন, তাহলে চাপ হয়ে ওঠে হিমালয়সম। এই রাওয়ালপিন্ডি টেস্টের কথাই ধরুন না, সাকিব কী ভয়ংকর চাপ নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন! রাজনৈতিক পালাবদল, খুনের মামলা, আইনি নোটিস, নিষেধাজ্ঞার শঙ্কা, চোখের সমস্যা, অবসরের চাপ, নিজ দেশের সমর্থকদের কটূক্তি গত পাঁচদিন এ সবকিছুই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। কিন্তু তিনি তো সাকিব। তিনি এসেছেন জয় করতে। সব বাধাবিঘœকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে বাইশ গজের নায়ক হয়ে ওঠা তার কাছে মামুলি বিষয়। গত এক মাসে সাকিবকে নিয়ে কত কিছুই না হয়েছে। তীব্র ছাত্র-গণআন্দোলনে পতন ঘটেছে আওয়ামী লীগ সরকারের। 

মাগুরা-২ আসনের সাংসদ সাকিব ছিলেন সেই সরকারেরই অংশ। পুরোটা সময় দেশের বাইরে থাকা সাকিব আন্দোলনে সমর্থন না জানানোয় অনেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ। সেই ধারাবাহিকতায় রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট চলাকালেই খুনের মামলায় জড়ানো হয় সাকিবের নাম। এমনকি সাকিবকে পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরানোর জন্য আইনি নোটিসও দেওয়া হয় বিসিবিকে। বাধ্য হয়ে সাকিবকে নিয়ে জরুরি সভায় বসেন বিসিবি কর্তারা। কিন্তু আসেনি কোনো সিদ্ধান্ত। পাকিস্তানের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে বল হাতে অসামান্য অবদান রেখে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও কঠিন করে দিলেন সাকিব।

চতুর্থ দিন পর্যন্তও সবাই ধরেই নিয়েছিলেন, রাওয়ালপিন্ডি টেস্ট ড্র হতে যাচ্ছে। কিন্তু গতকাল পঞ্চম দিন সকালেই বদলে গেল চিত্র। উইকেট ততটাও খারাপ ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের সামনে মুখ থুবড়ে পড়ল পাকিস্তান! মনে জাগল আশা। মুলতানের সেই কান্না কি রাওয়ালপিন্ডিতে হাসি হয়ে ফুটতে যাচ্ছে? শুরুটা করে দিলেন পেসাররা। এরপর সাকিব তুলে নিলেন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। মধ্যাহ্নবিরতির আগে ৫ উইকেট হারিয়ে ধসে পড়ল পাকিস্তানের ব্যাটিং। চোখের সমস্যা নিয়ে ব্যাটিংয়ে কিছু করতে পারেননি সাকিব। কিন্তু তিনি তো অল-রাউন্ডার। যে কোনো ভাবেই দলকে পুষিয়ে দিতে পারেন। গত কয়েক মাস সেটাও পারছিলেন না। এবার পারলেন। তাও এমন এক মঞ্চে, যেখানে বাংলাদেশ গড়ল ইতিহাস।

পাকিস্তানকে প্রথমবার টেস্টে হারানোর সেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন সাকিব। মাত্র ২.৫৮ ইকোনমিতে ৩ উইকেট নিয়ে ভেঙে দিলেন পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের মেরুদণ্ড। বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে টেস্ট ইতিহাসে সর্বোচ্চ উইকেটের বিশ্ব রেকর্ডটাও গড়ে ফেললেন। ঠিক সেই সময়, যখন তার ক্যারিয়ার হুমকির মুখে! সাকিব আসলে এমনই। ইতিহাস বলে, যখনই সাকিবকে ঘিরে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তিনি জ্বলে উঠেছেন আপন মহিমায়। বাইশ গজে জাদু দেখিয়ে মুখ বন্ধ করেছেন সবার। ব্যাট হাতে সীমানাছাড়া করেছেন সব সমালোচনা। মধ্য সাঁইত্রিশে এসে তার পারফরম্যান্সের ধার কমেছে, বাম চোখটাও প্রতারণা করছে, কিন্তু সাকিব আছেন সেই আগের মতোই।

সিরিজ শুরুর আগে প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন বলেছিলেন, এ বছরের ৮টি টেস্টেই খেলতে চান সাকিব। কিন্তু পরিস্থিতি তো বদলে গেছে! রাজনৈতিক কারণে সাকিব আর দেশে ফিরতে পারবেন কি না তা অনিশ্চিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু দেশে না ফিরলে কীভাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালিয়ে যাবেন? এমন অনেক প্রশ্নের ভিড়ে এখনো কোনো জবাব মেলেনি। বিসিবির নতুন সভাপতি ফারুক আহমেদ বলেছিলেন, সিরিজের প্রথম টেস্ট শেষে সাকিবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু বরাবরের মতোই পারফরম্যান্স দিয়ে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণটা আরও জটিল করে দিলেন সাকিব। বিসিবি এবার কী করবে? এমন পারফরম্যান্সের পর সাকিবকে বাদ দেওয়ারও সুযোগ নেই, পরের ম্যাচ যেহেতু একই ভেন্যুতে। রইল বাকি আইনি বিষয়টি। সবকিছু পর্যালোচনা করেই সিদ্ধান্ত জানাবে বিসিবি। সাকিব এরপর আর বাংলাদেশের হয়ে খেলুন বা না খেলুন, তিনি সাকিবই থেকে যাবেন। যে সাকিব মাথা নোয়াবার নন।

মুগ্ধ অধিনায়ক নাজমুল শান্ত বলেছেন সাকিবের পারফরম্যান্স প্রসঙ্গে, ‘যতটুকু বুঝি, (সাকিব) যখন দেশের হয়ে নামেন, তখন অনেক নিবেদিত একজন মানুষ তিনি। দলের জয়ের জন্য যা যা করা দরকার ব্যক্তিগত জীবন একদিকে সরিয়ে রেখে দলের জন্য কীভাবে ভালো করতে পারেন, সেদিকে ফোকাস করা, দলের জুনিয়র একজনকে আলাদা করে সহায়তা করা এগুলো আলাদা করে করতে পারেন।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত