পাকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে ১০ উইকেটে হারিয়ে ২ টেস্টের সিরিজে ১-০ তে এগিয়ে বাংলাদেশ। আজ একই ভেন্যু রাওয়ালপিন্ডিতে শুরু হতে যাওয়া দ্বিতীয় টেস্টের আগে কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে জানিয়েছেন সিরিজ জয়ের আশাবাদ। পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় শুধু বাংলাদেশকে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে আরও কিছু পয়েন্টই এনে দেবে না, কোচ হাথুরুসিংহের চাকরিটাও হয়তো বাঁচিয়ে দেবে কয়েক মাসের জন্য।
হাথুরুসিংহে যখন সংবাদ সম্মেলনে, তখন দেশে শুরু হয়েছে ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে বিসিবির বোর্ড পরিচালকদের সভা। নতুন ভূমিকায় দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই হাথুরুসিংহের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে আসছিলেন ফারুক, জানিয়েছেন ভূমিকা বদল হলেও তিনি আগের অবস্থান থেকে সরবেন না। এই প্রসঙ্গেই করা প্রশ্নে হাথুরুসিংহের উত্তর, ‘আমি বুঝতে পেরেছি, নেতৃত্বে নতুন কিছু মানুষ এসেছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। প্রথম কথা হচ্ছে আমার দলটিকে তৈরি করতে হবে। শেষ কয়েক মাস ধরে আমরা অনেক কঠোর পরিশ্রম করেছি। এবারও সেটার ব্যতিক্রম হবে না দ্বিতীয় ম্যাচে এটাই লক্ষ্য।’
হাথুরুসিংহেকে ফিরিয়ে আনার পেছনে সাবেক বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের ছিল জোরালো ভূমিকা আর সংস্থার নিয়মিত ‘চেইন অব কমান্ড’-এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে এই শ্রীলঙ্কান কোচ সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন পাপনের সঙ্গেই, ফলে বিতর্কিত অনেক সিদ্ধান্তের কোনো জবাবদিহি করতে হয়নি তাকে। হাথুরুসিংহের জবাবেই স্পষ্ট, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিসিবির শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনার একটা সুযোগ তিনি খুব করেই চাচ্ছেন। তার বর্তমান চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
বাংলাদেশের কাছে হারের পর পাকিস্তান দল সমালোচনায় জেরবার। তারা দলেও এনেছে কিছু পরিবর্তন। বাদ পড়েছেন শাহিন শাহ আফ্রিদি, দলে এসেছেন মীর হামজা। আগের টেস্টে কোনো স্পিনার নেয়নি পাকিস্তান আর বাংলাদেশের ২ স্পিনার চতুর্থ ইনিংসে নিয়েছেন ৭ উইকেট, এই বোধোদয় থেকেই এবার পাকিস্তান দলে নিয়েছে লেগস্পিনার আবরার আহমেদকে। ১২ জনের দল ঘোষণা করেছেন পাকিস্তানের লাল বলের কোচ জেসন গিলেস্পি, আজ সকালে আবহাওয়া দেখে নেবেন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে বাংলাদেশ দলে কোনো পরিবর্তনের আভাস দেননি কোচ, ‘দলের সবার আত্মবিশ্বাস তো এখন খুবই ভালো। এটার অবশ্য যথেষ্ট কারণও আছে। দেখুন, পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে হারানোর কাজটা একেবারে সহজ নয়। তারা খুবই শক্তিশালী দল, এখনো আমরা দ্বিতীয় ম্যাচে ভালো লড়াইয়ের আশা করছি। কন্ডিশনের ওপর নির্ভর করে আমরা কিছু পরিবর্তন আনতে পারি। যখন উইকেট দেখার সুযোগ পাব তখন সিদ্ধান্ত। আমরা এখন পর্যন্ত উইকেট দেখার সুযোগ পাইনি কারণ ঢেকে রাখা ছিল। আগের ম্যাচের চেয়ে আবহাওয়াও একটু ভিন্ন।’
রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্টের একাদশে পরিবর্তন আনার খুব একটা সুযোগও নেই, কারণ সবাই কমবেশি ভালো করেছেন। ব্যাটসম্যানদের ভেতর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তই যা একটু খারাপ করেছেন, আউট হয়ে গেছেন মাত্র ১৬ রানে। তবে তার নেতৃত্ব, বোলিং পরিবর্তন, ফিল্ড প্লেসমেন্ট, পরিকল্পনা... সবই ছিল কার্যকর। অন্যরা ভালো করায় দিনশেষে শান্তর রান না পাওয়াটা বড় প্রভাব ফেলেনি ম্যাচে।
নিজের দেশে উইকেট পড়তে ভুল করে মাশুল দিয়েছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ অতিথি হয়ে এসে কী করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিল? হাথুরুসিংহে এই ব্যাপারে কৃতিত্ব দিলেন মুশতাক আহমেদকে, ‘আমাদের প্যানেলে মুশি (মুশতাক আহমেদ) যথেষ্ট অভিজ্ঞ। সে যেহেতু এখানে খেলেছে এবং পিসিবির সঙ্গে কাজ করেছে যার ফলে এখানকার তথ্যগুলো শেয়ার করছে। এটা আমাদের সহায়তা করছে।’ বাংলাদেশের তরুণ পেসারদের নিয়েও যথেষ্ট কৌতূহল পাকিস্তানের গণমাধ্যমের, হাথুরুসিংহে জানিয়েছেন অনেক তরুণ প্রতিভাই উঠে আসছে বাংলাদেশ থেকে, ‘আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বিবেচনায় তারা (সাদমান ও নাহিদ) একেবারে তরুণ। নাহিদ রানা সম্ভাবনাময়ী পেসার। শুধু বাংলাদেশের জন্য না। আমি বলতে চাই পুরো বিশ্বের জন্যই। দেখুন, সে ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার গতিতে এবং ধারাবাহিকভাবে ১৪০+ গতিতে বোলিং করতে পারে। সে এখনো তরুণ। তার কাছ থেকে অনেক পাওয়া হয়নি, তার সেরাটা এখনো বাকি। সাদমান বাংলাদেশের সঙ্গে আছে বেশ কিছুদিন, আগে সে কিছু টেস্ট খেলেও ফেলেছে। এই সুযোগটা পাওয়ার আগে সে দুবছর দলের বাইরে ছিল। মানসিকভাবে সে যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে, ফিরে এসেই এমন ইনিংস খেলল। ফেরার পথে সে চাপের মধ্যেও ছিল।’
আজ থেকে শুরু টেস্টটা ড্র হলেই সিরিজ বাংলাদেশের, সমতা ফেরাতে জিততেই হবে পাকিস্তানকে। মরিয়া পাকিস্তান শাহিন শাহ আফ্রিদিকে বসিয়ে রাখছে একাদশের বাইরে, এই নিয়ে গিলেস্পির অভিমত, ‘শাহিনের গত কয়েকটা সপ্তাহ অন্য রকম গেছে। সে নতুন নতুন বাবা হয়েছে। আমরা একটা সুযোগ খুঁজছিলাম কী করে তাকে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যায়। আমরা আমাদের সেরা বোলিং সমন্বয়টাই খুঁজে বের করতে চেষ্টা করছি। আমরা সেরা আক্রমণই সাজাব যেটা ২০ উইকেট তুলে নিতে পারে।’
পাকিস্তান মরিয়া হয়ে ঘুরে দাঁড়াবে, সেটা প্রত্যাশিত। হাথুরুসিংহের চাকরিও ঝুলছে সরু সুতোয়। পাকিস্তানকে তাদেরই মাটিতে হারানো হয়তো মন গলাতেও পারে বিসিবির নতুন নীতিনির্ধারকদের। ক্রিকেটাররা তো সবসময়ই জয়ের জন্য মাঠে নামেন, এবার জয়টা দুই দলের কোচেরও খুব দরকার। গিলেস্পির আন্তর্জাতিক কোচিং শুরুটা যদি বাংলাদেশের কাছে সিরিজ হার দিয়ে হয়ে, তাহলে কিন্তু তার টেস্ট ক্যারিয়ারের মতো কোচ হিসেবেও শেষ প্রতিপক্ষের নাম হয়ে থাকবে বাংলাদেশ।
