পাঁচ দিন পরও আছে ছাইচাপা আগুনের আঁচ। চারদিকে পোড়া গন্ধ। পলেস্তারার মতো খসে পড়ছে পোড়া ভবনের ইট। অবিরাম পানি ঢেলেও আগুন নেভাতে পারছে না ফায়ার সার্ভিস। ধসে পড়েছে ছয়তলা ভবনের ওপরের তিনতলার মেঝে। গতকাল বৃহস্পতিবার রূপগঞ্জের গাজী টায়ার ফ্যাক্টরির ভেতরের একটি ভবনের চিত্র ছিল এমন।
ফ্যাক্টরির ভেতর ঘুরে দেখা গেছে, অন্তত ১১টি মিনি ট্রাক ও টায়ার বহনের জন্য ছোট ছোট যান জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর কোনো কোনোটি উল্টে আছে রাস্তায়। অধিকাংশ ভবনের ভেতরে তেমন কোনো মালামাল নেই। কয়েকটিতে আছে ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রাংশ। আগুনের তীব্রতায় ছয়তলা ভবনের ইটগুলোও ছাই হয়ে গেছে। তাই ভেতরে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার মতো কোনো অবস্থা নেই উল্লেখ করে ভবনটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করেছে বুয়েটের প্রতিনিধিদল।
গতকাল পোড়া ভবন পরিদর্শন করে বুয়েটের অধ্যাপক রাকিব আহসান বলেন, ‘ভবনটিতে তিন দিন ধরে থেমে থেমে আগুন জ¦লেছে। ভবনের অনেক দেয়াল এমনকি ফ্লোর ধসে পড়েছে। ছয়, পাঁচ এবং চারতলার ছাদ তিনতলার ওপর এসে পড়েছে। ভবনের বিমগুলো বেঁকে গেছে। এ অবস্থায় ভবন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এর ভেতরে প্রবেশ করে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব নয়।’
ভেতরে আটকা পড়াদের মরদেহ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রচুর দাহ্যপদার্থ ছিল ভবনে। আগুন দীর্ঘসময় থাকায় ভবনটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো ভেতরে প্রচুর তাপ রয়েছে। আমরা ড্রোন ও মই দিয়ে চেক করে ভেতরে আগুনের উপস্থিতি দেখতে পেয়েছি। কিন্তু কোনো ডেডবডির সন্ধান পাইনি। তবে এই ভবনের ভেতরে অভিযান চালানো সম্ভব। সেটা তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এই ভবনে দাঁড়িয়ে থাকাটাও ঝুঁকিপূর্ণ। এর ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়াও খুব সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে।’
গত রবিবার রাত ৯টায় এই ফ্যাক্টরিতে লুটপাটের পর আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ফ্যাক্টরির ভেতরে আটকে পড়েন অনেকে। যাদের আটকা পড়ার খবর পাওয়া গেছে, তাদের প্রায় সবাই নিখোঁজ। এমন নিখোঁজদের একটি তালিকা তৈরি করেছে রূপগঞ্জ থানা-পুলিশ ও স্থানীয় শিক্ষার্থীরা। এই তালিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে নিখোঁজের প্রকৃত ঘটনা উন্মোচনের জন্য।
তালিকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রূপগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) জুবায়ের হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে ১২৯ জনের একটি তালিকা করা হয়েছে। সেটি গোয়েন্দাদের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করা হবে। নিখোঁজের সত্যতা পাওয়া গেলে তাদের বিষয়ে জিডি নেওয়া হবে।
গতকালও কারখানার ভেতর থেকে কিছু স্থান থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। সকাল ১০টার দিকে বুয়েটের প্রফেসর প্রকৌশলী রাকিব আহসান ও নারায়ণগঞ্জ জেলার গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব জেলা পরিষদের তদন্ত কমিটির সদস্যদের নিয়ে ভবনের চারপাশ ঘুরে দেখেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের লেডার মেশিন দিয়ে ভবনের ছাদে ও বিভিন্ন অংশে বাইরে থেকে
দেখেছেন। কারখানার ভেতরে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যদের অবস্থান করতে দেখা গেছে।অগ্নিসংযোগের পরদিন থেকেই নিখোঁজের স্বজনরা এসে ভিড় জমিয়েছেন গাজী টায়ার ফ্যাক্টরির মূল ফটকের সামনে। গতকালও এর ব্যক্তিক্রম ছিল না। তবে কয়েক দিনের তুলনায় স্বজনদের উপস্থিতি তুলনামূলক কম ছিল। দুপুর ১২টার দিকে রূপসী এলাকার ওই ফ্যাক্টরির সামনে দেখা যায়, ১৩ জন নিখোঁজের স্বজন সেখানে অপেক্ষা করছেন। যদিও তারা কেউ জানেন না এই অপেক্ষার শেষ কখন, ফলাফলই-বা কী।
অপেক্ষারত স্বজনদের একজন সমেদ আলী। তার ছেলে রিপন ঘটনার দিন রাতে পাঁচ বন্ধুর সঙ্গে এই ফ্যাক্টরিতে ঢোকে। তারপর পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও ছেলের কোনো খোঁজ নেই। সত্তর ছুঁই ছুঁই এই বৃদ্ধ ছেলের অপেক্ষায় দিন-রাত গাছের নিচে পাটি পেতে অপেক্ষা করছেন। কখনো কাঁদছেন, কখনো আপনমনে কিছু না কিছু বলেই যাচ্ছেন। চোখের পানি মুছতে মুছতে হাফহাতা স্যান্ডো গেঞ্জির দুই পাশের কাঁধের নিচের হাতা কালো করে ফেলেছেন। তিনি বলেন, ‘এই অপেক্ষা কি ফুরাইব বাবা? আমার পোলায় এহানে থাকত না। তার খালা, সম্বন্ধী, ভায়রা (স্ত্রীর ভাই ও বোনের স্বামী) এহানে থাকে। হেগো বাসায় বেড়াইতে আইছিল। আগুন যেদিন দেয় ওইদিন পাঁচজনে একটা অটো নিয়া আইছিল। একজনও বাড়ি ফেরে নাই।’
নিখোঁজ রিপনের বাড়ি শেরপুরের সদরে জঙ্গলদি গ্রামে। ঘটনার কয়েক দিন আগেই এই এলাকায় বেড়াতে এসেছিলেন। তার স্ত্রী ও সন্তানও আছে রূপসীতে আত্মীয়ের বাসায়। সবাই অপেক্ষায় থেকে থেকে ঘরে ফিরেছেন কিন্তু রিপনের বৃদ্ধ বাবার অপেক্ষা যেন ফুরোয় না। আরও অপেক্ষায় আছেন নিখোঁজ ইসমাইল, বাসেদ, সুলতানের স্বজনরা। তবে রিপনের বাবা সমেদের মতো তারা কথা বলতে চান না। শুধু নিখোঁজের নাম বলেন। কেউ কেউ কথা বললেও নিজের নাম-পরিচয় দিতে চান না। এর কারণ জানতে চাইলে নিখোঁজ ইসমাইলের এক স্বজন বলেন, ‘পরিচয় দিলে ঝামেলা। মানুষ কয় ওরা ওইহানে গেছিল তো লুট করতে।’
‘আমার স্বামীর লাশটা না হোক পোড়া কঙ্কাল, নয়তো মাথার খুলিটা হলেও আমারে দিয়া দেন স্যার। আমরা জানাজা পইড়া দাফনডা তো করতে পারমু।’ গতকাল কারখানার সামনে আহাজারি করতে করতে এসব কথা বলতে দেখা গেছে গৃহবধূ কল্পনা আক্তারকে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আনোয়ারুল হক বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটির সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের ড্রোন ফুটেজে কোনো মরদেহের সন্ধান পাইনি। বুয়েট প্রতিনিধিদলসহ এক্সপার্টদের মতামত অনুযায়ী ওপরের ফ্লোরে অভিযান চালানো সম্ভব নয়। তবে আমরা ভবনের নিচের বেইসমেন্টে অভিযান চালিয়েছি। সেখানে কোনো মরদেহ পাওয়া যায়নি।’
এই ভবনের একজন দমকলকর্মী প্রবেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শুভ দেব নামের অন্য এক দমকলকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এক সহকর্মী সিঁড়ি ধরে তিনতলা পর্যন্ত উঠেছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর একজন মানুষের ওজনে সেই সিঁড়িটি কাঁপতেছিল। পরে তিনি নেমে আসেন। ওখানে উদ্ধার চালাবে কীভাবে।’
