বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রথম থেকেই সমর্থন করত জুনায়েদ। ফলে যৌক্তিক আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত না গিয়ে পারেনি সে। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আন্দোলনে গিয়ে বাড়িতে ফিরল পঙ্গু হয়ে। জুনায়েদ (২৫) কিশোরগঞ্জ সদরের মহিনন্দ ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে। অভাব অনটনের সংসারে যেই ছেলেটি ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি সেও এখন পঙ্গুত্ব বরণ করে হয়েছে বাবা-মায়ের কাঁধের বোঝা। তবুও সন্তান বেঁচে ফেরায় সৃষ্টিকর্তার দরবারে শুকরিয়া জানান বাবা-মা।
জানা যায়, জুনায়েদ যাত্রাবাড়ীর একটি মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের ও পরিবারের খরচ চালাতেন। অভাব-অনটনের সংসারে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে নিয়ে বড় আশা ছিল বাবা-মায়ের। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পা হারিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে জুনায়েদকে। সেদিনের দুঃসহ স্মৃতির বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।
জুনায়েদ বলেন, ‘গত ৫ আগস্ট দুপুরে আন্দোলনের কর্মসূচি অনুযায়ী গণভবন ঘেরাওয়ের জন্য বন্ধুদের নিয়ে রওনা হই। প্রথমে সাইনবোর্ড এলাকা থেকে যাত্রাবাড়ী পর্যন্ত যাই। এ সময় সেনাবাহিনী ও বিজিবি তাদের বাধা দেয়নি। এরপর কাজলায় পৌঁছালে পুলিশ অতর্কিত হামলা চালায়। সেখান থেকে যাত্রাবাড়ী থানা পর্যন্ত পৌঁছালে পুলিশ গুলি শুরু করে। এ সময় একটি ভ্যানের পেছনে আশ্রয় নিলে বুঝে ওঠার আগেই পুলিশ আমাদের কাছে চলে আসে। তখন পুলিশের কাছে মাফ চেয়ে পাশের গলি দিয়ে দৌড় দিলে তারা এগিয়ে এসে আমাদের গুলি করে। এ সময় আমার বন্ধু বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। আমার বাঁ পায়ের হাঁটুতে গুলি লাগলে আমি পড়ে যাই। দীর্ঘ সময় পর স্থানীয়রা আমাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে অর্থোপেডিক্স হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানা যায় পায়ের দুটো রগ ছিঁড়ে গেছে। অপারেশন করতে গিয়ে চিকিৎসকদের পরামর্শে আমার পা কেটে ফেলতে হয়।
জুনায়েদ আরও বলেন, আমরা দেশের জন্য, এই জাতির জন্য যতটুকু সম্ভব করেছি। বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান আমাদের জন্য কী করবেন তা জানি না। পা হারানোর ব্যথা যে হারিয়েছে সেই একমাত্র বোঝে।
জুনায়েদের পিতা হাবিবুর রহমান বলেন, একমাত্র ছেলেই আমার ভরসার জায়গা ছিল। পুরো সংসারটা সে চালাত। আমি দীর্ঘ ২২ বছর ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী হয়ে আছি। মানুষ সহায়তা করলে আমার সংসার চলে। না হলে না খেয়ে থাকতে হয়।
প্রতিবেশী নিয়ামত উল্লাহ বলেন, এই পরিবারটি একবারে অসহায়। জুনায়েদ যেই কর্মে ছিল সেখানে থাকলে হয়তো এই পরিবারটা ঘুরে দাঁড়াতে পারত। সরকার একটা ব্যবস্থা করে দিলে ওরা বেঁচে যেত।
জুনায়েদের সহপাঠী মাহবুব আলম বলেন, দীর্ঘ সংগ্রামের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। আশা করি জুনায়েদের সাহায্যে সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসবেন। একই সঙ্গে এই আক্রমণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানাই।
যুবদল নেতা মাসুম বিল্লাহ বলেন, শুধু বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারী, বিএনপি, জামায়াতের নেতাকর্মীরা আন্দোলন করেনি। সবার চেষ্টায় এই আন্দোলন সফল হয়েছে। তার মধ্যে জুনায়েদের পা হারানোয় সবার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। জুনায়েদ কোনো দলের না। সরকারের কাছে অনুরোধ, জুনায়েদের পরিবারের প্রতি সুদৃষ্টি দেবেন।
