কালের পরিক্রমায় ‘দালাল’ শব্দটি অত্যন্ত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে দালাল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য একসময় বেশ কিছু গুণের বিধিবিধান ছিল। কেননা, যিনি দালালের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন, তার মধ্যে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা জরুরি। কারণ, একজন দালাল বা গোষ্ঠী দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ন্যায্যতার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। যে প্রক্রিয়ায় দুপক্ষই কাজের অংশীদারত্বের ভিত্তিতে দালালের ওপর সন্তুষ্ট থাকে। যেমন আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের মিথস্ক্রিয়ায় (mutual understanding) দুদেশের মধ্যে কিংবা দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মধ্যে চুক্তি সম্পাদনে কোনো একজন ব্যক্তি বা সংস্থা মাধ্যম, ব্রোকার বা মিডিয়া হিসেবে কাজ করেন। এই প্রক্রিয়াতে সাধারণত দুপক্ষই ইতিবাচক উদ্দেশ্য চরিতার্থের নিমিত্তে কাজ করেন। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যাচ্ছে দালালদের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র।
বর্তমানে ‘দালাল’ শ্রেণির মানুষগুলো পুরোপুরি বেকার। নিজ পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কোনো ধরনের উৎপাদনশীল কাজে এরা সম্পৃক্ত নন। এরাই এখন মানুষকে বিপদে ফেলে মধ্যস্থতার নামে সুবিধা নিচ্ছে। বাংলাদেশে দালাল চক্রটি ক্রমান্বয়ে পরিবর্ধিত হচ্ছে। এর শিকড় ও কর্মপরিধি শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামীণ সমাজেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রক্রিয়াটি চলমান থাকলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রশ্নের মুখে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ঘুষ এবং দালালি সংস্কৃতির নমুনা সম্পর্কে সবাই জানেন। তবু এই প্রক্রিয়া সমূলে উৎপাটনে তেমন জোরালো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এর কারণ কী, দালালদের আর্থিক ভাগে সংশ্লিষ্ট অফিসকর্তারাও ভাগ বসান? এমন প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। কোথায় দালাল নেই? দেশের বিভিন্ন জেলায় পাসপোর্ট অফিসে দালালদের দৌরাত্ম্য। অনেক অভিবাসী দালাল ধরে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। নামসর্বস্ব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালগুলোতে রোগী টানতে ভাড়ায় খাটানো হচ্ছে নারী ও পুরুষ দালাল। বিআরটিএতে দালালের দৌরাত্ম্য। আর ভূমি অফিস, নির্বাচন কমিশন অফিসসহ কিছু অফিসের কথা বর্ণনা করতে গেলে কয়েক হাজার শব্দ লিখেও শেষ করা যাবে না।
বিভিন্ন অফিস ও হাসপাতালে মাঝেমধ্যে দালালদের ধরাও হয়। তারপর? কী হয়, কেউ জানে না। তখনই শুধু জানা যায়, যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটা করে কোনো দালাল শ্রেণিকে ধরে। এবার জানা গেল, কৃষিঋণ বিতরণে দালালের দৌরাত্ম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। এ বিষয়ে শুক্রবার দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। কৃষিঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে ছোট ও সমস্যাগ্রস্ত গ্রাহকদের হয়রানি না করে তাদের প্রতি মানবিক হতে ব্যাংকগুলোকে আহ্বান জানিয়েছেন গভর্নর। তিনি জানাচ্ছেন, ‘কৃষিকাজ করে মুনাফা হয় না। তাই এ খাতে নতুন করে মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে না। যে কারণে এ খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। কিন্তু এখনো বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে। কৃষিতে যেন মানুষ আকৃষ্ট হয় সে বিষয়টা সরকারকে দেখতে হবে। প্রতি বছরই আমাদের কৃষিঋণ বিতরণ বাড়ছে। আমরা একটি স্টাডি শুরু করেছি, যার মাধ্যমে দেখা হবে প্রকৃত কৃষকরা ঋণ পাচ্ছেন কি না। কৃষিতে সম্ভাবনা অনেক কিন্তু আমরা কাজে লাগাতে পারছি না।’ রাষ্ট্রীয় অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে দালালদের দৌরাত্ম্য রয়েছে।
সর্বক্ষেত্রেই এই সমস্যা। সরকারি অধিকাংশ সেবার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ দালালের সেবা নিতে বাধ্য হয়। কারণ হচ্ছে, এর ফলে তাদের ভোগান্তি যেমন কমে তেমনি কোনো কাজের ক্ষেত্রে নিশ্চিন্তও থাকা যায়। শুধু একটু অর্থ বেশি দিতে হয়। কিন্তু এই যে অনিয়মই ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে, এর ফলে মানুষের মনস্তত্ত্বেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আমরা মুখে যাই বলি না কেন, বাস্তবে তার প্রয়োগ তেমন চোখে পড়েনি।
সবপক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে প্রকৃত মানুষরাই নেতৃত্বে আসবে। সমাজকে নির্মাণের স্বার্থে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ প্রক্রিয়ায় দায়িত্ব প্রদান করলে সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব হবে। প্রতিহত করা যাবে দালালদের দৌরাত্ম্য। দালালদের আধিপত্য রোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের মতো যদি সত্যিকার অর্থেই দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এগিয়ে আসেন, তাহলে আমরা একটা নতুন সমাজ কাঠামোর দিকে এগিয়ে যেতে পারব। না হলে, শতভাগ দালালমুক্ত যেকোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের সেবা হবে গোপাল ভাঁড়ের ফিনফিনে অদৃশ্য পাতলা কাপড়ের মতো।
