মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বৈষম্যহীন সমাজেরই চেতনা

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:২৮ এএম

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের দুটি অত্যাবশ্যকীয় ভিত্তি। এ দুই বস্তু আমাদের দেশে আগে ছিল না। পৃথিবীর যেসব দেশ গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে সেখানে এরা আছে বলে বলা হয়, কিন্তু খুব যখন প্রয়োজন পড়ে তখন দেখা যায় তারা নেই। আমেরিকার নেতৃত্বে যখন পুঁজিবাদী বিশ্বের ইরাক ও আফগানিস্তান দখল চলল তখন সেই ঘটনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ছিল এমন কথা কেউ বলতে পারবেন না। দাবি করা হয়েছিল ইরাকে এমন সব ওয়েপনস অব মাস ডেস্ট্রাকশন রয়েছে যেগুলোর একটি মাত্র আঘাত অসংখ্য মানুষকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট; পইপই করে খোঁজা হলো কিন্তু আক্রমণ-উন্মাদেরা তেমন কোনো অস্ত্রের খবর বিশ্ববাসীকে দিতে পারল না। তবু দখল করা হলো, হত্যা এবং রক্তপাতের কোনো সীমা-পরিসীমা রইল না, কিন্তু না দেখা গেল স্বচ্ছতা, না দায় রইল জবাবদিহিতার। আফগানিস্তান দখলের অজুহাত ছিল তালেবানদের হটানো, যে তালেবানরা একদা মার্কিনিদের হাতেই তৈরি হয়েছিল, সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব থেকে আফগানিস্তানকে ‘মুক্ত’ করার জন্য। সে দেশে মানুষ ও সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে বিপুল; তালেবানরা নিশ্চিহ্ন হয়নি, তারা নানা উপায়ে ফিরে এসেছে। আফগানিস্তানের ধ্বংসকা-ের জন্য আমেরিকাকে জবাবদিহিতার কাঠগড়াতে দাঁড়াতে হয়নি না বিশ্ববাসীর কাছে, না নিজ দেশের জনগণের কাছে।

স্বচ্ছতা থাকলে ধরা পড়ত যে, উভয় ক্ষেত্রেই আসল উদ্দেশ্য ছিল দেশ দুটির জ্বালানি তেল ও খনিজসম্পদ হস্তগত করা; সেই সঙ্গে ছিল সমরাস্ত্র তৈরি এবং সেনাবাহিনীতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা। আমেরিকা এটাও দেখাতে চেয়েছে যে, তারা দুর্ধর্ষ, যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা করছে, সে জন্য কারও কাছে জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই। কোন যুক্তিতে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে তাদের বাসভূমি দখল করে বসে আছে তার জবাবও ইসরায়েল কখনো দেয়নি, দেবেও না। মিয়ানমারে কী ঘটছে সে ব্যাপারে স্বচ্ছতা নেই দেখে ‘গণতান্ত্রিক’ বিশ্ব বেশ ক্ষুব্ধ ছিল, সে দেশের নিষ্ঠুর সামরিক জান্তার ওপর নানাবিধ চাপও প্রয়োগ করা হয়েছে, যাতে তারা ‘উদার’ হয়। শেষ পর্যন্ত নাকি খানিকটা উদারতা প্রকাশে সম্মত হয়েছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ থেকে কেন বিতাড়িত করা হয়েছে, কেন নাগরিক অধিকার দেওয়া হয়নি, কেন তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। তাদের ঘরবাড়ি কেন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেওয়া হয়েছে, হত্যা করে এবং হত্যার হুমকি দিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে কেন পাহাড়ে জঙ্গলে নৌকায় পালাতে বাধ্য করা হচ্ছে তার কোনো ব্যাখ্যা উদারতা-প্রদর্শনকারী শাসকরা উপস্থিত করেনি। গণতান্ত্রিক বিশ্ব থেকেও এ ব্যাপারে কোনো প্রতিবাদ উঠছে না। অং সান সু চি মানবাধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করেছেন, বিশ্ব তার প্রতি সহানুভূতি জানিয়েছে, কিন্তু তিনি নিজে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা লাঘবের পক্ষে প্রথমে কোনো কথা বলেননি, পরে যা বলেছেন তা হতভাগ্য রোহিঙ্গাদের পক্ষে যায়নি।

আমাদের নিজেদের দেশেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার বিলক্ষণ অভাব রয়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোকে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা মানা হয়নি। সংসদের কার্যক্রমের দিকে তাকালে দেশে কোনো বিরোধী দলের উপস্থিতি আছে বলে টের পাওয়া যায়নি। শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারি হয়েছে, অপরাধীরা অধরা থাকে। পদ্মা সেতুর ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ভিত্তিটা কী জানা যায় না। সরকারি ব্যাংক থেকে হলমার্কওয়ালারা কীভাবে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিল সেটা রহস্যই রয়ে যায়। সাংবাদিক সাগর-রুনি দম্পতিকে কারা এবং কেন হত্যা করল সেটা পরিষ্কার হয় না। ইলিয়াস আলী ঢাকার রাস্তা থেকে উধাও হয়ে কোথায় চলে গেল তার কোনো হদিস নেই। এ ধরনের বড় বড় ঘটনার ক্ষেত্রেই যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চিহ্ন পাওয়া যায় না, তখন ছোটখাটো অপরাধের যারা ভুক্তভোগী তারা ন্যায়বিচার পাবেন, এমন আশা নিশ্চয়ই বাস্তবসম্মত নয়। বাস্তবেও তেমনটাই দেখা যাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে; খুন, ধর্ষণ, আত্মহত্যা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব দিক দিয়ে দেশ ছিল ঘটনাবহুল। অভাব কেবল ওই দুই বস্তুর স্বচ্ছতার ও জবাবদিহিতার, যাদের অভাব ঘটলে গণতন্ত্র আছে এমনটা বলা মুশকিল।

কিন্তু গণতন্ত্র তো এমনি এমনি আসে না, তার জন্য চাপের দরকার পড়ে। আর সেই চাপটা দিতে পারে অন্য কেউ নয়, জনসাধারণই। যে জন্য প্রত্যেক দেশেই জনগণের জন্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় শাসক শ্রেণিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অনুশীলনে বাধ্য করা। নিজের দেশে গণতন্ত্র এলে তবেই আন্তর্জাতিক পরিম-লে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করা সম্ভব। সুখের বিষয় এইটুকুই যে, বোধটা পৃথিবীব্যাপী এখন পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে, আমাদের দেশেও এই বোধের বিকাশ ও দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে। না হলে যতই গণতন্ত্রের কথা বলি না কেন, গণতন্ত্র আকাশকুসুমই রয়ে যাবে।

দেশে জ্বালানি তেল নিয়ে চলেছে তুঘলকি অনাচার। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নিম্নগামী অথচ সরকার আইএমএফের চাপে বারবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করে জনগণকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব ভোক্তা পর্যায়ের সব স্তরে পড়েছে। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনের অঙ্গীকারে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম দুবছর বিদ্যুৎব্যবস্থার উন্নয়নে ন্যূনতম ভূমিকা পালন করেনি। তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের সুযোগ নিয়ে কুইক রেন্টাল পদ্ধতির বাতাবরণে ব্যক্তিমালিকানাধীন কতিপয় প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের চুক্তি করে আর চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ ক্রয়ের আর্থিক বোঝা চাপানো হয় বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর। ছয়-আট দফায় বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করে ইতিহাস গড়েছিল। বিদ্যুৎ গ্রাহকদের ওপর স্ল্যাব পদ্ধতি আরোপ করে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিট ছয়টি স্ল্যাবে বিভক্ত করে ভিন্ন ভিন্ন দরে বিদ্যুৎ বিল আদায় করেছে। সর্বোচ্চ তেরো টাকা প্রতি ইউনিটের মূল্য নির্ধারণ করে বৈষম্যপূর্ণ ব্যবস্থা আরোপ করেছে। কুইক রেন্টালের নেতিবাচক প্রভাবে বিদ্যুৎগ্রাহক মাত্রই চড়া মাশুল দিয়ে আসছে।

দেশে ধর্ষণ আগেও ছিল, কিন্তু গত ক’বছরে তা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাঁচ-সাত বছরের শিশু পর্যন্ত রেহাই পাচ্ছে না। গণধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। ভারতের দিল্লিতে বাসে গণধর্ষণের একটি ঘটনা সারা ভারতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, আমাদের দেশে গণধর্ষণ, শিশুধর্ষণ ও নারী হত্যা অহরহ ঘটছে কিন্তু প্রতিবাদের আলোড়ন সৃষ্টি হচ্ছে না। পুলিশ ও আইনের প্রতি আস্থাহীনতার কারণে এবং সামাজিক বিড়ম্বনার ভয়ে আক্রান্তরা বেশিরভাগই বিষয়টি চেপে গেছে, প্রকাশ না করে। যে কয়টি প্রকাশ পেয়েছে সেগুলোর নগণ্য সংখ্যকই বিচার হয়েছে। ধর্ষকরা প্রধানত বেকার, অর্ধবেকার, বোধ-বিবেচনা বিবর্জিত এবং সংস্কৃতিহীন। বিদ্যমান ব্যবস্থা সুস্থ মানসিক বিকাশের পথ রুদ্ধ করছে, যার নেতিবাচক প্রভাবে আশাহীন ও আত্মসুখপরায়ণ তরুণ-যুবকরা, অসুস্থ, অমানবিক পন্থায় নিজেদের বিকার জাহির করছে।

ট্রেনে ডাকাতি নতুন নয়। যেটা যুক্ত হয়েছিল সেটা হচ্ছে ডাকাতি করে চলন্ত মানুষকে নিচে ফেলে দিয়ে হত্যা করা। এমনটা আগে দেখিনি। সহিংসতা সর্বসীমা লঙ্ঘন করেছিল। একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানিরা যা করেছে তা ছিল শত্রুপক্ষের কাজ, দেশের মানুষ নিজেরাই স্বদেশিদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। ওদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ও মানুষ গুম হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকান্ড কারা ঘটাল, কেন ঘটাল সে রহস্যের কোনো সমাধান হয়নি।

সমাজের সর্বত্র চলেছে হীন প্রতিযোগিতা। কে কাকে ডিঙিয়ে এগিয়ে যাবে, কাকে ধাক্কা দিলে নিজের অর্জন নিশ্চিত হবে সেটাই দাঁড়িয়েছিল প্রধান ঘটনা। ব্যক্তির উন্নতির এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সমষ্টি ক্রমেই পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, যা নির্বাচনের মাধ্যমে আসবে না, আসবে সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরের পথে। আমরা এমন ব্যবস্থা চাই, যা মানুষকে আশাহীন এবং ভবিষ্যৎহীন করবে না, সবার জন্য অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করবে। সে ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা ছাড়া আমাদের পরিত্রাণ নেই। এটা বললে অন্যায় হবে না যে, যাকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলি আসলে তা ছিল সমাজবিপ্লবেরই চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনাই ছিল বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বর্তমান শাসকরা সেটা পূরণ করতে না পারলে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন এবং অজস্র আত্মত্যাগ ভেস্তে যাবে।

লেখক:  ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত