সংস্কার নির্বাচন দুটোরই রোডম্যাপ দরকার

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৬:৪৮ এএম

দেশ রূপান্তর : প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আপনাদের আলোচনা কেমন হয়েছে?

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর : রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তারা একবার মাত্র বসেছিলেন। সেটাও সুনির্দিষ্টভাবে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস থাকবে কি না, সে মতামত জানার জন্য। তখনই আমরা অন্তর্বর্তী সরকারকে খুব স্পষ্ট করে বলেছিলাম, আপনাদের সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক ইস্যুগুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসতে হবে। মূল ইস্যু হচ্ছে, আপনি কবে নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন। এজন্যই আমি কয়েক দিন ধরেই জাতির সামনে একটা রোডম্যাপ দেওয়ার জন্য বলে আসছিলাম। আমরা আশা করেছিলাম, প্রধান উপদেষ্টা যখন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন, তখন তিনি সেটা জানাবেন। কিন্তু সেখানে তিনি বলেছেন, এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। তার মানে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ করতে হবে। তাই আমরা গত বৃহস্পতিবার উপদেষ্টাদের সঙ্গে আবার বসেছিলাম। পরে শনিবার আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার বৈঠক করেছে। আমাদের সঙ্গে বৈঠকে আমরা বলেছি, প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে একটি নির্বাচন আয়োজন করা এ সরকারের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বললে, মূল সমস্যাগুলো বেরিয়ে আসবে। সরকার কী সংস্কার করবে সেগুলো আসবে। এর ভিত্তিতে সংস্কারের একটি রোডম্যাপ তৈরি হবে। নির্বাচনেরও রোডম্যাপ তৈরি হবে। আমার বিশ্বাস, সব রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে সেই প্রস্তাব সরকার পেয়েছে এবং কাজ শুরু করেছে।

দেশ রূপান্তর : সংস্কার শেষ করে নির্বাচন চাচ্ছেন নাকি সংস্কার শুরুর পরপর নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দিয়েছেন?

মির্জা ফখরুল : আমরা বলেছি, যেটুকু সংস্কার করা দরকার, সেটুকু তারা করতে পারেন। আমার মনে হয় না, এজন্য খুব লম্বা সময় লাগতে পারে। যদি তাদের সদিচ্ছা থাকে, তারা অবশ্যই অল্প সময়ে তা পারবেন। তবে পুলিশ বাহিনীকে নতুন করে সাজানো, নির্বাচন কমিশন নতুন করে গঠন করা, জুডিশিয়ারিতে পরিবর্তন আনার মতো কতগুলো বুনিয়াদি সমস্যা সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। এগুলো সমাধান করতে না পারলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের চার গুরুত্বপূর্ণ খাত নির্বাচনব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা, জনপ্রশাসন এবং বিচার বিভাগ সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। এগুলো সংস্কার না করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে। মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দেবে। আবার এক-এগারোর মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

দেশ রূপান্তর : এক-এগারোর মতো বিরাজনীতিকরণের লক্ষণ কি দেখছেন?

মির্জা ফখরুল : লক্ষণ না ঠিক, আমি সতর্ক করছি। কিছু ফেস দেখলে আমরা ভয় পাই। আপনারাও দেখেছেন। কোনো দিন দেখিনি, হঠাৎ করে মিডিয়ার ফ্রন্ট পেজে চলে আসছে। তাদের বক্তব্য, তাদের থিওরি এগুলো প্রচারিত হচ্ছে। এটা সুস্থ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য আমার কাছে মনে হয়, খুব একটা ভালো বিষয় না আরকি। আমি কারও নাম বলতে চাই না। তাদের কখনই দেখলাম না, কোনো দিন সামনে আসতে দেখিনি, দেশের মানুষের সামনে আসলেন না। হঠাৎ করে দেখি তারা একেবারে ফ্রন্ট পেজে চলে আসছেন।

দেশ রূপান্তর : অন্য দলগুলোর সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বৈঠক করেছেন। সেখানে বিএনপির সমমনা দলগুলোও রয়েছে। তাদের অনেকে বলেছেন, সংস্কার শেষ করে তারপর নির্বাচন হোক। তাদের সঙ্গে বিএনপির পার্থক্য তৈরি হচ্ছে কি?

মির্জা ফখরুল : অন্য দলগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কী প্রস্তাব করেছে সেটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। কেননা, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব চিন্তাভাবনা রয়েছে।

দেশ রূপান্তর : জামায়াতও বলেছে, সংস্কারের পর নির্বাচন হবে। এটা কি এরকম যে, দলগুলো নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সুযোগ রয়েছে, তারাই সংস্কারের পর নির্বাচন চাচ্ছে?

মির্জা ফখরুল : জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক সুস্পষ্ট। আমাদের সঙ্গে জামায়াতের আগের যে সম্পর্ক সেটাই থাকবে। তারা একটি রাজনৈতিক দল, আমরাও রাজনৈতিক দল। তবে জামায়াতের সঙ্গে এই মুহূর্তে কোনো জোট বা বোঝাপড়ায় আমরা নেই। সরকার পতনের আন্দোলনের সময়ে জামায়াত বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করলেও এরপর আর তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এই মুহূর্তে তারা কী চাইল, সেটা তাদের নিজস্ব এজেন্ডা।

দেশ রূপান্তর : জাতীয় নির্বাচন কবে আয়োজন করা হবে, এমন সময়সীমার পরামর্শ কি আপনারা দিয়েছেন?

মির্জা ফখরুল : আমরা কোনো সময়সীমা বেঁধে দিইনি। তবে নির্বাচন কবে হবে এবং কীভাবে করবে সেই রোডম্যাপ জাতির সামনে তুলে ধরতে পরামর্শ দিয়েছি। যাতে নির্বাচনের পক্ষে থাকা সব অংশীজন তাদের পদক্ষেপগুলো সময়মতো নিতে পারে। আর সময়সীমা তো জানাবে অন্তর্বর্তী সরকার। এটা আমাদের কাজ নয়।

দেশ রূপান্তর : এই মুহূর্তে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ কী?

মির্জা ফখরুল : সংস্কারের মধ্য দিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত যাওয়া আমাদের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ। সংস্কারের মধ্য দিয়ে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে। মানুষ তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে, দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসবে ও জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে। এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে যৌক্তিক সময় দেওয়া ও তাদের সহযোগিতা করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : অন্তর্বর্তী সরকার এখনো স্থিতিশীল বা শক্ত অবস্থানে দাঁড়াতে পারেনি, এমনটি বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

মির্জা ফখরুল : এটা আসলে ঠিক নয়। তারা দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র কয়েক দিন। যেকোনো সরকারই স্থিতিশীল হতে একটু সময় নেয়। বর্তমান সরকারকেও সেই সময় দিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : বিএনপির নেতাকর্র্মীদের মামলার কী হবে?

মির্জা ফখরুল : এক-এগারো থেকে এ পর্যন্ত বিএনপির ৬০ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি রাজনৈতিক ও হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কথা হয়েছে। যেসব রাজনৈতিক মামলা এখনো আছে, কিছু আইনগত পদ্ধতি অনুসরণ করে তা প্রত্যাহার বা নিষ্পত্তি করা হবে বলে আমাদের বলা হয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি এসেছে। এ ব্যাপারে বিএনপির অবস্থান কী?

মির্জা ফখরুল : আমি কখনই কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের পক্ষে নই। আমার দলও সেটা বিশ^াস করে না। আমরা একটা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পলিটিক্যাল পার্টি (উদার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল)। আমরা বরাবরই বহুদলীয় গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করেছি। আমাদের দল, আমাদের নেতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেছেন। আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা না নেওয়া আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্ত। এখানে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।

দেশ রূপান্তর : ভারতে চলে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখান থেকে নানা ষড়যন্ত্র করছেন বলে অভিযোগ। এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

মির্জা ফখরুল : তিনি (শেখ হাসিনা) ক্রিমিনাল মামলায় অভিযুক্ত। হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত। সুতরাং আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, তাকে যতদ্রুত সম্ভব বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সম্মুখীন করা।

দেশ রূপান্তর : ভারতসহ অন্য দেশের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের চুক্তিগুলো জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি কি বিএনপি করবে?

মির্জা ফখরুল : আমরা আগেই দাবি করেছি। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের কাছে। এই অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও দাবি করেছি, গত সাড়ে ১৫ বছরে সরকারের যে গোপন চুক্তিগুলো করেছে, তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক।

দেশ রূপান্তর : ক্ষমতায় গেলে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি কী হবে?

মির্জা ফখরুল : কোনো বিশেষ দেশ বা দলের সঙ্গে নয়, বিএনপির বন্ধুত্ব হবে দেশগুলোর জনগণের সঙ্গে। প্রত্যেকটা দেশের সঙ্গে সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রেখেই সম্পর্ক হবে।

দেশ রূপান্তর : দেশব্যাপী বিএনপির বিরুদ্ধে জবরদখলের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

মির্জা ফখরুল : এটা দুঃখজনক। এ বিষয়ে দল থেকে কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতা পেলে বহিষ্কার বা কারণ দর্শানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিএনপির নামে কেউ চাঁদাবাজি করলে তাকে ধরে পুলিশ দিন। কিন্তু এরই মধ্যে দেখেছেন, প্রায় প্রত্যেক জায়গায় এসব কাজের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ জড়িত বলে খবর বের হচ্ছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বিএনপির ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার মতো খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক নেই।

দেশ রূপান্তর : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান কবে নাগাদ দেশে ফিরবেন?

মির্জা ফখরুল : তারেক রহমানের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোর আইনগত ভিত্তি নেই। পুরোপুরি বানোয়াট, প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে মামলাগুলো করা হয়েছে। তার ফিরে আসা দেশের জন্য, দলের জন্য খুব প্রয়োজন।

দেশ রূপান্তর : খালেদা জিয়ার বিদেশে চিকিৎসার জন্য কবে যাবেন?

মির্জা ফখরুল : শিগগিরই তিনি চিকিৎসার জন্য যাবেন। নানা ধরনের প্রক্রিয়া রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি কাজগুলো দ্রুত শেষ করতে। তিনি ফ্লাই করার মতো শারীরিক অবস্থায়ও নেই। তবে সবকিছু আমরা গুছিয়ে এনেছি।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

মির্জা ফখরুল : দেশ রূপান্তরকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত