দেশ রূপান্তর : অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
ডা. শফিকুর রহমান : আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করে শেষ করে দিয়েছে। বিশেষ করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে। এখন অন্তর্বর্তী সরকারকে এসব প্রতিষ্ঠান রক্ষায় উদ্যোগ নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে তার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া বিগত দিনে হত্যা, খুন, গুম হয়েছে তার বিচার করতে হবে। বিশেষ করে এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হতে হবে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু তদন্ত হতে পারে। আমরা দলীয়ভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে কিছু সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেছি। আশা করছি সরকার এসব সংস্কার প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে তা বাস্তবায়ন করতে শুরু করবে। প্রয়োজনে আর কিছু সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া হবে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব অনেক। তারা আওয়ামী-বাকশালীদের হাত থেকে একটি বিধ্বস্ত দেশ পেয়েছেন। তাই দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংশোধনে সরকারকে যৌক্তিক সময় দিতে হবে। আর দেশের মানুষ ন্যায়বিচার চায়। দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা না গেলে স্বাধীনতা কখনো অর্থবহ হয়ে উঠবে না বা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করা যাবে না।
দেশ রূপান্তর : রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন রয়েছে নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।
ডা. শফিকুর রহমান : নির্বাচন নিয়ে আমাদের প্রস্তাব আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জানিয়েছি। পাশাপাশি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছি। আমরা আশা করি সরকার রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার কাজ শুরু করবে। তবে এজন্য আমরা সরকারকে দীর্ঘ সময় দিতে চাই না। সরকার সংস্কার কাজ শুরু করে নতুন নির্বাচন দেবে। এরপর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার সে সংস্কার কাজ শেষ করবে। ইতিমধ্যে আমাদের পাশাপাশি বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছে। পৃথকভাবে সংস্কার প্রস্তাব দিয়ে এসেছে। এখন সরকারের পালা। তারা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবগুলো বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সবকিছুর বিষয়ে জাতির কাছে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য তুলে ধরবে। আমরা সে আশায় রয়েছি।
দেশ রূপান্তর : সাড়ে ১৫ বছর পর সরকারের পতন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছুটা অস্থিরতা বিরাজ করছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের প্রতি আপনাদের কোনো পরামর্শ আছে কি না?
ডা. শফিকুর রহমান : সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। দীর্ঘদিনের সমস্যা একদিনে সমাধান করা সম্ভব নয়। আশা করি প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে উপদেষ্টারা অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাস্তায় ট্রাফিক সমস্যাসহ সব সমস্যা সমাধানে কার্যকরী উদ্যোগ নেবেন। রাজনৈতিক দল হিসেবে কোনো সহযোগিতা চাইলে আমরা সর্বাত্মক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
দেশ রূপান্তর : ভারতের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক চায় জামায়াতে ইসলামী?
ডা. শফিকুর রহমান : জামায়াতে ইসলামী সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। সেই ধারণাটা হলো জামায়াত ভারতবিরোধী। এটা আসলে ঠিক নয়। এই ধারণা পরিবর্তন করা দরকার।। আমরা বাংলাদেশপন্থি এবং আমরা একমাত্র বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষায় আগ্রহী। ভারত আমাদের প্রতিবেশী এবং আমরা একটি ভালো, স্থিতিশীল ও সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক চাই। ভারত অতীতে এমন কিছু কাজ করেছে, যা বাংলাদেশের জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালের বাংলাদেশের নির্বাচনের সময় এক ভারতীয় কূটনীতিক ঢাকা সফর করেছিলেন এবং নির্বাচনে কার অংশগ্রহণ করা উচিত এবং কাদের উচিত নয় সেই বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এটি অগ্রহণযোগ্য। কারণ, এটি একটি প্রতিবেশী দেশের ভূমিকা নয়।
আমরা বিশ্বাস করি, ভারত অবশেষে তার পররাষ্ট্রনীতি পুনর্মূল্যায়ন করবে। আমরা মনে করি, একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বন্ধ করা উচিত। জামায়াতে ইসলামী চায়, ভারত বন্ধু হোক এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করুক।
দেশ রূপান্তর : দীর্ঘদিন পর জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে। আগামী দিনে জামায়াতের কর্মপরিকল্পনা কী?
ডা. শফিকুর রহমান : আওয়ামী লীগ দেশকে মেধা ও নেতৃত্বশূন্য করার জন্যই কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে প্রহসন করে শীর্ষ ১১ জন জাতীয় নেতা ও বরেণ্য আলেমদের নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যার মহড়া চালিয়েছে। তারা পাঁচজন নেতাকে প্রহসনের বিচারের নামে ফাঁসিতে হত্যা এবং আরও পাঁচজন নেতাকে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখানেই শেষ নয় বরং জামায়াতকে ধ্বংস করার জন্য শত শত নেতাকে হত্যা করেছে। পঙ্গু করেছে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে। তারা অন্যান্য বিরোধী দলের ওপরও নির্মম দমন-পীড়ন চালিয়েছে। রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। শুধু জামায়াত কেন, এতদিন সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা এবং বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ কোনো পেশার মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারেননি। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের রাজনীতি করতে পারেনি। এখন জামায়াতসহ সবাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ রাজনীতি করতে পারবে।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদীরা ছাত্র-জনতার তীব্র গণআন্দোলনে দিশেহারা হয়ে জামায়াত নিষিদ্ধ করেছিল। তারা জামায়াতের ওপর দায় চাপিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন বিভ্রান্ত করার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু আমরা সে পাতানো ফাঁদে পা দিইনি। ফলে সব ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে মাত্র ২৬ দিনের মাথায় আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেয়েছি।
জামায়াতে ইসলামী জনগণের জন্য, জনগণের স্বার্থে কাজ করে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আগামী দিনে জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করবে। পাশাপাশি বিশ্বের দরবারে দেশকে সম্মানের আসনে বসানোর জন্য কাজ করবে।
সরকারের পাশাপাশি সাংবাদিকদের দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিক সমাজ জাতির বিবেক ও দর্পণ। কিন্তু আওয়ামী শাসনামলে তারা স্বাধীন ও বিবেক সম্মতভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তাই সময় এসেছে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করার। গণমাধ্যম আমাদের গঠনমূলক সমালোচনা করবে। এ বিষয়ে আমাদের কোনো হীনম্মন্যতা নেই। দেশ ও জাতির কল্যাণে দেশের সাংবাদিক সমাজ অতন্ত্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে।
দেশ রূপান্তর : গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে আপনি গঠনমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। অনেকেই এসব বক্তব্যকে সাধুবাদ দিচ্ছে। আপনার দল কীভাবে দেখছে বিষয়গুলো।
ডা. শফিকুর রহমান : দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে জামায়াতের মতো একটি সুশৃঙ্খল দলের দায়িত্বে এসেছি। দলের দুঃসময়ে হাল ধরে এতদূর নিয়ে এসেছি। দীর্ঘদিন আমরা নির্যাতিত ছিলাম। এখন আমরা মুক্ত বিহঙ্গ। দলের নেতাকর্মীদের আকণ্ঠ সমর্থনেই এগিয়ে যাচ্ছি। এখন আরও দায়িত্ব বেশি। দলের পাশাপাশি দেশের মানুষের জন্য কিছু করার সুযোগ এসেছে। দলের সবার মতামতের ভিত্তিতে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
