সংস্কার যেন গোষ্ঠীনির্ভর না হয়

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০৪:৪৭ এএম

দেশ রূপান্তর : ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এ সরকার নিয়ে আপনার দলের মূল্যায়ন কী?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমরা শুরুতেই দাবি করেছিলাম, ক্রিয়াশীল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সরকার গঠন করা হোক। কিন্তু আমাদের সেই কথা উপেক্ষা করা হয়েছে। তারপরও যেহেতু গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ সরকার গঠিত হয়েছে, তাদের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে। ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন আমাদের দল পরিষ্কারভাবে বলেছে, পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রতিকার অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

দেশ রূপান্তর : আন্দোলনের শুরু থেকে আপনাদের সমর্থন ছিল। মাঠেও আপনাদের দলের অবস্থান ছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এখনো মতবিনিময়ের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আপনাদের ডাকা হয়নি। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমাদের এখন পর্যন্ত একবারই ডাকা হয়েছিল, ১২ আগস্ট। সেটা ছিল সৌজন্য সাক্ষাতের মতো। সে সময় আমাদের বলা হয়েছিল সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের ডাকবেন। সেখানে সংস্কার ও অন্যান্য বিষয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু আমরা খুবই উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, এখন পর্যন্ত তার কোনো আলামত দেখতে পাচ্ছি না। আমরা সংস্কার ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে প্রস্তাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা আশা করি, তারা অচিরেই আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের ডেকে আলোচনা করবেন।

দেশ রূপান্তর : যদি ডাকা হয়, সে ক্ষেত্রে কোন ধরনের রূপরেখা বা প্রস্তাব দেবে আপনাদের দল?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমরা অপেক্ষা করছি, অন্তর্বর্তী সরকার কী ধরনের রোডম্যাপ দেয়। এই রোডম্যাপ দেওয়ার সময় সরকার যদি বলে, আমরা এ ধরনের কাজ করব। আমরাও তখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত জানাতে পারব। তারপরও সরকার যদি বলে, আপনারা একটা রূপরেখা দেন, তখন আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে হোক বা মিডিয়ার মাধ্যমে, সেটা প্রকাশ করব। সরকার চাইলে আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে, আমাদের যে শ্রেণিপেশার মানুষ আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে সরকারকে একটা রূপরেখা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমাদের নির্বাচনব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচনব্যবস্থার আমূল সংস্কার দরকার। এ ছাড়া দেশের অনেকগুলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এমনভাবে দলীয়করণ হয়েছে, দুর্নীতিকরণ হয়েছে, এগুলো মুক্ত করা দরকার। না হলে একাটা ভালো নির্বাচন সম্ভব নয়। অন্যান্য সংস্কার যেসব রয়েছে, এগুলো শুরু করে দেওয়া হোক, যাতে নির্বাচিত সরকার বাকি কাজগুলো করতে পারে। আমরা এ কথাটাই তাদের বলব, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারের জন্য তারা যেন আলোচনা শুরু করে।

দেশ রূপান্তর : বর্তমান অবস্থা থেকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পূর্ণ প্রতিষ্ঠায় অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আপনারা কী ধরনের রূপরেখা প্রত্যাশা করেন। কত সময়ের মধ্যে হলে আপনাদের কাছে যৌক্তিক মনে হবে?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমরা চাই এ সরকার বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে যেসব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলো সংস্কার কাজ শুরু করুক। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনব্যবস্থার আমূল সংস্কারের আলোচনা শুরু করতে হবে। তখন আমরা সংস্কারের বিকল্প ধারা হাজির করব। সময় তিন দিন, না চার দিন এ বিষয়ে এখন কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এই যে কাজগুলোর কথা বললাম, এটা যদি পজিটিভভাবে শুরু করে, তখন আমরা বিবেচনা করব কতটুকু সময় সরকারকে দেওয়া দরকার। সরকারকে আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, আমলা বা বিশেষ গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে সংস্কার করতে পারবেন না। সংস্কার করতে গেলে ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দল, চিন্তক ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের সহায়তা নিতে হবে। সে সহযোগিতা করার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি।

দেশ রূপান্তর : সংবিধান সংস্কার ও পুনর্লিখনের কথা উঠেছে। এ বিষয়ে আপনাদের অবস্থান কী? বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে আপনাদের যে অবস্থান, তার পরিপ্রেক্ষিতে কী ধরনের পরিবর্তন আপনাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমরা কোনোভাবেই বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতির পরিবর্তন মেনে নেব না। যদিও আমাদের দল ও বামপন্থিরা অনেক দিন ধরে বলে এসেছি, সংবিধানে অনেক অসম্পূর্ণতা আছে। বিভিন্ন সময় সংবিধান সংশোধনের নামে অগণতান্ত্রিক ধারা, কালাকানুন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সময় সংবিধানের সংশোধনীতে স্বৈরাচারী উপাদান সংযোজিত হয়েছে। এজন্য আমরা বলেছি, বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতি অব্যাহত রেখে অসম্পূর্ণতা দূর করতে হবে। অগণতান্ত্রিক কালাকানুন বাতিল করতে হবে। তা করতে হবে সংবিধানের মূল ভিত্তি ঠিক রেখেই। কিন্তু যদি মনে করেন, এই সংবিধান বাতিল করে নতুন করে পুনর্লিখন করতে হবে, আমরা তার সঙ্গে একমত নই।

দেশ রূপান্তর : কেউ কেউ বাংলাদেশের সংবিধান বাতিল ও জাতীয় সংগীত পরিবর্তনের দাবি তুলেছেন। বিষয়টি আপনারা কীভাবে দেখছেন?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমরা আশা করেছিলাম, এই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা মানুষের কাছে পৌঁছাবে। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি মুক্তিযুদ্ধকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বাহাত্তরের সংবিধানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, জাতীয় সংগীতকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, যা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। আমরা বিশ্বাস করি, এই অপশক্তিকে দেশবাসী গ্রহণ করবে না। দেশবাসীকে, বিশেষ করে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সাধারণ ছাত্র-জনতাকে এসব অপশক্তি সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। তাদের প্রতিহত করতে হবে।

দেশ রূপান্তর : দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আপনাদের পর্যবেক্ষণ কী? পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতার বিষয়ে কী বক্তব্য আপনাদের?

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আমরা খুবই উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথাযথ উন্নতি হয়নি। মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায়, আমরা দেখতে পাচ্ছি নানা জায়গায় ‘মব জাস্টিস’ হচ্ছে বা করা হচ্ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।

দেশ রূপান্তর : সরকার পতনের পর বিভিন্ন জায়গায় দখল, চাঁদাবাজি, শিক্ষক হেনস্তা, আদালতে হাজির করার সময় আসামিদের গায়ে হাত তোলা হচ্ছে, এগুলো প্রশমনে সরকার কতটা ভূমিকা রাখছে, এ বিষয়ে আপনাদের পরামর্শ কী হবে।

রুহিন হোসেন প্রিন্স : এই গণ-অভ্যুত্থানে কোনো বিশেষ দল বিজয়ী হয়নি। বিজয়ী হয়েছে দেশের আপামর মানুষ। কিন্তু আমরা দেখলাম, এক চাঁদাবাজ গিয়ে আরেক চাঁদাবাজের আবির্ভাব। এক দখলদারের পরিবর্তে আরেক দখলদার। আমরা দেখতে পাচ্ছি, একাত্তরের ঘাতক চক্র সক্রিয় আছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি, পতিত স্বৈরাচারের শক্তিও সক্রিয় আছে। ৫৩ বছরে বাংলাদেশে যারা অগণতান্ত্রিক শাসন কায়েম করেছে, তারাও সক্রিয় আছে।

যারা এত বছর ধরে অন্যায় বা বেআইনি কাজ করেছে, তাদের বিচার করতে সুনির্দিষ্ট মামলা দরকার। কিন্তু অতীতের সরকার প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে যেমন করেছে, সেটার পুনরাবৃত্তি উচিত হবে না। মামলার পরে আদালতে হাজিরা দিতে যেতে হয়, আসামিদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দরকার। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মব জাস্টিসের নামে যেটা হচ্ছে, এটা খুবই অন্যায় এবং অনৈতিক, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। আমরা সরকারকে বলব, ক্ষিপ্রতার সঙ্গে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে এবং নীতিমালা প্রণয়ন করে দলীয় ব্যক্তিদের অপসারণ করে দক্ষ এবং দলনিরপেক্ষ যোগ্য ব্যক্তি নিয়োগ দিতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।

রুহিন হোসেন প্রিন্স : আপনাকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত