হলিউডের তারকা মানেই জীবন চাকচিক্যময় নয়

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৫৬ পিএম

খ্যাতি। মানুষ যখন খ্যাতি শব্দটি শোনে, তখন তারা নাম, যশ, বিলাসিতা, অর্থ ও প্রশংসার কথা চিন্তা করে। তবে খ্যাতির জন্য বেশ মূল্য দিতে হয়। তারই একটি উদাহরণ হলো হলিউড। বহু প্রজন্ম ধরে হলিউডকে বিনোদনশিল্পে গ্ল্যামার এবং সাফল্যের চূড়ান্ত প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। হলিউড এমন একটি জায়গা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে সবার ধারণা প্রতিভাবান শিল্পীরা তারকাখ্যাতি ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করতে পারে। চকচক করলেই যেমন সোনা হয় না, তেমনি হলিউডের তারকা মানেই জীবন চাকচিক্যময় নয়।

পাপারাজ্জিদের হয়রানি

১৯৫০-এর দশক থেকে পাপারাজ্জি কর্তৃক তারকাদের হয়রানি শুরু এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা আরও খারাপ হয়েছে। তখন ম্যাগাজিন এবং অন্যান্য মিডিয়া আউটলেটের জন্য সেলিব্রেটিদের খোলামেলা ছবি পাওয়ার উৎস ছিল তারা। আজকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার বিপরীতে, তখনকার সময়ে সেলিব্রেটিদের দৈনন্দিন জীবনে উঁকি দেওয়ার জন্য খুব কম সুযোগ ছিল। ‘পাপারাজ্জো এক্সট্রা অর্ডিনেয়ার’ রন গ্যালেলা, যিনি পাপারাজ্জিদের গডফাদার হিসেবে পরিচিত। ১৯৬০-এর দশকে গ্যালেলা একজন আমেরিকান ফটোগ্রাফার হিসেবে তার ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন। তারকাদের অত্যন্ত চমকপ্রদ ফটোগ্রাফ নেওয়ার মাধ্যমে অল্পদিনে প্রচুর পরিমাণে অর্থ উপার্জন করেছিলেন। তারকাদের জীবনে পাপারাজ্জিরা যে বিরূপ প্রভাব ফেলে, তার অন্যতম উদাহরণ ব্রিটনি স্পিয়ার্স ও লিন্ডসে লোহান। পাপারাজ্জি সংস্কৃতির সেই সময়ে স্পিয়ার্স ও লোহানের মতো তারকারা তাদের নিজ নিজ ক্যারিয়ারের শীর্ষে ছিলেন। ফলে স্পিয়ার্স ও লোহানকে প্রায় সর্বত্র অনুসরণ করত পাপারাজ্জিরা এবং তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ক্যামেরায় ধরা পড়ত। এসব ফটোগ্রাফ ব্যবহার করে ট্যাবলয়েডগুলোয় তারকাদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আক্রমণাত্মক লেখা প্রকাশ করা হতো। সেলিব্রেটি শিশুদের হয়রানি রোধে ও এর শাস্তি বৃদ্ধিতে ২০১৩ সালে হ্যালি বেরি এবং জেনিফার গার্নার আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।

অ্যাওয়ার্ড কেলেঙ্কারি

লাল গালিচা, আলোর ঝলকানি, সুন্দর পোশাক ও স্যুট। প্রতিটি অ্যাওয়ার্ড শোতে হলিউড তারকাদের এ ধরনের চাকচিক্য ও গ্ল্যামারের দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু হলিউড সংস্কৃতির অন্য অনেক দিকের মতো, এই ঝলমলে চাকচিক্যের নিচেও একটি অন্ধকার জগৎ রয়েছে। বিনোদনের অন্যতম চারটি প্রধান পুরস্কার অস্কার, টনি, এমি ও গ্র্যামি। প্রথম ১৯৫৯ সালে দেওয়া হয়েছিল গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। রেকর্ডিং একাডেমি একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড প্রদানে পক্ষপাত ও ভোটদান প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। ফলে গ্র্যামিকে ‘স্ক্যামিস’ বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে দ্য উইকেন্ড তার অ্যালবাম ‘আফটার আওয়ার্স’ ২০২০ সালে স্পটিফাইয়ের সর্বাধিক জনপ্রিয় অ্যালবাম হওয়া এবং এর সামগ্রিক সফলতা সত্ত্বেও গ্র্যামির জন্য মনোনীত হয়নি। এ নিয়ে অনেক সংগীতশিল্পী যেমন নিকি মিনাজ, জায়ান মালিক এবং দ্য উইকঅ্যান্ড রেকর্ডিং একাডেমির বিরুদ্ধে অনলাইনে সরব প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ২০২০ সালে সেরা র‌্যাপ অ্যালবামের পুরস্কার জেতার পর টাইলার দ্য ক্রিয়েটর রেকর্ডিং একাডেমিকে নিয়ে তার অসন্তুষ্টির কথা প্রকাশ করেছিলেন। এর ফলে অনেক শিল্পী গ্র্যামির মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা গ্র্যামিতে অংশ নেওয়া বয়কট করেছেন।


স্বজনপ্রীতি

সেলিব্রেটিদের সন্তানের জন্য বিনোদনশিল্পে অনেক বেশি স্বজনপ্রীতি দেখানো হয়। হলিউডে বিখ্যাত অনেক অভিনেতা, মডেল এবং গায়কদের এই শিল্পে বাবা-মা রয়েছে। অভিনেত্রী ও টকশো হোস্ট ড্রিউ ব্যারিমোর, হলিউডের ব্যারিমোর পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ এই অভিনেত্রীর প্রপিতামহ হলেন মরিস ব্যারিমোর। এ ছাড়া দ্য উইজার্ড অব ওজখ্যাত অভিনেত্রী লিজা মিনেলি হলেন জুডি গারল্যান্ডের মেয়ে। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ‘ড্রিউ ও লিজা’র মতো অনেক হলিউড শিল্পীর প্রতি স্বজনপ্রীতি বিদ্যমান ছিল। পরিচালক, অভিনেতা ও প্রযোজক স্টিফেন বল্ডউইনের মেয়ে ও মডেল হেইলি বিবার ‘নেপো বেবি’ লেখা শার্ট পরে টুইটারে ভাইরাল হয়েছিলেন।

অনলাইন বিষাক্ত ফ্যানবেজ

আপনি যদি ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকে থাকেন, তবে সম্ভাবনা হলো আপনি ইতিমধ্যে একটি বিষাক্ত ফ্যানবেজের মুখোমুখি হয়েছেন। ফ্যানসংস্কৃতি শার্লক হোমসের সময় থেকেই রয়েছে এবং আজ তারা মূলত অনলাইন জগতে বিদ্যমান। আজকাল ফ্যানসংস্কৃতি বিনোদনশিল্পকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে, যার কবল থেকে মুক্ত নন হলিউডের শিল্পীরাও।

তারকাখ্যাতির পরীক্ষা ও দুর্দশা

তারকাখ্যাতি অর্জনের জন্য নিজেকে সবার সঙ্গে মানিয়ে রাখতে হয় এবং প্রতিনিয়ত ইমেজ বজায় রাখতে হবে। এটি করার ফলে অনেকে মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ব্রিটনি স্পিয়ার্স তার সময়কালে অনেক সংগ্রাম মোকাবিলা করেছেন। ১৯৫০ সালে নির্মিত হয় হলিউডের ক্ল্যাসিক সিনেমা ‘সানসেট বুলেভার্ড’। এতে নর্মা ডেসমন্ড চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেত্রী নিজেকে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে ছাড়া কোনো প্যারামাউন্ট স্টুডিও হতে পারে না।’ নিজেকে এমন মনে করার কারণ হলো তিনি খ্যাতি ধরে রাখার জন্য অপরাধসহ যেকোনো কিছু করতে পারেন।

যৌনতা ও মাদক

হলিউডে মাদকের ব্যবহারকে বিনোদন ও রোমান্টিকতার উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ নিয়ে ২০১১ সালে দ্য হলিউড রিপোর্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা ডেনিস কায়েদ জানান, ‘এটি খুব স্বাভাবিক বিষয়, সবাই যখন পার্টিতে যেত, তখন সেটাই করে। আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল কোকেনে আসক্ত হওয়া।’ ১৯৮০-এর দশকে হলিউডে মাদক এতটাই প্রচলিত ছিল, সিনেমার বাজেটেও রাখা হতো কোকেন সেবনের খরচ। এসব মাদক মূলত সিনেমার সেটে সরবরাহ করা হতো।

মানসিক সমস্যা

বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে হলিউড তারকাদের মানসিক সমস্যার কথা। এসব গবেষণায় বলা হয়েছে, অনেক সেলিব্রেটিই মানসিক রোগে ভুগছেন। ‘ইউনাইটেড উই কেয়ার’ তাদের একটি নিবন্ধে হলিউডকে ‘মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার অংশ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, অনেক তারকা মানসিক লড়াইয়ে হেরে যাওয়ার কয়েকটি কারণ জানিয়েছেন। তারা জনসাধারণের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হন, পাশাপাশি সবাইকে সন্তুষ্ট রাখার একটি চাপ রয়েছে। এ ধরনের চাপ হতাশা এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করে, যা বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আইকনিক মেরিলিন মনরোসহ অনেকেই মাত্রাতিরিক্ত মাদক সেবনের ফলে আত্মহত্যা করেছেন বা মারা গেছেন। নিবন্ধ অনুযায়ী, সবার সঙ্গে মানিয়ে নিতে ও সুযোগ হাতছাড়া না করতে তারা মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়েন।

অনলাইন অবলম্বনে এএসএম বুখারী

 
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত