গাজীপুর বাইপাসের পেয়ারা বাগান এলাকায় একটি হোটেলে কাজ করতেন মো. মোরসালিন (১৬)। বাবা হারানো মোরসালিন ওই এলাকায় মা নাসিমা বেগমের সঙ্গে থাকেন। বাবা না থাকায় তৃতীয় শ্রেণিতেই পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে হোটেলে কাজ নেন। মোরসালিনের মা আমেনা বেগমও গার্মেন্টস কাজ করতেন। মা-ছেলের উপার্জনে ভালই চলছিল সংসার।
কিন্তু গত ৫ আগস্ট মা-ছেলের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। ছাত্র-জনতার ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির দিনেও নিত্যদিনের মতো হোটেলে কাজে যায় মোরসালিন। কাজে যোগদানের কিছুক্ষণ পরেই হোটেল বন্ধ করার কথা জানায় হোটেল কর্তৃপক্ষ। ওইদিন গাজীপুর এলাকায় সকাল থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল পুলিশ। মালিকের কথা অনুযায়ী দোকান বন্ধ করে রাস্তা পার হওয়ার সময় খুব কাছ থেকে মোরসালিনের ডান পায়ে গুলি করে এক পুলিশ সদস্য । সেই থেকে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতালে) ভর্তি আছেন তিনি।
আজ মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল) মডেল বি-ওয়াডের্র ৩০ নম্বর বেডে মোরসালিনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। পঙ্গু হাসপাতালের মডেল বি-ওয়ার্ডটি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত রোগীদের জন্য বিশেষায়িত ওয়ার্ড করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই ওয়ার্ডে বর্তমানে ৪০ জন রোগী ভর্তি আছেন। যাদের প্রত্যেকেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। যাদের নিত্যদিনের সঙ্গী এখন অসহ্য যন্ত্রনা।
ওইদিনের ঘটনা জানতে চাইলে মোরসালিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গাজীপুর বাইপাস এলাকায় আমার মালিকের দুইটি হোটেল। একটি ছোট অন্যটি বড়। আমি সকাল বেলা ছোট হোটেলে গিয়ে কাজ শুরু করি। তখন আমাদের হোটেলের বাইরেই আন্দোলন শুরু হয়। বিষয়টি মালিক জানার পর আমাদের হোটেল বন্ধ করে বাড়ি যেতে বলে। আমিসহ অন্যান্য কর্মচারীরা হোটেল বন্ধ করে বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখনও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। আমি রাস্তার একপাশ ধরে হাটতে থাকি। হঠাৎ পুলিশ আমার দিকে অস্ত্র তাক করে। তখন আমি পুলিশকে জানাই ‘আমি শিক্ষার্থী না, হোটেলের কর্মচারী।
এই কথা বলার পরেই এক পুলিশ সদস্য ‘তুই ছাত্র’ বলেই খুব কাছ থেকে আমার ডান পায়ে গুলি করে। তারপর পুলিশ সামনে এগুতো থাকে। গুলি খাওয়ার পরেও আমার জ্ঞান ছিল। আমার কাছে থাকা ফোন দিয়ে আমি মালিককে বিষয়টি জানাই। এই কথা শোনার সঙ্গেই মালিক ফোন কেটে দেয়। পরে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে শুনেছি হোটেলের অন্য কর্মচারীরা পুলিশ যাওয়ার পর আমাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। তারপর আমার মাকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানায়। গত ৭ আগস্ট থেকে আমি এই হাসপাতালে আছি। ওই দিনেই আমার পা কাটা হয়েছে।’
গুলি খাওয়ার আগ মুর্হুতের দৃশ্য জানতে চাইলে কান্নাজড়িত কন্ঠে মোরসালিন দেশ রূপান্তরকে আরও বলেন, ‘গুলি থেকে বাঁচতে আমি পুলিশের হাত-পায়ে ধরি। তবুও তারা আমার পায়ে গুলি করে। আমারে তারা পঙ্গু বানাই দিল। এর সুষ্ঠু বিচার চাই আমি।’
তার সঙ্গে কথা বলার সময় বেডের পাশে বসে কাঁদছিলেন নাসিমা বেগম। ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর কীভাবে জেনেছেন জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুপুরের দিকে আমার ছেলের ফোন থেকে কল দিয়ে একজন জানায়, আপনার ছেলে গুলি খাইছে, দ্রুত জয়দেবপুর হাসপাতালে আসেন। তখন রাস্তায় কোন যানবাহন না থাকায় আমি দৌঁড়াতে থাকি। পরে একটি রিকশা করে হাসপাতালে গিয়ে দেখি ছেলে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসি। আমার সুস্থ সবল ছেলেটা এখন পঙ্গু। যারা এই কাজের সঙ্গে জড়িত তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই আমি। আর সরকারের কাছে দাবি, ‘আমার ছেলেসহ যারা আন্দোলনে আহত আছেন তাদের যেন সরকার সহযোগিতা করে। যাতে ভবিষ্যতে তারা কাজ করে খেতে পারে। ভাতা নয় আমি চাই বসে থেকে যে কাজগুলো করা যায় সেই ব্যবস্থা যেন সরকার করে দেয়। আর যারা শহিদ হয়েছেন তাদের যেন সহযোগিতা করে।’
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহতদের তদারকি করছে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। পঙ্গু হাসপাতালের প্রবেশপথেই তাদের একটি ডেস্ক আছে। সেখানে মো. আসিফ নামের এক সেচ্ছাসেবক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত ৯৪ জন এখন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। চিকিৎসা শেষে প্রতিদিন কয়েকজন হাসপাতাল ছাড়ছেন। আর যারা ভর্তি আছেন তাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সমাজসেবা থেকে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। তার বাইরে কিছু লাগলে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি।’
‘ভাবিনি আর কখনও সন্তানদের আদর করতে পারব’
আইডিয়াল ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ
হঠাৎ কেন বাড়ল লোডশেডিং?
বিল পাস বন্ধ, স্থবির হয়ে পড়েছে দেশের আর্থিক কার্যক্রম