নির্বাচন-পরবর্তী মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি কী হতে পারে, তা নিয়ে ততই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে। নির্বাচনে কে জিতবেন, তা এখনো অনিশ্চিত। জরিপে কমলাকে ট্রাম্পের চেয়ে সামান্য এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে। সমস্যা হলো, ভোটারদের অনুভূতি দ্রুত বদলাতে পারে, ফলে জরিপের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব। যদিও কমলা হ্যারিস বেশ চমক দেওয়ার মতো রাজনৈতিক দক্ষতা দেখাচ্ছেন; তবে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে চমকের শেষ বলে কিছু থাকে না। এখানে যখন-তখন যা কিছু ঘটতে পারে।
কমলা হ্যারিস জয়ী হলে বাইডেনের নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকতে পারে। বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় থিম হলো বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়া। কমলা অবশ্য বাইডেনের এই নীতি প্রচারের ওপর অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দিচ্ছেন, যদিও তিনি ফিলিস্তিনিদের অধিকারের ব্যাপারে বাইডেনের চেয়ে আরও বেশি কিছু বলেছেন। তবে তিনি মার্কিন জোটকে শক্তিশালী করার এবং বহুপক্ষীয় প্রচারের কাজে বাইডেনের নীতি অনুসরণ করবেন বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্পের নীতি অনিশ্চিত। যদিও সব রাজনীতিবিদই কী করবেন, কী করবেন না সে বিষয়ে কিছুটা ফাঁক রেখে দেন। কিন্তু ট্রাম্প এ ব্যাপারে কুখ্যাত। তার কোন বক্তব্য যে তার নীতি, আর কোনটা নয়, তা বোঝা কঠিন। একতরফাবাদের প্রতি তার সমর্থন এবং জোটভিত্তিক ও বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কমজোরি করার বিষয়ে তার ভাষণ ও কথাবার্তা আমাদের একটা ধারণা দেয় বটে, তবে তা সুনির্দিষ্ট বিষয়ে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দেয় না।
প্রার্থীরা তাদের উপদেষ্টা হিসেবে কাকে কাকে নিয়োগ দিয়েছেন, তা দেখে অনেক সময় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা তাদের ভবিষ্যদ্বাণীকে জোরালো করার চেষ্টা করেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা দেখতে পাই, কমলা হ্যারিসের পররাষ্ট্রনীতির মাথা হলেন ফিলিপ গর্ডন। তিনি অত্যন্ত সম্মানিত একজন মধ্যপন্থি নেতা, যিনি কমলার প্রধান পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা হওয়ার আগে ডেমোক্রেটিক প্রশাসনে ইউরোপীয় ও মধ্যপ্রাচ্য-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিচালনা করেছিলেন। বিপরীতে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা কে হবেন, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না; যদিও সংবাদমাধ্যমগুলো মাঝেমধ্যে ট্রাম্পের সর্বশেষ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট ও’ব্রায়েনের কথা উল্লেখ করছে। ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে প্রথাগত রিপাবলিকানদের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন এবং এ নিয়ে পরে তাকে অনুশোচনা করতে হয়েছিল। কারণ, ওই উপদেষ্টারা নিয়মতান্ত্রিক দায়িত্ব পালন করেছেন, যা ট্রাম্পের কাজের স্বাধীনতাকে হ্রাস করেছিল। ট্রাম্প তার নীতিগুলোকে যতটা আক্রমণাত্মক ও পক্ষপাতমূলক করতে চেয়েছিলেন, ওই উপদেষ্টাদের কারণে তিনি তা করতে পারেননি।
তবে দুই প্রার্থীর মধ্যে লক্ষ করার মতো কিছু মিল রয়েছে। চীন সম্পর্কে তাদের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কমলা ও ট্রাম্প দুজনই মনে করেন, চীন বাণিজ্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি ইস্যুতে ন্যায্য ভূমিকা পালন করেনি। তারা দুজনই মনে করেন, পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আগ্রাসী আচরণ জাপান এবং ফিলিপাইনের মতো আমেরিকান মিত্রদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাইওয়ানসহ অনেকগুলো ইস্যুতে চীন নিয়ে বাইডেন ট্রাম্পের নীতি অনুসরণ করে এসেছেন এবং কমলা হ্যারিসও সম্ভবত সেই পথেই হাঁটবেন। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় মিল হলো, তারা দুজনই নব্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর মার্কিন বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রথাগত রিপাবলিকান পদ্ধতি পরিত্যাগ করেছিলেন। তিনি আমদানি শুল্ক বাড়িয়েছিলেন এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কমিয়েছিলেন। এর সবই করা হয়েছিল মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি রবার্ট লাইথাইজারের নির্দেশনায়, যিনি এখনো ট্রাম্পের বলয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে রয়েছেন।
পূর্বসূরি ওবামা উদ্যোগ নিয়ে যে ট্রান্স-প্যাসিফিক অংশীদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে সেই অবস্থা থেকে সরে এসেছিলেন। ট্রাম্পের পর বাইডেন ক্ষমতায় এসে ট্রাম্পের সরে আসা চুক্তিতে ফিরে যাননি এবং চীন থেকে পণ্য আমদানিতে ট্রাম্প যে বাড়তি কর আরোপ করেছিলেন, সেটিও বাতিল করেননি। বাইডেন চীনের বিরুদ্ধে নতুন প্রযুক্তিকেন্দ্রিক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ প্রবর্তন করে চীনবিরোধিতায় আরও এগিয়ে যান। কমলা হ্যারিস জিতলে সেই উচ্চতা কমাবেন বলে মনে হয় না। আর ট্রাম্প জিতলে সেই তার পরিধি আরও বাড়াবেন বলে মনে হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রাম্প ও কমলা হ্যারিস উভয়ই প্রতিরক্ষা বাজেট এবং প্রতিরক্ষা শিল্প খাতে অধিকতর বিনিয়োগের মাধ্যমে আমেরিকান ‘হার্ড পাওয়ার’ আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
তবে দুজনের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর অন্যতম হলো ইউরোপ অবস্থান নিয়ে। ট্রাম্প এবং তার রানিংমেট জে ডি ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন, ইউক্রেন এবং ন্যাটোকে সমর্থন করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ কম। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত যুদ্ধের অবসান ঘটাবেন। মধ্যপ্রাচ্যে উভয় প্রার্থীই ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং আত্মরক্ষার অধিকার বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; যদিও কমলা হ্যারিস ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথাও বলেছেন। উভয়েই ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবেন। ট্রাম্প আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকাকে কম অগ্রাধিকার দিলেও কমলা হ্যারিস ওই অঞ্চলগুলোয় আরও মনোযোগ দেবেন বলে আশা করা যেতে পারে। তবে ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী প্রচারশিবির কমলার এই পয়েন্টকে মোটেও সামনে আনছে না। অবশ্য এর মানে এই নয় যে, কমলা তার বংশপরিচয়, তার বেড়ে ওঠা বা আনুষঙ্গিক পটভূমি নিয়ে কোনো লুকোছাপা করছেন। ট্রাম্প সপ্তাহ দু-এক আগে কমলার বিরুদ্ধে পরিচয় পরিবর্তন করে একজন কৃষ্ণাঙ্গ হয়ে ওঠার অভিযোগ করেছেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিলারি ক্লিনটনের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে কমলা এই অবস্থান নিয়েছেন। আমেরিকার অনেক লোক ‘প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট’ ধারণাটি পছন্দ করেন না। নারী প্রেসিডেন্টের ধারণা তাদের কাছে অস্বস্তিকর। ফলে ‘নারী’ উপাধি নিয়ে রাজনৈতিক বক্তৃতা করার ঝুঁকি আছে।
লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক
