প্রকট হবে লোডশেডিং

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৫২ এএম

কয়েকদিন ধরে দেশে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে নাকাল মানুষ। ডলার সংকটের ফলে জ্বালানি সরবরাহ না থাকায় উৎপাদন কমেছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। একই সঙ্গে আমদানি-নির্ভর জ্বালানির এই খাতে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে সরকারের বকেয়াও বাড়ছে। ফলে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। দেশে বর্তমানে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কম। ভুলে গেলে চলবে না, সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমাদের সক্ষমতা রয়েছে প্রায় ১২  হাজার মেগাওয়াট। আগে সাড়ে ছয় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অথচ এখন পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। আমদানি অথবা যান্ত্রিক যে কারণেই হোক, বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা হচ্ছে। অচিরেই এই সমস্যার সমাধান হবে এমন সম্ভাবনার পথ খোলা নেই। 

এক সময় বিদ্যুৎ খাত দিনে ১২০ থেকে ১৩০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ পেয়েছে। বর্তমানে ৮০ থেকে ৮৫ কোটি ঘনফুট সরবরাহ হচ্ছে বলে জানিয়েছে পিডিবি। কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দিনে গ্যাস আসত ১১০ কোটি ঘনফুট। সামিটের এলএনজি টার্মিনাল গত ২৭ মে থেকে বন্ধ থাকার ফলে বর্তমানে সরবরাহ হচ্ছে ৬০ কোটি ঘনফুট। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সব ইউনিট। ফলে সম্প্রতি লোডশেডিং বেড়েই চলেছে। এভাবে যদি বাড়তেই থাকে, তাহলে লোডশেডিং কমার কোনো সম্ভাবনা তো নেই-ই, বরং আরও বাড়বে। ভারতের ঝাড়খণ্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত । কিন্তু বকেয়া পরিশোধ না করার ফলে এখন ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে তারা। একদিকে শিল্প কলকারখানা, অন্যদিকে বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকার কারণে জনজীবন চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকের জন্য কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রির কারণে প্রতি বছর পিডিবির লোকসান বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সরকারের ভর্তুকি। গত অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ভর্তুকি তুলে নিলে বিদ্যুতের দাম গড়ে ৭৮ শতাংশ বাড়তে পারে। ভর্তুকি শূন্য করতে হলে পাইকারি দাম বাড়িয়ে প্রতি ইউনিট ১২ টাকা ১১ পয়সা করতে হবে। তখন গ্রাহক পর্যায়ে দাম বেড়ে হবে ১৪ টাকা ৬৮ পয়সা। সংস্থাটির সুপারিশ হচ্ছে, ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করলে জনগণের জন্য সহনীয় হবে। আমাদের বিদ্যুৎ সংকটের প্রধান তিনটি কারণের মধ্যে রয়েছে ডলার সংকট, জ্বালানিতে আমদানি নির্ভরতা এবং অপরিকল্পিত বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও সরবরাহ লাইন না থাকা। চলমান লোডশেডিং বাড়ার আরও কারণ হচ্ছে যেসব সমস্যার কারণে এই সংকট, তা নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতে নেওয়া হবে, এমন কোনো লক্ষণও চোখে পড়ছে না। আগামীতে নিঃসন্দেহে এই সংকট আরও প্রকট হবে। তখন উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং সমাজ কাঠামোতে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। অনেক পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করা হলেও সেগুলো থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাস ও তেল কেনা যাচ্ছে না অর্থের অভাবে। এখনো এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি স্থগিত বা রিনিউ করা হয়নি। তাহলে দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সরবরাহ নির্বিঘ্ন কীভাবে হবে? অদূর ভবিষ্যতে উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ না থাকায় সারা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। রাজধানীসহ  দেশের বড় শহরগুলোয় লোডশেডিং কিছুটা কম হলেও ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলে নিয়মিত দীর্ঘ সময়ের জন্য লোডশেডিং হচ্ছে।  রাজধানীর বাইরে অনেক এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ছয় ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকরা।

বেশিদিন আগের কথা না, গত ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দিনাজপুরের ৫২৫ মেগাওয়াট বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একমাত্র কার্যকরী ইউনিটটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বন্ধ হয়ে পড়ে পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কার্যক্রম। যে কারণে বৃহত্তর রংপুর এলাকা দিনের একটা বড় সময় বিদ্যুৎহীন থাকে। তাহলে দেশের সার্বিক চিত্র কী?

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার, যা চার মাসের আমদানি ব্যয়  মেটাতে পারবে। এরপর কী হবে! সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ডলার সংকটের কারণে কয়লা, গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলসহ প্রাথমিক জ্বালানি আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে, যা বিদ্যুৎ খাতে প্রভাব ফেলেছে। এর মানে হচ্ছে, ভবিষ্যতে লোডশেডিং সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসি ও ডেসকোর তথ্য বলছে, সম্প্রতি ঢাকায় বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ৪০০  মেগাওয়াট। পরিস্থিতি সামলাতে ডেসকোকে অঞ্চলভেদে ৩ থেকে ৪ বার  লোডশেডিং করতে হয়। ডিপিডিসির এলাকায়ই দুই থেকে তিনবার লোডশেডিং হয়। জানা যাচ্ছে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে বেশি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় লোডশেডিং  বেড়েছে। গ্যাস সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কম উৎপাদন হচ্ছে। বিতরণ কোম্পানিগুলো বলছে, চাহিদার অর্ধেক বিদ্যুৎও মিলছে না। তাই লোডশেডিং বেড়েছে। 

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমেছে। ত্রিপুরা থেকে ঘণ্টায় ১৬০ মেগাওয়াটের স্থানে ৬০ থেকে ৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ভারতের সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে ভেড়ামারা দিয়ে ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসার কথা থাকলেও মিলছে ৮৮০ মেগাওয়াট। আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও ৪০০ মেগাওয়াট কম আসছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কাছে ভারতের ৫ বিদ্যুৎ কোম্পানির প্রায় ১০০ কোটি ডলার পাওনা। এই বকেয়ার মধ্যে আদানি পাওয়ার পাবে প্রায় ৮০ কোটি ডলার। ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাহীরা বলেছেন, বকেয়া থাকার পরও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। তবে সতর্ক করে তারা বলেছেন, এই অবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। কারণ বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো অংশীদারদের কাছে দায়বদ্ধ। এখন দেখার বিষয়, এই সমস্যার সমাধান কীভাবে আসে? সবকিছু মিলিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। যদিও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি ও কয়লা আমদানি করা হচ্ছে, তবুও বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত