বর্তমান যুগকে তথ্যের যুগ বলা হয়। দিনকে দিন তথ্যই বড় শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। পৃথিবীর সব পরাশক্তির মধ্যে তথ্যের লড়াই চলছে। যে সবচেয়ে বেশি তথ্যভাণ্ডারের দখল রাখতে পারবে তারই শক্তি বেশি। ব্যাপারটা যে কেবল বর্তমান যুগের তাই না, আদিকাল থেকেই তথ্য মানুষের সমাজে অন্যতম প্রধান শক্তির উৎস। কোন গাছে ভালো ফল পাওয়া যায়, কোন ফল মিষ্টি, কোন ফল বিষাক্ত, কোন এলাকায় বাসা বানালে তা বন্যপ্রাণীর থেকে নিরাপদ এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করত আদিম মানুষদের জীবন।
আধুনিক জীবনে তথ্যের গুরুত্ব কমেনি। যুগে যুগে শাসক, ক্ষমতা চর্চাকারীরা চেয়েছে বেশি সংখ্যক তথ্য সংগ্রহ করতে। যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে শৌর্যবীর্যের প্রচুর আলাপ থাকলেও আসলে তাতে মূল ভূমিকা পালন করে উপযুক্ত তথ্য ও তা বিশ্লেষণ করে সঠিক কৌশল প্রণয়ন। রাষ্ট্র পরিচালনাতেও সঠিক তথ্য হচ্ছে সবচেয়ে জরুরি। রাষ্ট্রের সম্পদ, শক্তি, সামর্থ্য এমনকি ঘরে-বাইরে ষড়যন্ত্র হচ্ছে কি না এসব নিয়ে তথ্য না থাকলে রাষ্ট্র পরিচালনা ও সুরক্ষা অসম্ভব। এ কারণে যুগের পর যুগ শাসকরা তথ্য সংগ্রহ নিয়ে উদগ্রীব থাকতেন। বর্তমানে ইন্টারনেট প্রযুক্তি পেরিয়ে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ। এখন তথ্য একদম সরাসরি যুদ্ধের হাতিয়ার। কারণ এসব তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নিত্যনতুন এআই মডেল তৈরি হচ্ছে। গুগল, ফেসবুকের মতো জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান এখন পণ্য বিক্রি করে না, বরং ফ্রি-তে সেবা দেয়। এর বিনিময়ে তারা সংগ্রহ করে ব্যবহারকারীর তথ্য। কারণ এই তথ্য পয়সা দিয়ে বিক্রি করা সেবার চেয়ে বহুগুণে লাভ এনে দেয়, ক্ষমতা দেয়। কিন্তু, এসবের ফলে নাগরিকরা, সাধারণ মানুষদের তদারকি বা সার্ভেলেন্সের আওতায় চলে আসছেন। তাদের অভ্যাস, চাহিদা এখন নিজেদের চেয়ে এআই বা এলগরাদিম ভালো বোঝে। তথ্য যত উন্মুক্ত হবে, গণতন্ত্রের লড়াইয়ে তা তত কার্যকরী হবে। স্বৈরাচারী শাসকরা তথ্য গোপন রাখে, সেই গোপন করা তথ্য দিয়ে নাগরিকের ওপর ছড়ি ঘোরাতে চেষ্টা করে। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তথ্য গোপন করার সুযোগ নেই, তা করলে গণতন্ত্র অস্তিত্বের সংকটে পড়বে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র চর্চা ফেরাতেও তথ্য গোপন বন্ধ করতে হবে। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা সমুন্নত রাখতে তথ্য অধিকার আইন ও তথ্য কমিশনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। আন্তর্জাতিক তথ্য অধিকার দিবস ২০২৪ উপলক্ষে শনিবার তথ্য কমিশন মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভায় তথ্য গোপন করার চর্চা বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘তথ্য অধিকার আইন যখন প্রথম প্রবর্তন করা হয়, তখন একে নাগরিকদের বিজয় হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, আইনটি মূলত কাগুজে হিসেবেই রয়ে গেছে। তথ্য কমিশনের মধ্যে সরাসরি নিয়োগের গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া দরকার। একই সঙ্গে তথ্য কমিশন কেবল কমিশনারদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়া উচিত নয় এবং ওই কমিশনারদের নিয়োগও নিরপেক্ষভাবে করা উচিত। তা ছাড়া কমিশনারদের নিরপেক্ষ হতে হবে, কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।’ তথ্য অধিকার আইনকে নাগরিকের ক্ষমতায়ন ও স্বচ্ছতা প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘বাকস্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার, তথ্যের অবাধ প্রবাহ শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের অপরিহার্য উপাদান। স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।’
সরকারে যারাই যান, তারাই তথ্যকে নিজেদের কুক্ষিগত করার চেষ্টা করতে থাকেন। ব্রিটিশ উপনিবেশের কায়দায় চলা বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র নানা রকম আইন দেখিয়ে জনগণকে তথ্য থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করে। তথ্য উন্মুক্ত করার ব্যাপারে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি করে। বাংলাদেশ আরও একটি গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে, হাজারো শহীদের রক্তে স্বৈরাচারমুক্ত হয়েছে। এই দেশ আবারও গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখছে। মুক্তিযুদ্ধে পাওয়া বাংলাদেশ গণআকাক্সক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছে। এটি বাস্তব করতে হলে তথ্যকে উন্মুক্ত করতেই হবে।
