রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের তৃতীয় দফার সংলাপ হতে যাচ্ছে আজ শনিবার। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এবার আলোচনার মুখ্য বিষয় হবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে গঠিত ছয় কমিশনের কাজের অগ্রগতি। এ ছাড়া দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা এবং এ বিষয়ে দলগুলোর পরামর্শ নেওয়া হবে। এর আগের দুই দফার সংলাপে নির্দিষ্ট কয়েকটি দল অংশ নিলেও এবার রাজনৈতিক দলের সংখ্যা বেড়েছে। বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরাও তৃতীয় ধাপের সংলাপে অংশ নিতে যাচ্ছেন।
এসব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা বলছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে অনেক খাতের সংস্কারকাজে হাত দিয়েছে। এরই মধ্যে কিছু কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এসব সংস্কারের কাজ কীভাবে হচ্ছে বা সংস্কারের ধরন কেমন হবে, তা স্পষ্ট নয়। এ ছাড়া আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ (পথনকশা) প্রকাশের দাবি জানানো হলেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। অন্যদিকে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে সরকার কী করছে, তা সংলাপে জানতে চাওয়া হবে।
গত ৫ আগস্ট গণআন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের তিন দিন পর শপথ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তারপর দুই দফা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে। সেই সংলাপে বেশিরভাগ দল আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন এমন মত দেয়।
বিএনপি নেতারা বলেছেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং প্রশাসন ও বিচার বিভাগে আগে সংস্কার দরকার। কারণ সংশ্লিষ্ট এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংস্কার করা গেলে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন করা যাবে। নির্বাচনের পর যারা ক্ষমতায় আসবে তারা বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করবে। কিন্তু সরকার অলোচনার জন্য যে সময় নির্ধারণ করে দিয়েছে, তাতে বিস্তর আলোচনা সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা
আমাদের ডেকেছেন। আমরা তার আমন্ত্রণে যাব। তারা কী বিষয়ে বলতে চান তা আমরা শুনব। যেহেতু তারা ক্ষমতায় সেহেতু সংস্কারকাজ তাদেরই করতে হবে। দেশের জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলো কী পরিবর্তন চায়, তা নিশ্চয়ই তারা জানেন। তারা কী জানতে চান কিংবা কী জানাতে চান তার ওপর ভিত্তি করে কথা হবে। আর সংস্কারের বিষয়ে আগেই আমরা আমাদের প্রস্তাবনা জনগণের সামনে তুলে ধরেছি।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য আরও বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন ও সংবিধান সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। এর আলোকে আমরাও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরতে ছয়টি কমিটি গঠন করেছি। এসব কমিটিতে দলের নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞদের রাখা হয়েছে। তারা কাজ করছেন।’
সংস্কার প্রস্তাব সম্পর্কে বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তারা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাদের দলের ৩১ দফার ভিত্তিতে সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরবেন। বিএনপির পক্ষ থেকে আগেই সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ‘রাষ্ট্র মেরামতে’ ৩১ দফা ঘোষণা করা হয়েছে। তাদের সংস্কার প্রস্তাবের রূপরেখার উল্লেখযোগ্য দিকগুলো হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতিমূলক সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছানো; ‘নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তন; সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা; পরপর দুই মেয়াদের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে না পারা; সংসদে ‘উচ্চকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা’ প্রবর্তন; সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করার বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে (দেখা হবে) বিবেচনা করা।
এ ছাড়া রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার বাতিল; ‘বিচারপতি নিয়োগ আইন’ প্রণয়ন; ‘প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন’ গঠন; ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন; সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়পাল নিয়োগ; দেড় দশকে গুম-খুনের বিচার; ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন; ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ভাঙচুর এবং তাদের সম্পত্তি দখলের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ; বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতা বরদাশত না করা; মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের তালিকা প্রণয়ন; যুক্তরাজ্যের আলোকে সর্বজনীন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন; সবার জন্য স্বাস্থ্য কার্ড চালুর প্রতিশ্রুতি।
বিএনপি নেতারা বলেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ‘১৯ দফা’, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০-৩০’ এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ‘৩১ দফা’র আলোকে আগামীর বাংলাদেশকে ‘কল্যাণ রাষ্ট্র’ হিসেবে গড়ে তোলাই বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনে শরিক দল-জোটের লক্ষ্য।
জামায়াতে ইসলামীর সংস্কার প্রস্তাব : অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংলাপ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন ও সংবিধানের সংস্কারে যে কমিটিগুলো করা হয়েছে সে কমিটিগুলোর কাছে আমাদের প্রস্তাবনা তুলে ধরব। আমাদের সংস্কার প্রস্তাবে যেসব বিষয় আসতে পারে তার মধ্যে রয়েছে সংবিধানে বিচারপতি নিয়োগের যে কয়েকটি ধারা রয়েছে সেগুলো সংশোধন। কারণ বর্তমানে বিচারপতি নিয়োগ হয় পুরোপুরি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি এ দুজনের মধ্যে সমন্বয় থাকবে। সংসদে সমন্বয় থাকবে। আমরা সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, কিন্তু সংসদ ঠুঁটো জগন্নাথ, প্রশংসার বাণী উচ্চারণকারী হাউজে পরিণত হয়েছে। এখানে কোনো জবাবদিহি নেই। তাই এখানে পরিবর্তন দরকার।’
নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রবর্তন হলেই সমস্যার সমাধান হবে না উল্লেখ করে জামায়াতে ইসলামীর এ নেতা বলেন, ‘এ ব্যবস্থা (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) নিয়েও বহু প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে। সেজন্য নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন দরকার। ব্রিটিশ, আমেরিকা এবং ভারতেও যে পদ্ধতি রয়েছে, সেটি আমাদের এখানে নেই। সারা বিশ্বের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে আমাদের কাজগুলো করতে হবে। এ কাজগুলো করার মাধ্যমে দেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজন করতে হবে।’
সংলাপ প্রসঙ্গে দলটির কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির এবং সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার আমন্ত্রণে আমরা সংলাপে অংশগ্রহণ করব। সংলাপে সংস্কারের বিষয়ে কী প্রস্তাব করব তা নির্ভর করছে আলোচনার এজেন্ডার ওপর।’
সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন চায় ইসলামী আন্দোলন : সংসদে সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থার প্রবর্তন চায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংসদে সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা চাই আমরা। সংসদে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি চালু করা গেলে দ্বিদলীয় পদ্ধতি থেকে বের হওয়া সম্ভব। কোনো দল জাতীয় নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, সংসদে তারা সেই অনুপাতে আসন পাবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুর্নীতি দমন, নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে সংস্কারের বিষয়ে গুরুত্ব দেব। পাশাপাশি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা বিগত সরকারের অপকর্মের দোসরদের অপসারণ ও তাদের বিচার চাই।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক প্রথমবারের মতো অংশ নিতে যাচ্ছে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা। এ প্রসঙ্গে বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ও বাসদ (মার্ক্সবাদী) সমন্বয়ক মাসুদ রানা বলেন, ‘সরকার ছয়টি কমিশন গঠন করেছে। সেসব কমিশন রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে যুক্ত করে সংস্কারকাজ করবে কি করবে না, এ বিষয়টা আমরা জানতে চাইব। এ ছাড়া সেনাবাহিনীকে যে ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার দেওয়া হয়েছে সেটা কেন দিল বা কতদিন থাকবে এ বিষয়টাও জানতে চাইব। একই সঙ্গে সংস্কারের রোডম্যাপ জানা দরকার। নির্বাচন কীভাবে, কখন হবে, এ নিয়ে সরকার কী ভাবছে, সেসব বিষয়ও জানতে চাইব।’
গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘তারা (সরকার) হয়তো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ চলমান নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। আমরা তাদের কথা শুনব। সংস্কারের পুরো উদ্যোগের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর দূরত্ব আমরা দেখছি। এ দূরত্ব কীভাবে কমিয়ে নিয়ে আরও কাছাকাছি থেকে কাজ করা যায় যেটা নিয়ে আলাপ করব। কারণ মূল স্টেকহোল্ডার (অংশীজন) হলো রাজনৈতিক দলগুলো। সরকারের উচিত হবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরও জীবন্ত একটা নৈমিত্তিক যোগাযোগ গড়ে তোলা। দলগুলোকে আস্থার মধ্যে নেওয়া। এতে সরকার যে কাজগুলো করতে চায় তা করা সহজ হবে। এ ছাড়া ওনারা যে জার্নিটা শুরু করেছেন, সেটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। তারা এটা নিয়ে কী করছেন সেটা জানার আগ্রহও আমাদের থাকবে।’
