ড. শামসুল হক। ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী। রেকর্ডের পর রেকর্ডই করেছিলেন তিনি। সাধারণ অর্থনীতি বিভাগে সদস্যের (সচিব) চেয়ার আঁকড়ে ছিলেন টানা এক যুগ। পরে অনির্বাচিত প্রতিমন্ত্রী। সে চেয়ারে বসেও তিনি রেকর্ড হাঁকিয়েছিলেন। ৬০০ কোটি টাকায় প্রস্তাবিত মেঘনা-ধনাগোদা সেতুকে ইনিয়েবিনিয়ে ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ৪ হাজার ১৭০ কোটিতে বাগিয়ে নেন। জিডিপি, মূল্যস্ফীতিসহ সরকারি বিভিন্ন ডেটা ম্যানুপুলেটের (কমবেশি করে জাতির সামনে উপস্থাপন) অভিযোগ থাকা সাবেক এ প্রতিমন্ত্রীর লক্ষ্য ছিল সংসদ সদস্য (এমপি) পদে নির্বাচনের। তবে রাষ্ট্রক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া তার এ প্রকল্প শেষমেশ বাদ পড়ছে। বাস্তবায়ন হচ্ছে না বিলাসী ব্যয়ের এ প্রকল্পটি।
চাঁদপুর, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনীসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ সংক্ষিপ্ত করার জন্য মেঘনা-ধনাগোদা নদীর ওপর ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ২০ মিটার প্রস্থের মতলব-গজারিয়া সংযোগ সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয় ২০১৯ সালে। যদিও তার আগের বছরই একই নদীতে একই উপজেলায় কয়েক কিলোমিটারের ব্যবধানে ৮৪ কোটি টাকায় আরেকটি সেতু নির্মাণ করা হয়। প্রতিমন্ত্রীর জোর আগ্রহ থাকলেও শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় নোয়াখালী থেকে চাঁদপুর হয়ে ফের আরেকটি সেতু নির্মাণ নিয়ে আপত্তি ছিল পরিকল্পনা কমিশনের।
মেঘনা-ধনাগোদা সেতু নির্মাণের জন্য ২০১৯ সালে মতলবের স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) নুরুল আমিন রুহুল একটি ডিও লেটার (আধা সরকারি সুপারিশপত্র) সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেন। ওই ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তখন সেতুটি নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় প্রাক্কলন করে ৬০০ কোটি টাকা। পরবর্তীকালে ২০২২ সাল থেকেই তৎকালীন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম জোর খাটানো শুরু করেন নিজ মন্ত্রণালয়েই। স্থানীয় সরকারকে বাদ দিয়ে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৪ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা বরাদ্দে মতলব-গজারিয়া সংযোগ সেতু বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। তাও জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে আগে। ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর একনেক সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের কাজ চলার কথা ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। সংসদ নির্বাচনে আগে মতলববাসীর জন্য প্রকল্পটি বাগিয়ে নেন তৎকালীন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম, যদিও পুরো পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে ছিল। ওই সময় দেশ রূপান্তরের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা কমিশনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে এত অর্থ ব্যয়ে এ সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কী। ওই কর্মকর্তা বলেন, এ সেতু অনুমোদন না দেওয়ার পক্ষেই পরিকল্পনা কমিশন। কিন্তু প্রতিমন্ত্রীর জোর তদবিরে এটি অনুমোদন দিতে বাধ্য হচ্ছে কমিশন। তিনি অনেকটা জোর করেই প্রকল্পটি অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। তাছাড়া দেশের অর্থনীতির ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে বিদেশি ঋণের প্রকল্প বেশি প্রয়োজন বিবেচনায়ও সে সময় এটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পটি অনুমোদনের পর মতলবে ঢাকঢোল পিটিয়ে মিছিল-সমাবেশও করেছিলেন ড. শামসুল আলম। লক্ষ্য ছিল সংসদ সদস্য নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার। কিন্তু ওই আসনে মোফাজ্জল চৌধুরী মায়ার সঙ্গে বিরোধের জেরে আওয়ামী লীগের সবুজ কার্ড পেতে ব্যর্থ হন তিনি।
শামসুল আলম পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (সচিব) ছিলেন এক যুগ। ওই চেয়ারে বসে তার ‘অপছন্দের’ অধিকাংশ দক্ষ কর্মকর্তাকে সেখান থেকে বদলি করান। তিনি এক যুগ এক চেয়ারে থাকার পর সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ এখন কার্যত পঙ্গু।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেতু নির্মাণের বিলাসী প্রকল্পটি এমন স্থানে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ে এমন সেতু নির্মাণের কোনো প্রয়োজনই নেই। প্রকল্পটি নেওয়ার ক্ষেত্রে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলা এবং নোয়াখালী ও ভোলা জেলার অংশবিশেষের সঙ্গে ঢাকার সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে যাতায়াতের দূরত্ব, সময় ও ব্যয় হ্রাস এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের (এন-১) ওপর যানবাহনের চাপ কমবে বলে যুক্তি দেখানো হয়েছিল।
অথচ নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের সঙ্গে রাজধানীর সহজ যোগাযোগের জন্য ২ হাজার ১৭০ কোটি টাকা বরাদ্দে ২০১৮ সালে নোয়াখালী-কুমিল্লা মহাসড়কের ৭৩ কিলোমিটার অংশ চার লেনে উন্নীতের কাজ শুরু হয়। সেটি অবশ্য এখনো চলমান। তাছাড়া ওই অঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের জন্য খুব কমই ব্যবহার করা হয় চাঁদপুর সড়ক। ভোলা ও শরীয়তপুরের সঙ্গে যোগাযোগের সহজ মাধ্যমের কথাও বলা হয়েছিল প্রস্তাবিত এ সেতুকে। কিন্তু শরীয়তপুরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চাঁদপুরের হরিণাঘাট ব্যবহৃত হয়। সেজন্য অবশ্য মতলব ঘেঁষতে হয় না। হরিণাঘাট হয়ে সে রুটের যানবাহন চট্টগ্রাম যায় চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ হয়ে।
পরিকল্পনা কমিশনে গত বছর ৭ সেপ্টেম্বর পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে আলোচ্য প্রকল্পটির প্রস্তাব তুলে ধরেন সেতু বিভাগের যুগ্ম সচিব (উন্নয়ন) রহিমা আক্তার। সেখানে তার যুক্তি ছিল, এটি একটি ‘কেবল স্টেড সেতু’ যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ওই প্রেজেন্টেশনে এই প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৩ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু পরে কয়েকটি যুক্তি দেখিয়ে ব্যয় বাড়িয়ে ৪ হাজার ১৭০ কোটি টাকা করা হয়।
প্রকল্পটির সিংহভাগই বিদেশি ঋণ। মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকাই দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ ঋণ। প্রকল্পে অর্থায়নকারী কোরিয়ার ইডিসিএফের ঋণ স্বল্প সুদের, অর্থাৎ সুদের হার মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ১ থেকে শূন্য দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ১৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ রিপেমেন্ট পিরিয়ড ৪০ বছর।
৬০০ কোটির প্রস্তাবিত সেতু ৪ হাজার কোটিতে গড়ানোর যুক্তি হিসেবে প্রকল্প পরিচালক আবুল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এলজিইডির যে প্রস্তাবনা ছিল, তা ব্রিজের মতো প্রস্তাবনা ছিল না। তারা কীভাবে করেছে আমি জানি না। তবে আমরা যেটা করছি সেটি ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স স্টাডি করে করা হচ্ছে। তাদের প্রস্তাবে এমন কিছু ছিল না। তারা সেটি চরের সঙ্গে কানেক্ট করবে নাকি অন্য কিছু করবে সেটি পরিষ্কার ছিল না।’
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের পর গত আগস্টে দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বেশ কিছু অনুমোদিত প্রকল্প সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণলায়গুলোতে ফেরত পাঠানো হয়। এমন প্রকল্পগুলো ফেরত পাঠানো হয়েছে, যেগুলো গত জানুয়ারিতে নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অর্থছাড় হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশ কিছু প্রকল্প কাটছাঁট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এটি (মেঘনা-ধনাগোদা সেতু) একটি। আমরা প্রকল্পটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। তারা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’
অন্তত ২৩টি রাজনৈতিক বিবেচনার প্রকল্প চিহ্নিত করেছে পরিকল্পনা কমিশন, যেগুলোতে অকারণে খরচ বাড়িয়ে লুটপাটের সুযোগ রাখা হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। কোনো কোনো প্রকল্পে স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বেশি ব্যয় ধরা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
এর ভেতর থেকে বড় অঙ্কের বরাদ্দ কাটছাঁট করা হতে পারে অথবা স্থগিত করা হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়েই উন্নয়ন প্রকল্পে খরচের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এ ছাঁটাইয়ের তালিকায় মেঘনা-ধনাগোদা সেতু প্রকল্পটিও রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
মতলব উত্তর ও হাইমচর উপজেলায় অনুমোদিত দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের মধ্যে পণ্য পরিবহন সহজতর করার মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখবে বলে যুক্তি দেখানো হয়েছিল প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে। সেতুটি চালু হওয়ার পর প্রথম বছরে দৈনিক ১৯ হাজার ৮৩৫টি যানবাহন পারাপার হবে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছিল। যদিও একই ধরনের অনুমানের ভিত্তিতে নেওয়া কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পটি এখন ব্যর্থ প্রকল্পে পরিণত হচ্ছে। ধারণার চেয়ে অর্ধেক বাহনও চলে না ওই টানেলে। আর দৈনিক মাত্র ১৯ হাজার বাহনের জন্য ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ করে সেতু নির্মাণ নিয়ে এখনো আপত্তি রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের।
