ধর্মীয় জ্ঞানের আলোয় আলোকিত ও ধর্মান্ধ বিতর্ক

আপডেট : ১৮ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৩৪ এএম

সম্প্রতি ধর্মান্ধ শব্দ নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। ঢের সমালোচনা হয়েছে। জবাবদিহিতার বিষয়টিও দেখা গেছে কাক্সিক্ষত ব্যক্তির কাছ থেকে। ফলে একটি শ্রেণির নিরন্তর অস্থিরতার কিছুটা উপশম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আমাদের সমাজে নানা বিষয়ে আলোচনা হয়, সমালোচনা হয়, সমাধান হয় না। কিন্তু কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের আলোচনা ও সমালোচনার তীব্রতায় যেন সমাধান হয়ে ওঠে হাতের মোয়া। তবে আমরা দেখেছি, এই সমালোচনা রাতের ভোট ঠেকাতে পারেনি, চব্বিশে ছাত্র-জনতা খুন হওয়াকে আটকাকে পারেনি এবং এখনো পর্যন্ত বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। অবশ্য এসব ক্ষেত্রে সমালোচনায় সমাধান হয় না, বরং প্রয়োজন হয় প্রতিবাদ। যাই হোক, যেসব ক্ষেত্রে সমালোচনায় সমাধান হয় সেসব ক্ষেত্রে অযথা অস্থিরতামূলক সমালোচনায় না গিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা কাম্য। যেখানে কাউকে ব্যক্তি আক্রমণ করা হবে না, বরং ব্যক্তির সংশোধন উদ্দেশ্য হবে। এটাই ইসলামের শিক্ষা।

ধর্মান্ধ শব্দটি বাংলা ভাষায় সর্বপ্রথম কে ব্যবহার করেছেন তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও এটা জানা যায় যে, কাজী নজরুল ইসলাম পাপ কবিতায় এই শব্দটির ব্যবহার করেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘ধর্মান্ধরা শোনো/ অন্যের পাপ গনিবার আগে নিজেদের পাপ গোনো!’ বাংলা একাডেমি ধর্মান্ধ শব্দের অর্থ লিখেছে, ‘কোনো ধর্মীয় মতবাদের অন্ধ অনুসারী’, ‘পরধর্মবিদ্বেষী’। একটি মহল বলছে, এখানে দুটি অর্থ পরস্পর সাংঘর্ষিক অবস্থানে রয়েছে। (তাদের যুক্তি হলো) কেননা ‘কোনো ধর্মীয় মতবাদের অন্ধ অনুসারী’ মানে তো ‘পরধর্মবিদ্বেষী’ নয়। তারা আরও যুক্তি দেন ‘আমরা জানি, ইসলাম ধর্মমতে আল্লাহ এক, তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি সবখানে বিরাজমান। এখন আমরা কি এসব বাস্তবে দেখে বিশ্বাস করি? আমরা তো এসব না দেখেই বিশ্বাস করি। কিংবা ইসলামের যেসব বিধান রয়েছে সেগুলো যদি আমাদের স্বাভাবিক যুক্তিবুদ্ধি দ্বারা বুঝে না আসে তাহলে কি আমরা তা মানতে বাধ্য নই? অবশ্যই বাধ্য। এ জন্য যদি আমাদের ধর্মান্ধ বলা হয়, তবে আমরা ধর্মান্ধ।’

প্রথম কথা হলো, ধর্মান্ধ শব্দের এই অর্থ দুটি ঠিক আছে। এই অর্থ দুটি খুব একটা পরস্পর সাংঘর্ষিক অবস্থানেও নেই। তারা বলেছেন, ‘কোনো ধর্মীয় মতবাদের অন্ধ অনুসারী মানে তো পরধর্মবিদ্বেষী নয়।’ তাদের এ কথাও ঠিক আছে। কেননা কোনো ধর্মের একজন অন্ধ অনুসারী পরধর্মবিদ্বেষী নাও হতে পারে। কিন্তু তাদের আগে বুঝতে হবে ‘কোনো ধর্মের অন্ধ অনুসারী’ মানে কী? এর মানেটা তাদের দেওয়া উদাহরণ দ্বারাই বোঝাই, ‘ইসলাম ধর্মমতে আল্লাহ এক, তিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা, তিনি সবখানে বিরাজমান। এখন আমরা কি এসব বাস্তবে দেখে বিশ্বাস করি? আমরা তো এসব না দেখেই বিশ্বাস করি।’ এ বিষয়ে কথা হলো, আমরা এসব বাস্তবে দেখে বিশ্বাস করি না ঠিক, কিন্তু মহান আল্লাহ তো এই সবকিছুই পবিত্র কোরআনে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন! সুতরাং আমরা এসব না দেখে বিশ্বাস করি মানে তো এই নয় যে, আমরা এসব অন্ধের মতো বিশ্বাস করি! আমরা ওহির মাধ্যমে প্রাপ্ত সংবাদ দ্বারা জেনেই বিশ্বাস করি। এটা তো অন্ধ বিশ্বাস নয়। এর পরের অংশে তারা যে যুক্তি দিয়েছেন সেই বিষয়ে কথা হলো, ইসলাম ভারসাম্যপূর্ণ একটি ধর্ম। ইসলামের প্রতিটি বিধান অত্যন্ত যৌক্তিক। অযৌক্তিক কোনো বিধান ইসলামে নেই। হয়তো আপনি কোনো বিধানের যৌক্তিকতা নাও বুঝতে পারেন।

ধর্মান্ধ শব্দের আরেক অর্থ গোঁড়ামি। গোঁড়ামি অর্থ একগুঁয়ে। ইসলামে গোঁড়ামি ও একগুঁয়েমি নেই। এর বড় প্রমাণ হলো, ‘আজজরুরাতু তুবিহুল মাহজুরাত’ মূলনীতিটি। অর্থাৎ ‘প্রয়োজন নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ করে দেয়।’ যেমন : মৃত প্রাণীর গোশত খাওয়া হারাম। কিন্তু কেউ এমন এক স্থানে গেছে যেখানে জীবনধারণের জন্য হালাল কোনো খাবার নেই। তাহলে সেখানে মৃত প্রাণী বা হারাম খাবার তার জন্য বৈধ হয়ে যাবে। ভেবে দেখুন! ইসলামে গোঁড়ামির কোনো স্থান আছে কিনা?

অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসেন সম্প্রতি পূজা কমিটির পক্ষ থেকে উত্তরীয় গ্রহণের পর এক বক্তব্যে বলেন, তিনি ধর্মান্ধ নন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এক শ্রেণির হুজুগে জনতা এটা নিয়েও হয়তো তার সম্পর্কে নেতিবাচক কথা বলবে। অতঃপর ঠিকই তারা সমালোচনায় লিপ্ত হন। শুরু হয় কিছু শব্দ ও বাক্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি। অতঃপর তিনি ধর্মান্ধ শব্দের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘আমি আমার বক্তব্যে ধর্মান্ধ বলতে মূলত বুঝিয়েছি, আমি ধর্মীয় জ্ঞানের আলোয় আলোকিত। ধর্মের জ্ঞানশূন্য অন্ধ নই।’ সহজ কথায় তিনি ধর্মান্ধ শব্দের অর্থ বলেছেন, ‘ধর্মের জ্ঞানশূন্য অন্ধ’। ধর্মান্ধ শব্দের অর্থ হিসেবে এটা চমৎকার। বাংলা একাডেমি ধর্ম উপদেষ্টার প্রদত্ত এই অর্থ সংযোজন করতে পারে। তাহলে আশা করা যায় এই শব্দ নিয়ে আর ভুল বোঝাবুঝি হবে না।

ধর্ম উপদেষ্টা তার অফিসিয়াল ফেসবুক একাউন্টে লিখেন, ‘সম্প্রতি কিছু শব্দ এবং বাক্য নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে সমালোচনা এবং বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আমি কৃতজ্ঞ যে আমার অনেক শুভাকাক্সক্ষী, বন্ধু এবং সম্মানিত ওস্তাদগণ আমাকে এ বিষয়ে সৎ পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে আমি স্বীকার করছি, আমার কিছু শব্দ ব্যবহারে অসাবধানতা ছিল, যা অনাকাক্সিক্ষতভাবে কিছু ভুল ধারণার জন্ম দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও সচেতন থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। আমি সবার কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি, বিশেষত যাদের মনে কষ্ট দিয়েছি তাদের প্রতি আমার আন্তরিক সহানুভূতিপূর্ণ সমবেদনা রয়েছে। আলেম সমাজের প্রতি আমার শ্রদ্ধা চিরদিনের। তাদের সান্নিধ্যে আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছি এবং আজও দেশের শীর্ষ আলেমসহ সকল মাসলাকের আলেম সমাজের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। সব সময় তাদের পরামর্শকে যথাযথ মূল্য দিই এবং কখনো ভুল করলে তা শুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত থাকি। সমালোচনার মাধ্যমে অনেক কল্যাণের পথ খোলা হয়। যারা গঠনমূলক ও আদবপূর্ণ ভাষায় সমালোচনা করেছেন, তাদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ। তবে, কিছু অশালীন সমালোচনার মাধ্যমে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি তাদের জন্য দোয়া করি, আল্লাহ যেন তাদেরকে শালীন ও গঠনমূলক সমালোচনার শক্তি দান করেন।’

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত