ব্যয় সংকোচনের সময় ব্যয়বহুল গাড়ি

  • ডিসি, ইউএনওদের জন্য ২০০ জীপ কিনতে ৩৩৯ কোটি টাকা চেয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
  • প্রতিটি গাড়ির দাম ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকারও বেশি
  • এবছর প্রতি গাড়িতে বাড়তি যোগ করতে হবে ২৩ লাখ টাকা
  • অগ্রাধিকার বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেবার পরামর্শ বিশ্লেষকদের 
আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৪৮ পিএম

চলমান অর্থনৈতিক সংকটের সময় সরকার যখন ব্যয় সংকোচনে গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) জন্য ২০০ মিৎসুবিসি পাজেরো জীপ গাড়ি কিনতে চায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিউএক্স মডেলের ২৪৭৭ সিসির প্রতিটি গাড়ির দাম ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকারও বেশি। গাড়িগুলো কিনতে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় এবছর প্রতি গাড়িতে বাড়তি যোগ করতে হবে ২৩ লাখ টাকা। 

ডিসি ও ইউএনওদের জন্য এসব গাড়ি কেনার বাজেট চেয়ে গত ৭ অক্টোবর অর্থসচিবকে চিঠি দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। জনপ্রশাসনের গতিশীলতা ধরে রাখতে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে হয়। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাসহ বিভিন্ন সেবা স্বাভাবিক রাখতে এসব গাড়ি কেনা প্রয়োজন বলে অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এর আগে গত মাসে ডিসি ও ইউএনওদের জন্য নতুন ২০০ গাড়ি কেনার জন্য বাড়তি টাকা চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় সরকারি যানবাহন অধিদপ্তর। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি পরিবহন পুলে গাড়ি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ করে সরকারের এ অধিদপ্তর। 

পরিবহন কমিশনার মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনে ব্যবহৃত গাড়ির আয়ুষ্কাল ১৪ বছর। যেসব গাড়ির বয়স ১৪ বছর পার হয়েছে এমন ২০০ গাড়ির অনুকূলে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। নতুন করে ব্যবহারের জন্য খাত তৈরী করা হয়নি।’
 
সরকারের কৃচ্ছ নীতি অনুসরণের সময় কেন বিলাসী গাড়ি কেনা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নতুন কোনো উপযোগিতা তৈরী করে বরাদ্দ চাওয়া হয়নি। এমনকি আইনের বাইরে যেয়েও বরাদ্দ চাইনি। সুনির্দিষ্টভাবে যেসব গাড়ি অতিপুরনো হয়েছে সেগুলো কিনতেই বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।’

ব্যয় সংকোচন নীতির মধ্যেও গত অর্থবছরে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য ২৬১টি গাড়ি কেনা হয়। এসব গাড়ি কেনা শেষে বরাদ্দ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। 

২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রগতি ইন্ডস্ট্রিজ লিমিটেড প্রতিটি ১ কোটি ৬৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা দামে এসব গাড়ি সরবরাহ করবে। গেলো অর্থবছরে একই মডেলের এসব গাড়ির দাম ছিল ১ কোটি ৪৬ লাখ ২০ হাজার টাকা। বছর ব্যবধানে গাড়িপ্রতি মূল্য বেড়েছে ২৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা। সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন পুনঃনির্ধারিত মূল্য ধরে বরাদ্দ না পেলে গাড়ি ক্রয় করা সম্ভব না।

অর্থবিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পাঠানো প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে অর্থবিভাগ। এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সমালোচনার ভয়ে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনেকটা গোপনে ডিসি ও ইউএনওদের জন্য ২৬১টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করে। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে তা নিয়ে নেতিবাচক সমালোচনা হয় এবং এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গাড়ি কেনা স্থগিত করে। পরে অবশ্য গাড়িগুলো কেনা হয়েছে।

চলতি অর্থবছরের শুরুতেই কৃচ্ছ্রতাসাধন করতে মন্ত্রণালয়গুলোর জন্য নির্দেশনা জারি করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। গত ৪ জুলাই জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রতাসাধনের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটের আওতায় সকল প্রকার যানবাহন ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় বন্ধ থাকবে। তবে ১০ বছরের অধিক পুরোনো যানবাহন প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের অনুমোদন নিয়ে ব্যয় করা যাবে।

জনপ্রশাসন বিভাগের চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে ব্যবহৃত জীপ গাড়ির আয়ুস্কাল ১৪ বছর উত্তীর্ণ হয়েছে এমন গাড়ির সংখ্যা ৪৬১ টি। এর মধ্যে গত অর্থবছরে ক্রয় করা হয়েছে ২৬১টি গাড়ি। আরো ক্রয় করতে হবে ২০০টি জীপ।
 
ব্যয়বহুল এসব গাড়ি ক্রয় প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মুস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাতে হবে সক্ষমতার সাথে। দক্ষতার সাথে কাজ করতে আবশ্যিক প্রয়োজন পুরণ করতে হবে। তবে অগ্রাধিকার বুঝতে হবে। এই সময়ে এসে কোনটি প্রয়োজন সেটা নির্ধারণ করতে হবে। গাড়ি ক্রয় প্রক্রিয়াকে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখি। চলমান বিভিন্ন প্রকল্পগুলোর গাড়ির হিসেব নিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিলে ব্যয় সংকোচনও হবে আবার মাঠ প্রশাসনের চাহিদাও পূরণ হবে।’ 

চলতি অর্থবছরে জুলাই মাসে সরকারি অর্থব্যয়ে কৃচ্ছতা সাধনের অংশ হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সব ধরনের যানবাহন ক্রয় (মোটরযান, জলযান, আকাশযান) খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে অর্থবিভাগ। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটে সরকারি যানবাহন অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি সড়ক পরিবহন শাখার অনুকূলে মোটরযান ক্রয়খাতে ৩৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

সরকারের গাড়ি কেনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। রাজস্ব বা প্রকল্প কোনো খাতের গাড়িই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। প্রকল্পের গাড়ি নিয়ে সংকট আরো নানামুখী। প্রকল্প শেষে এসব গাড়ি পরিবহন অধিদপ্তরে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হয় না। এসব গাড়ি কোথায় যায়, কে ব্যবহার করে তা অনেক সময়ই জানে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় বা বিভাগ। এটা শুধু বর্তমান সময়ের সমস্য নয়। দিনের পর দিন এসব গাড়ি কেনা, ব্যবহার ও ব্যবহারপরবর্তী নিলাম প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। প্রকল্পের গাড়ি কেনা ও ব্যবহারে অনিয়ম নিয়ে বর্তমান সরকারও চিন্তিত। 

গত ৭ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে জ্বালানী উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে এসব অনিয়ম কীভাবে দূর করা যায় তা নিয়ে সুপারিশ দিতে বলা হয়। বৈঠক পরবর্তী ব্রিফিংএ পরিকল্পনা ও শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের গাড়ি কোথায় যায় এবং একজন অফিসার কয়টা গাড়ি ব্যবহার করেন এসব খুঁজে বের করা হবে। জেলা উপজেলাসহ সারাদেশে সরকারি অফিসে কত গাড়ি আছে তার তালিকা করা হবে। দেখা হবে কোন গাড়ি, কোথায় আছে এবং কতদিন কার্যকর থাকে। সারা দেশে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় কত গাড়ি আছে, তার হিসাবও নেওয়া হবে। এই গাড়িগুলো কী অবস্থায় আছে, তাও জানাতে হবে। এ বিষয়ে প্রতিবেদন উপদেষ্টা পরিষদে পেশ করবেন।

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ পরবর্তী বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক অবস্থান, মহামারী করোনার অর্থনৈতিক মন্দার পর সরকার মিতব্যয়ীতার পথ নেয়। একইসাথে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে ডলার সংকট চরমে পৌঁছেছে। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ায় কৃচ্ছ্রতা সাধনে নজর দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে কৃচ্ছ্রতা সাধন নীতির কারণে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটের সংক্ষিপ্তসারে বলা হয়েছে, সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির প্রেক্ষিতে এবং অগ্রাধিকার খাতে অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে শেয়ার ও ইক্যুইটি বিনিয়োগ খাতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে শেয়ার ও ইক্যুইটিতে বিনিয়োগ খাতে ১৩ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ হ্রাস করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত