২০২২ সালে গণবিক্ষোভের মধ্যদিয়ে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর স্পিকার সংসদ ভেঙে দেন এবং নতুন রাষ্ট্রপতিকে দায়িত্ব দেন। এর ২ বছর পর গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪ দেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বামপন্থি দল ‘জনতা বিমুক্তি পেরামুনা’ (জেভিপি) প্রধান অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েক ৪২.৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়লাভ করেন। জনতা বিমুক্তি দল আগে দুবার সশস্ত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য বিদ্রোহ করে। ১৯৭১ সালে একবার এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮৭ সালে আরেকবার। দুবারই লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী অথবা বিপ্লবীদের জীবন দিতে হয়। ১৯৮২, ৯৪, ৯৯, ২০১৯, ২০২২ সালে নির্বাচনে দলটি অংশগ্রহণ করে। নির্বাচনে ভোট পায় যথাক্রমে ৪.১৯%, ০.৩০%, ৪.০৮%, ৩.১৬% এবং ১.৩৭ শতাংশ।
জনতা বিমুক্তি দল আগে কখনো শ্রীলঙ্কার বিরোধী দলেও ছিল না। দেশটির গত পার্লামেন্ট নির্বাচনে ২২৫ সদস্যের মধ্যে আসন ছিল মাত্র তিনটি। অতি বামপন্থি নেতা দিশানায়েকের বিজয়কে ভূমিধস বিজয় না বলে ভূমিকম্প বিজয় বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত হবে। দিশানায়েকের নায়ক বেশে প্রত্যাবর্তনকে বুঝতে হলে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে পারা জরুরি। ১৯৪৮ সালে শ্রীলঙ্কার স্বাধীনতার পর থেকে, দেশটি শাসন করেছে দুটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল বা তাদের জোট বা তাদেরই কোনো অংশ। এরা হলো ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) এবং শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি (এসএলএফপি)। ইউএনপি ২০২০ সালে ভেঙে ‘সমগি জনা বালাওয়েগয়া’ নামে নতুন দল গঠিত হয়। এবং আগের দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীই এই দলে যোগ দেন। দলের নেতা ছিলেন সজিথ প্রেমাদাসা, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসার ছেলে। ইউএনপি তখন রনিল বিক্রমাসিংহের নেতৃত্বে চলে যায়। দল একত্র থাকাকালে তিনি ৬ বার শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এসএলএফপির নেতৃত্বে ছিলেন রাজাপাকসে পরিবার। দুই ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে ও গোতাবায়ে রাজাপাকসে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৬ সালে ফ্রিডম পার্টি ভেঙে ‘শ্রীলঙ্কা পোদুজানা পেরামুনা’ নামে দল গঠন করে রাজাপাকসে পরিবার। ২০১৫ সালের নির্বাচনে এই দুই দলই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালের নির্বাচনে রাজাপাকসের পরিবারের দল ‘পেরানুমা’ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয় এবং সংসদেও অধিক সংখ্যক আসন লাভ করে। গোতাবায়ে রাজাপাকসে রাষ্ট্রপতি এবং তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে হন প্রধানমন্ত্রী। সর্বশেষ ২০২২ সালে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কায় জনবিক্ষোভের মুখে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
মূলত, দুই পরিবারের মধ্যে দেশের শাসন সীমাবদ্ধ, দ্বিদলীয় বৃত্তে দীর্ঘদিন ধরে আবদ্ধ থাকায় দেশের মানুষ নতুন মত ও পথ খুঁজছিলেন। স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিতে বিক্ষুব্ধ হয়ে রাজাপাকসে পরিবারকে প্রত্যাখ্যান করে শ্রীলঙ্কার জনগণ। সর্বশেষ ২০২৪ নির্বাচনেও মাহিন্দা রাজাপাকসের ছেলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নিয়ে মাত্র ২.৬৭ শতাংশ ভোট পান। কিছুদিন আগের সবচেয়ে বড় দলকেও মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে। আরেক বড় রাজনৈতিক দল ‘বালাওয়েগয়া’র নেতা সজিথ প্রেমাদাসাও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশ নেন। যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসার ছেলে। তাকেও দেশের মানুষ তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচন করেনি। যদিও তারা শ্রীলঙ্কার গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সহযোগী শক্তি ছিল। দুদল তথা দুই পরিবারের বিগত সময়ের ব্যর্থতা, সীমাহীন দুর্নীতি, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, উচ্চ-মূল্যস্ফীতি দেশকে দেউলিয়ার দিকে নিয়ে যায়। মানুষ তাই বিকল্প খুঁজছিল, নতুন পথ খুঁজছিল, তারুণ্যের কাঁধে দায়িত্ব দিতে চাচ্ছিল। যে কারণে বিগত নির্বাচনে মাত্র ১.৩৭ শতাংশ ভোট পাওয়া সত্ত্বেও সামান্য সময়ের ব্যবধানে মানুষ বামপন্থি নেতা দিশানায়েকেই আস্থা রাখে।
বাংলাদেশের মানুষও কি নতুন নায়ক খুঁজছে?
প্রথমত, পরিস্থিতি মোটামুটি একই। ক্ষমতাসীন দলের গণধিকৃত হয়ে পলায়ন, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, সীমাহীন দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, প্রধান বিরোধী দলের পূর্বে ইতিহাসে মানুষের অনাস্থা, অবিশ্বাস, পাশাপাশি দল সম্পর্কে কিছু প্রোপাগাণ্ডা ইত্যাদি এই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত দেয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন জরিপে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ দুদলের কাউকেই চাচ্ছেন না, অনেকেই নতুন দলকে সমর্থন দেওয়ার আশা ব্যক্ত করেছেন, তবে অধিকাংশই এখনো সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানা যায়।
অনেকেই ধরেই নিয়েছেন তারা ক্ষমতা থেকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত দূরত্বে তারা অবস্থান করছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করলে দেখা যাবে এই সরলীকরণ মোটেও সহজ কাজ হবে না। প্রথমত, মানুষ ‘আওয়ামী লীগ নাকি বিএনপি’ এই বাইনারি থেকে বের হতে চায়। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ পালানোর পর স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদাবাজির হাত বদল ইত্যাদি মানুষের মনে বিএনপি সম্পর্কে নতুন কোনো বার্তা দিচ্ছে না। হাজার মানুষের জীবনের বিনিময়ে স্বৈরাচারের পতনের পর মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল, দেশের অন্যতম বড় দল হিসেবে বিএনপিকে তা ধারণ করতে হবে। এবং গত ১৫ বছর বিএনপি ক্ষমতাসীনদের নির্যাতন ও নিপীড়নের মুখে যে ধৈর্য ও সহনশীলতা দিয়ে জনমনে সহমর্মিতা তৈরি করেছে তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে দলটিকে। কারণ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের জনমানুষ নতুন কিছু চায়। বিএনপিকে এবার এই নতুন পরিবর্তনের নেতৃত্ব দানকারী দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ দিতে হবে। দলের হাইকমান্ড থেকে অবশ্য এই পরিবর্তন ভালোভাবেই খেয়াল করা যাচ্ছে, এক দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নির্বাসিত। জুলাই অভ্যুত্থান সংগঠিত করতে অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ, দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকা, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য, বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি ইত্যাদি রূপরেখা অবশ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
দ্বিতীয়ত, দিশানায়েকে শুধুমাত্র দ্বিদলীয় বৃত্ত ভাঙার প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসেননি। বরং তাদের কর্মসূচি, মানুষের আস্থা অর্জন, মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারা ইত্যাদি মানুষ তাদের ভোট দিতে আগ্রহী করে তোলে। সামাজিক ন্যায়বিচার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দলটির অনড় অবস্থান নাগরিকদের আকৃষ্ট করেছে। বাংলাদেশের বামপন্থি দলগুলো সে স্বপ্ন দেখাতে পারবে কি না সেটি একটি বড় প্রশ্ন। দুটো কারণে বাংলাদেশের বামপন্থিদের এই সম্ভাবনা কম দেখি এবং একই কারণে এখানে ইসলামপন্থিদের উত্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
১. বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ জনগণ এই অভ্যুত্থানে অংশ নিলেও শ্রীলঙ্কার প্রেক্ষাপটে বামপন্থি দলগুলো যেভাবে সব মানুষের কাছে দ্বিদলীয় বৃত্তভাঙার আবেদন নিয়ে যেতে পারছে, নিজেদের কর্মসূচি গ্রাম পর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারছে সেটা বাংলাদেশে বামপন্থিদের পক্ষে অনেকটাই কঠিন। শ্রীলঙ্কার প্রায় শতভাগ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী থাকার কারণে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত সচেতনভাবে নিতে পারছে, যেটি দ্বিদলীয় লুটপাটের পারিবারিক ভূমিতে নতুন দল খুঁজে নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ভূমিকা পালন করেছে। এদিক থেকে ইসলামপন্থি দলগুলো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। অবশ্য জামায়াত এর আগে বিএনপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় গেলেও তাদের দলের মন্ত্রীদের অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ তেমন শোনা যায়নি। কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ জামায়াতের প্রধানতম বাধা। এক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কিছু বাম দলের জোট গঠন এবং গত ১৫ বছরে তাদের শীর্ষ নেতাদের দুর্নীতি দেশের অন্য বাম দলগুলোকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
২. বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলামপ্রিয়। বামপন্থিদের ঘাড়ে ইসলামোফোবিয়ার তকমা আছে। দলগুলোর মধ্যে কম থাকলেও বামপন্থি নামে পরিচিত মানুষের মধ্যে ইসলামোফোবিয়ার বহু নজির পাওয়া যায়। বামপন্থি দল ও অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে পার্থক্য করতে পারার পর্যায়ে দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো যায়নি। যে কারণে বামপন্থি দলগুলোকে নিজের অবস্থানের প্রমাণ জনগণের সামনে দিতে হবে, তাহলেই কেবল বিকল্প নায়ক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এই ধর্মীয় আবেগ একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামপন্থিদের জন্য সুবিধাজনক। যদি দেশের মানুষ শ্রীলঙ্কার মতো দ্বিদলীয় বৃত্ত ভাঙতে চায় তাহলে বামপন্থিদের তুলনায় ইসলামপন্থিদের গ্রহণ করবে বলেই মনে হয়। একক দল হিসেবে না পারলেও ইসলামপন্থিদের জোট হলে ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়বে।
৩. তৃতীয় কারণটি অবশ্য ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে। সেটি হলো- বিভিন্ন উদার ও গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর ফ্যাসিবাদী আচরণ লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, নারীর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ ইত্যাদি ইস্যুতে। যদি দলটি নিজেদের উদারতার পরিচয় দিতে পারে তাহলে সম্ভাবনা তৈরি হবে। নয়তো বিশাল সংখ্যক ভোটার তাদের পরিত্যাগ করবে। এদিক দিয়ে বামপন্থিরা কিছুটা সুবিধাজনক।
বাংলাদেশে ঠিক কবে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সেটা এখনো নির্ধারণ না হলেও অনুমান করা যায় দেড় বছরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আগামী দেড় বছরের বিভিন্ন কার্যক্রম বলে দেবে, বিএনপির একক বৃত্তে নতুন কোনো দল বা জোট প্রবেশ করে বাংলাদেশে নতুন দ্বিদলীয় বৃত্ত গঠন করবে নাকি দ্বিদলীয় বৃত্ত ভেঙে নতুন দিশানায়েকের আগমন ঘটবে? কে হবে আগামীর বাংলাদেশের নায়ক? তারেক রহমান, নতুন দল, বামপন্থি নাকি ইসলামপন্থিরা?
লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট
