ইরানে ইসরায়েলের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অতি গোপন গোয়েন্দা নথি কীভাবে ফাঁস হলো, তা নিয়ে চলছে জল্পনা-কল্পনা। এরই মধ্যে নথি ফাঁসের ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে দেশটি। ফাঁস হওয়া এসব নথিতে ইরানে ইসরায়েলের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যায়ন উঠে এসেছে। তবে এসব নথি আসল কি না সে নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নথিগুলোর শিরোনামে যেসব বাক্য ব্যবহার করা হয়েছে, দৃশ্যত তা সঠিক বলে মনে হচ্ছে। অতীতে যেসব গোপন নথি ফাঁস হয়েছে, সেসবের সঙ্গে মিল রয়েছে নথিগুলোর। নথি ফাঁসের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা ঠেকাতে ওয়াশিংটন নিজেই এসব নথি ফাঁস করে থাকতে পারে।
গত শুক্রবার গোপন দুটি নথি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। স্যাটেলাইটে ধারণ করা দৃশ্য ও অন্যান্য গোয়েন্দা তথ্য-বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের অধীনস্থ সংস্থা ইউএস ন্যাশনাল জিওসপ্যাটিয়াল-ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি। ইরানে ইসরায়েলের হামলার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংগৃহীত গোয়েন্দা তথ্যের মূল্যায়ন করা হয়েছে নথি দুটিতে। ‘টপ সিক্রেট’ শিরোনামের নথি দুটিতে ‘এফজিআই’ শব্দের ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলত ফরেন গভর্নমেন্ট ইন্টেলিজেন্সকে ইঙ্গিত করে। ফাঁস হওয়া নথিতে ‘টি কে’ শব্দের উল্লেখ আছে। ‘টি কে’ বলতে বোঝানো হয়েছে ‘ট্যালেন্ট কিহোল’। এই কোডওয়ার্ডটি স্যাটেলাইটভিত্তিক সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ও ইমেজারি ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র নথিগুলো ফাইভ আইস জোটভুক্ত অন্য চার দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ডের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সঙ্গে বিনিময় করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই জোটভুক্ত দেশগুলো নিয়মিত নিজেদের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যবিনিময় করে থাকে।
নথিগুলোয় বিশেষ দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যার একটি ‘গোল্ডেন হরাইজন’ এবং অন্যটি ‘রকস’ নামে পরিচিত। গোল্ডেন হরাইজন ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব। আর ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠান রাফায়েলের তৈরি রকস একটি একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা, যা মাটির ওপর ও নিচের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। নথিতে এ দুই ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থার মাধ্যমে ইস্ফাহানের কাছে ইরানের রাডার স্থাপনায় বিস্তৃত পরিসরে হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। তবে ইরানে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে নিজস্ব পারমাণবিক ব্যবস্থা সক্রিয় করার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসরায়েল আগেই ঘোষণা দিয়েছে, ইরানে তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু সামরিক স্থাপনা। তবে ফাঁস হওয়া নথিতে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও এর সহযোগী বাসিজ মিলিশিয়া গোষ্ঠীর ব্যাপারেও কিছু উল্লেখ করা হয়নি এসব নথিতে। সেই সঙ্গে কখন ও কোন লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণ করা হবে, সেসব তথ্য উঠে আসেনি এসব নথিতে।
আগামী ৫ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট হবে। এর আগে ইরানে হামলা হলে তা নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে, যা নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশটি। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরায়েল হামলা চালালে তা ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। তাই ওয়াশিংটন কৌশলগতভাবে এই নথি ফাঁস করে থাকতে পারে। সেই সঙ্গে নথিগুলোর তথ্য যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকার পরও ওয়াশিংটনের মিত্রদেশের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরির অভিযোগ আরও একবার প্রমাণিত হবে।
গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন, ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়া, লেবাননের সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহর প্রধান নিহত হওয়াসহ আরও কিছু ঘটনায় ক্ষুব্ধ ইরান ১ অক্টোবর ইসরায়েলে দুই শতাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েল তিন সপ্তাহ ধরে দেশটিতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে আসছে।
