আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গতকাল বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে। ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দেশের অন্যতম প্রধান ছাত্রসংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধের এ খবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছালে আনন্দ-উল্লাস প্রকাশ করে মিছিল ও সমাবেশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা।
মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখার দেওয়া প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, গত ১৫ জুলাই থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ জনগণকে উন্মত্ত এবং বেপরোয়া সশস্ত্র আক্রমণ করেছে। এভাবে শত শত নিরপরাধ শিক্ষার্থী ও ব্যক্তিকে হত্যা করেছে। আরও অসংখ্য মানুষের জীবন বিপন্ন করেছে। গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও ছাত্রলীগ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক, ধ্বংসাত্মক ও উসকানিমূলক কর্মকান্ড এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসী কাজে জড়িত আছে। সরকারের কাছে এ-সংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ আবদুল মোমেন জারিকৃত প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে গত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ হত্যা, নির্যাতন, গণরুমকেন্দ্রিক নিপীড়ন, ছাত্রাবাসে সিটবাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নসহ নানা ধরনের জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী কর্মকান্ডে জড়িত ছিল এবং এ সম্পর্কিত প্রামাণ্য তথ্য দেশের সব প্রধান গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে এবং কিছু সন্ত্রাসী ঘটনায় সংগঠনটির নেতাকর্মীদের অপরাধ আদালতেও প্রমাণিত হয়েছে।
এ অবস্থায় সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯’-এর ধারা ১৮-এর উপ-ধারা (১)-এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল এবং ওই আইনের তফসিল-২-এ ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নামীয় ছাত্রসংগঠনকে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করল বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। এই আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও জানানো হয়।
আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় আনন্দ মিছিল করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের খবর জানাজানি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উল্লাসে ফেটে পড়েন। পরে তারা আনন্দ মিছিল নিয়ে ভিসি চত্বর থেকে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন।
এ সময় শিক্ষার্থীদের এই মুহূর্তে খবর এলো, ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হলো; মুহূর্তে খবর এলো, সন্ত্রাসী লীগ নিষিদ্ধ হলো; হৈ হৈ রৈ রৈ, সন্ত্রাস লীগ গেলি কই; এই মুহূর্তে খবর এলো, ক্যাম্পাস সন্ত্রাসমুক্ত হলো এসব স্লোগান দিতে শোনা যায়।
ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করায় অন্তর্বর্তী সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নুসরাত তাবাসসুম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ। এত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানোর পরও এই সংগঠনটি কোনোভাবেই আর রাজনীতি করতে পারে না। তারা স্বৈরাচার সরকারের অন্যতম দোসর ছিল। এটি সময়ের সেরা সিদ্ধান্ত।’
নুসরাত আরও বলেন, ‘১৬ বছর ধরে আমরা নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছি। বিরোধিতা ছাড়া রাজু ভাস্কর্যে কোনো প্রোগ্রাম করতে পারিনি। গত ১৫ জুলাই এ ক্যাম্পাসেই আমাদের ভাই-বোনদের রক্তাক্ত করেছিল এই ছাত্রলীগ। অন্যান্য ছাত্রসংগঠন এবং তরুণদের জন্য একটা শিক্ষা। পাপ করলে পাপের ফল পেয়ে যেতে হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমরা আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব।’
সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম বলেন, ‘ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন বলেছিলেন, আন্দোলন যাবে-আসবে, ছাত্রলীগ থেকে যাবে। ছাত্রলীগ রাজপথে জন্ম নেওয়া সংগঠন। আজ কোথায় সেই সন্ত্রাসী সংগঠন, আজ থেকে তাদের রাজনীতি করার অধিকার নেই। খুনি হাসিনা যে দেশে গিয়েছেন, ছাত্রলীগও সে দেশে যাবে। যারা কথায় কথায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে জঙ্গিবাদ আর অপশক্তি খুঁজে বেড়াত, আজ তারাই সন্ত্রাসী। সন্ত্রাসীদের গর্ত থেকে বের করে বিচারের আওতায় এনে জেলে ভরতে হবে। বাংলাদেশে আর কোনো মুজিববাদের ঠিকানা হবে না।’
আরেক সমন্বয়ক আবু সাঈদ বলেন, ‘আজকে আমরা অনেক বেশি খুশি, কারণ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আমরা সারা দেশ থেকে ছাত্রলীগ ও তার দোসরদের সমূলে উৎখাত করতে চাই। আজকে ঢাকা শহরের মিষ্টি শেষ হয়ে যাক, তবু আনন্দ শেষ না হোক।’
রিফাত রশিদ বলেন, ‘৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগ গর্তে লুকিয়েছে। তাদের নেত্রী ভারতে পালিয়ে গেলেও তাদের এ দেশে ফেলে গেছেন। দেশের সব ছাত্র-জনতাকে বলতে চাই, আপনারা একটা একটা ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের গর্ত থেকে টেনে তুলে ধোলাই দিয়ে পুলিশের হাতে সোপর্দ করবেন। একজনও যেন আইনের হাত থেকে রক্ষা না পায়।’
সমন্বয়ক আহনাফ সাঈদ খান বলেন, ‘শুধু নিষিদ্ধ করেই ক্ষান্ত নয়, গণ-অভ্যুত্থানকে ধরে রাখতে হলে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কালচারাল ফ্যাসিস্টরাও ফিরে আসছে বিভিন্নরূপে। আমরা শপথবদ্ধ হয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে একটা ছাত্রলীগ দেখা মিললে সর্বশক্তি দিয়ে তাদের প্রতিহত করব। আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সংগঠনকেও নিষিদ্ধ করতে হবে, তাহলেই অভ্যুত্থান পূর্ণতা পাবে।’
এর আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি গতকাল সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলন থেকে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করতে আজ বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল। তার আগেই সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল সরকার। এর আগে গত মঙ্গলবার শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষিত পাঁচ দফার এক দফা ছিল চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা।
প্রতিষ্ঠার ৭৭ বছরের মাথায় এসে নিষিদ্ধ হলো ইতিহাস-ঐতিহ্য ও গৌরবোজ্জ্বল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর একাধিকবার ভাঙন হয়েছে এই সংগঠনে, নামে অদল-বদল হয়েছে কিছু। স্বাধীন বাংলাদেশে এর চরিত্র বদলেছে, অনেক সমালোচনার জন্মও দিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
