রাজধানীর ডায়মন্ড ওয়াল্ড মিরপুর-১১ শাখায় দুই বছর আগে কেনাকাটা করেছেন মো. শাহজাহান। এরপরে আর কেনাকাটা করেননি। তবে কিছু না কিনলেও প্রতিনিয়ত তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে ঠিকই ম্যাসেজ আসে। ম্যাসেজগুলো বিভিন্ন উৎসবের সময় তারা দিয়ে থাকেন । যাকে মূল্য ছাড় বিষয়টি উল্লেখ থাকে। বিষয়টি নিয়ে তিনি বিরুক্ত হলেও কিছু করার উপায় নেই। ডায়মন্ড ওয়াল্ডের মতো রাজধানীর বিভিন্ন সুপারশপ, শপিংমলে কেনাকাটার সময় ক্রেতাদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি সংগ্রহ করা হয়। পরে নামিদামি এসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের প্রচারণার স্বার্থে মোবাইল নম্বরগুলো সংগ্রহ করেন। পরে বিভিন্ন মূল্য ছাড়ে মেসেজে ক্রেতাদের জানানো হয়। এতে অনেক ক্রেতারাই বিরক্ত হোন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্রেতাদের ব্যক্তিগত এসব মোবাইল নম্বর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সুরক্ষা দেন তা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে ভোক্তাদের মনে। কারণ অনেক সময় নম্বরগুলো থার্ড পার্টির কাছে চলে যায়। এতে ভোক্তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকি মুখে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়। তবে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে এটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। গ্রাহকের মোবাইল নম্বরগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদে রাখা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশজুড়ে কেনাকাটার জন্য জনপ্রিয় সুপারশপ হচ্ছে স্বপ্ন। এই সুপারশপে কেনাকাটার সময় গ্রাহকের কাছ থেকে মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করা হয়। বিশেষ করে যারা নিয়মিত কেনাকাটা করেন তাদের কাছ থেকে। এই নম্বরগুলো সংগ্রহ করে তারা পরবর্তিতে গ্রাহকদের তাদের মূ্ল্য ছাড়সহ বিভিন্ন বিষয়ে অবগত করেন। রাজধানী ছাড়াও জেলা শহরগুলোর আউটলেটেও একই কাজ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্রেতাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বপ্নের এক আউটলেট ইনচার্জ বলেন, ‘নম্বরগুলো ক্রেতাদের সুবিধার স্বার্থেই নেওয়া হয়। ক্রেতাদের মেম্বারশিপের জন্য আমরা নম্বর নিয়ে থাকি। আমাদের মেম্বার হলে পণ্যে ক্রয়ে বিভিন্ন ডিসকাউন্ট থাকে। তাই ক্রেতাদের অনুমতি নিয়েই নম্বরগুলো নেওয়া হয়। এছাড়াও আমরা পণ্য ছাড় সংক্রান্ত বিভিন্ন অফার মেসেজ মাধ্যমে তাদের জানিয়ে থাকি। জোরপূর্বক কারও কাছ থেকে নম্বর নেওয়া হয়না। আর এই নম্বরগুলো ব্যবস্থাপনা করে হেড অফিস। এতে আমাদের কোন হাত থাকে না।’
এদিকে দেশে নামকরা জুতা ব্রান্ড কোম্পানির একটি এপ্রেক্স। দেশজুড়ে যাদের ব্যাপক সুনাম রয়েছে। তারাও গ্রাহকদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন। কেন নম্বর সংগ্রহ করেন বিষয়টি জানতে রাজধানীর ফার্মগেট-২ এপেক্স আউটলেট ইনচার্য আনিছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোন গ্রাহক ১৭০০ টাকার উপরে কেনাকাটা করলে সেক্ষেত্রে আমরা মোবাইল নম্বর নেই। কারণ এতে পয়েন্ট যোগ হয়। পরবর্তিতে সেই পয়েন্ট দিয়ে আমরা পণ্যের উপরে ডিসকাউন্ট দিয়ে থাকি। এতে গ্রাহকেরই লাভ হয়। এর বাইরে কিছু করা হয়না।’
গ্রাহকের নম্বরগুলো আপনারা কীভাবে সুরক্ষা দেন বিষয়টি জানতে এপেক্স হেড অফিসে যোগাযোগ করা হয়। হেড অফিসের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা গ্রাহকের মোবাইল নম্বরটি সব্বোর্চ গুরুত্ব সহকারে সংক্ষরণ করি। অন্যের প্রাইভেসি সুরক্ষা দেওয়া আমাদের প্রথম দায়িত্ব। এটা নিয়ে আমরা কখনো হেলাফেলা করি না। তবে গ্রাহকের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই নম্বরগুলো নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে চেইন সুপারশপ স্বপ্ন-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিভিন্ন কারণে গ্রাহকদের চিহ্নিতকরণ বা ট্র্যাক রেকর্ড রাখা আমাদের জন্য জরুরী । যেমন- লয়ালিটি পয়েন্টের মাধ্যমে ভোক্তাকে একটা ডিসকাউন্ট (সেবা) দিয়ে থাকি আমরা । সেই লয়ালিটি পয়েন্ট ভাঙ্গানোর জন্য ভোক্তার নাম্বার দরকার হয় । কারণ, ওই ভোক্তার নাম্বারে ওটিপি এর মাধ্যমে সুনিদিষ্ট গ্রাহককে শনাক্ত করা হয় । মূলত এই ওটিপি নাম্বার বলে দেয় যে, তিনিই সেই গ্রাহক, অন্য কেউ নন । অতীতে আমরা এ ধরনের অনেক সমস্যা দেখেছি যে, একজনের লয়ালিটি পয়েন্ট অন্য একজন এসে ভাঙিয়ে নিয়ে গেছেন, পরে ভোক্তারা আমাদের কাছে অভিযোগও করেছেন। এটা যেন না হয়, সেজন্য গ্রাহকের নাম্বারটা জরুরী ।
এছাড়া আমাদের ক্রেতারা বিভিন্ন সময় কি কি অফার চলছে তা জানতে চান। একটা বড় সংখ্যক ক্রেতা এসএমএস সেবাটি চান । সব গ্রাহক এক রকম না তাই গ্রাহকদের পার্চেস বিহেভিয়ারের উপর নির্ভর করে গ্রাহকদের সুবিধা অনুযায়ি আলাদা গ্রুপে বা আলাদা আলাদা করে অফার-এর এস এম এস সেবা দেওয়া হয়। সে কারণেও নাম্বার দরকার হয়। বিভিন্ন ম্যানুফ্যাকচারের কাছ থেকে আমরা যখন বিভিন্ন সময় অফার পেয়ে থাকি তখন একটা কন্ডিশন দেওয়া থাকে যে, আমরা যেন রিটেইলার বা দোকানদারদের কাছে এগুলো যেন না বিক্রি করি। কারণ দোকানদারদের কাছে বিক্রি করলে পরিবেশক, দোকানদার ও কোম্পানীর মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব তৈরী হয়। তাই প্রকৃত ক্রেতাদের নিকট এই অফারগুলো নিশ্চিত করার জন্য নাম্বার দরকার হয়।
ভোক্তার নাম্বার থাকলে আলাদা করে অর্ডারও ট্র্যাকিং করা যায় । আমরা তখন ট্রাকিং করে বুঝতে পারি যে, উনি দোকানদার না, প্রকৃত ভোক্তা । আর বাজারে বিভিন্ন পণ্যের মূলবৃদ্ধির কারণে আমরা প্রায় সময় ছাড় দিয়ে থাকি। এই সুযোগ যেন কোনো দোকানদার বা মুষ্টিমেয় গ্রাহক ভোগ করতে না পারে সেজন্য ট্র্যাকিং এর দরকার হয় । এই সমস্ত কারণে মূলত মোবাইল নাম্বারটি দরকার হয় । এটি এমন বিষয় না, যে আবশ্যক কিছু । যারা এই ধরনের সেবা নিতে আগ্রহী তাদের জন্য মূলত এই নাম্বার দরকার হয় । আর বাংলাদেশে শুধু না সারাবিশ্বের চেইনশপে গ্রাহকের কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে সেবা দেবার বিষয়টি চালু রয়েছে।
এসব বিষয় নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের অপারাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাহারিয়া আফরিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ডিজিটালি অনেক উন্নত হচ্ছি, যার প্রভাব পড়েছে সবখানেই। এখন কেনাকাটা থেকে সবকিছু ডিজিটাল মাধ্যমে হচ্ছে। এর পজেটিভ ও নেগেটিভ দুই দিকই রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্রেতাদের সচেতন হতে হবে। কোন তথ্য দিলে আমার উপকার হবে আর কোনটা আমার জন্য ক্ষতিকর তা নিজেকেই চিহ্নিত করতে হবে। তবে ব্যক্তিগত তথ্য নেওয়া প্রাইভেসির লঙ্ঘন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়েও পড়ে। এই বিষয়গুলো দেখভালের জন্য সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে নতুন দপ্তর করে বিষয়গুলো দেখভাল করা উচিত।’
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ চেয়ে হাইকোর্টে হাসনাত-সারজিসের রিট
আপিল বিভাগেও স্থগিত সোহেল রানার জামিন
এবার কি প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পাবে আমেরিকা?