শিশুদের দৈনন্দিন ব্যবহৃত পণ্য ও খেলনায় উচ্চমাত্রায় সিসাসহ বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ পাওয়া গেছে। এসব রাসায়নিক সরাসরি প্রভাব ফেলছে শিশু স্বাস্থ্যে। এতে তাদের শারীরিক ও স্নায়বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া শ্বাসকষ্ট, ত্বক জ্বালাপোড়া, কিডনি নষ্ট ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষায় সিসার মাত্রা নির্ধারণে দ্রুত আইন করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সেমিনারে এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (এসডো) এই গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে। এতে দেখা গেছে, শিশুর ব্যবহৃত ৫৯ শতাংশ পণ্যে ৯০ পিপিএমের অধিক মাত্রার সিসা রয়েছে। এ মাত্রার উপস্থিতি ১ হাজার ৩৭০ পিপিএম পর্যন্ত।
‘দ্য সাইলেন্ট পয়জন: ট্রেসেস অব লেড ইন চাইল্ডহুড ট্রেজার্স’ শীর্ষক এই গবেষণা এসডো ২০১৩ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে করে আসছে। এর মাধ্যমে শিশুর খেলনায় সিসা, ক্যাডমিয়াম (টিনজাতীয় ধাতু) ও থ্যালেটসের (বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের একটি গ্রুপ) মতো ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি শনাক্ত এবং শিশুর সুরক্ষা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ফিলিপাইনের ব্যান টক্সিক্সা নামে বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্বে ২০২৪ সালে দেশের বাজার থেকে সরাসরি শিশুদের পণ্য সংগ্রহ এবং এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স এক্সআরএফ মেশিন ব্যবহার করে সেগুলোয় সিসার মাত্রা বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি। ২৫০টি নমুনার মধ্যে বেশির ভাগই ছিল প্লাস্টিক; বাকিটা মেটাল।
এতে দেখা গেছে, শিশুর খেলনায় উচ্চমাত্রায় সিসা পাওয়া গেছে, যা ১ দশমিক ৬৮ পিপিএম থেকে ৩৭৯ পিপিএম পর্যন্ত বিস্তৃত। পরীক্ষিত ২৫০টি পণ্যের মধ্যে ১৫৭টি পণ্যেই সিসার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৯২টি পণ্যে নিরাপদ সীমা ৯০ পিপিএমের চেয়ে বেশি।
শিশুদের ফিডারজাতীয় মগে ১ হাজার ৩৮০ পিপিএম সিসা, ২৪৭ পিপিএম আর্সেনিক এবং ১ হাজার ৩৯০ পিপিএম ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। শিশুদের প্রতিনিয়ত ব্যবহার করা এই পণ্যে বিপজ্জনক রাসায়নিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনক। আবার শিশুদের ব্যবহৃত স্টেশনারি ব্যাগে ৫৮০ পিপিএম সিসা, ১ হাজার ২৮০ পিপিএম বেরিয়াম এবং ৮৮ পিপিএম পারদ পাওয়া গেছে, যা পড়াশোনার সরঞ্জামকেও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিণত করেছে। একটি নামকরা শপিংমল থেকে সংগ্রহ করা একটি পুতুল সেটেও ৫০০ পিপিএম সিসা পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে উচ্চমানের পণ্যও সিসা থেকে মুক্ত নয়। একটি বর্ণমালা সেটের একটি উজ্জ্বল অক্ষরে ৬৬০ পিপিএম সিসা পাওয়া গেছে। শিশুদের সুরক্ষায় এসব পণ্যে ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ায় সিসার পরিমাণ নির্ধারণ করেছে। তবে বাংলাদেশে এ নিয়ে এখনও কোনো আইন নেই।
এসডোর চেয়ারপারসন সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ বলেন, শিশুদের পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষায় আমাদের দ্রুত সিসার পরিমাণ নির্ধারণে আইন করতে হবে।
এসডোর মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, খেলনা শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সহায়ক। কিন্তু যখন তাতে সিসার মতো বিষাক্ত পদার্থ থাকে, তখন তা ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। এই খেলনাগুলো শিশুদের স্বাস্থ্য ও বিকাশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। নিরাপদভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করতে পণ্যগুলো সিসামুক্ত হওয়া জরুরি।
এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দীকা সুলতানা বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। যে কোনো পরিমাণে সিসা শরীরের জন্য ক্ষতিকর। শিশুদের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ। কারণ, তাদের শরীর দ্রুত সিসা শোষণ করে, যা মানসিক ও শারীরিক বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এটি একটি স্বাস্থ্য সংকট, যার জন্য এখনই আইন করা প্রয়োজন।
সিসার ক্ষতিকর দিক ব্যাখ্যা করে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও প্রতিষ্ঠানটির সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, খাবার, শ্বাসপ্রশ্বাস ও অন্তঃসত্ত্বা মায়ের মাধ্যমে শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশ করে। সিসা কারও শরীরে একবার ঢুকলে ২০ বছর স্থায়ী হয়। তবে প্রাথমিক পর্যায়েই এটি শনাক্তের ব্যবস্থা দেশে নেই। সিসা রক্তে চলে গেলে এটি বের করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে সিসাযুক্ত রং আমদানি আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তবে কীভাবে এসব রং শিশুদের খেলনা বা ব্যবহার্য পণ্যে মিশছে, তা সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে খুঁজে দেখতে হবে। এভাবে গবেষণা হলে আমাদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা সহজ হয়।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহসহ ১১ মামলা বাতিল
নিষিদ্ধ হলেই ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা যাবে? আইন কী বলছে?