যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে পুতিনের স্বার্থ কী

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০৫ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ছেন কমলা হ্যারিস ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে অদৃশ্য থেকে যেন লড়ছেন ভ্লাদিমির পুতিনও। লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

হোয়াইট হাউজে কে যাবেন, কমলা হ্যারিস না ডোনাল্ড ট্রাম্প; তা নিয়ে চলছে দীর্ঘ লড়াই আর টান টান উত্তেজনা। ৫ নভেম্বর হ্যারিস এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের মধ্যে নখ কামড়ানো এ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লড়ছে যেন রাশিয়াও। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর খবরে বলা হচ্ছে, ২০১৬ এবং ২০২০ সালের মতো আবারও মার্কিন কর্মকর্তারা মস্কোর বিরুদ্ধে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগ এনেছেন। একটি সাম্প্রতিক ফেডারেল অভিযোগে বলা হয়েছে, ডানপন্থি সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবশালীর রাশিয়ায় সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন ধরনের প্রচার চালানো হচ্ছে। ক্রেমলিন হোয়াইট হাউজে ট্রাম্পকে পছন্দ করে, এমন অভিযোগ এসব ঘটনার প্রমাণ। বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের জয় রাশিয়াকে সাহায্য করতে পারে। কিছু বিশ্লেষক বলছেন, রাশিয়ার হিসাব আরও জটিল, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে মস্কোর প্রভাব গুরুতর। বিশ্লেষকরা প্রমাণ হিসেবে রিপাবলিকান মনোনীত ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বিজয়ী হওয়ার ঘটনাকে ইঙ্গিত করেন। ওই নির্বাচনে রাশিয়ার সহায়তা নিয়ে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ট্রাম্প রাশিয়ার স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করেন। যে কারণে এবার পুতিন কমলা হ্যারিসের পক্ষ নিয়েছেন। রাশিয়া এমনকি কমলার পক্ষে ভুয়া ভোটদানের ভিডিও প্রচার করছে বলেও অভিযোগ। আলজাজিরা জানাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য জর্জিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেট বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে হাইতিয়ানরা ডেমোক্রেটিক পার্টি মনোনীত কমলা হ্যারিসকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। তবে এ ভিডিওটি ভুয়া। জর্জিয়ার রাজ্য কর্মকর্তা ব্র্যাড রাফেনসবার্গারের মতে, এটি সম্ভবত রাশিয়ান ট্রল ফার্মের একটি উৎপাদন।

ইউক্রেন যুদ্ধ

আলজাজিরায় এ-সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের বিজয়ের পর রাশিয়ার আশা ছিল মার্কিন নীতিগুলো মস্কোর স্বার্থের জন্য আরও সুসংহত হবে। তবে ঘটনা পুরোপুরি তেমন ঘটেনি। ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন এবং ইউক্রেনকে অ্যান্টি ট্যাঙ্ক মিসাইলসহ প্রাণঘাতী অস্ত্র সহায়তা দিতে অনুমোদন করেছিলেন। যা ট্রাম্পের পূর্বসূরি বারাক ওবামা করতে অস্বীকার করেছিলেন। এরপর রাষ্ট্রপতি জো বাইডেনের প্রশাসনের অধীনে ইউক্রেনে যুদ্ধাস্ত্রের প্রবাহ বেশ কয়েকটি আদেশ দিয়ে বৃদ্ধি করা হয়। তবে ট্রাম্প সম্প্রতি এ ধরনের অস্ত্র সহায়তা হ্রাস বা এমনকি এটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানান। তার অবস্থান স্পষ্টভাবে রাশিয়াকে উপকৃত করছে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এলে অবিলম্বে ইউক্রেনে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাশিয়ার জন্য এটি স্বস্তির। এ কারণে রাশিয়ানরাও ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছেন। মস্কোর অধিবাসী আইসোল্ডা এ বিষয়ে আলজাজিরাকে বলেন, আমার মা আজ বলেছেন যে ট্রাম্প জিতবেন এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ হবে। কারণ আমেরিকা অবশেষে ইউক্রেনকে অর্থ দেওয়া বন্ধ করবে। আইসোল্ডা জানান, তার মা কখনো রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের উগ্র সমর্থক ছিলেন না। তবে প্রপাগান্ডা তার কাজ করে চলেছে।

এদিকে ট্রাম্পের সঙ্গী জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য একটি বিশদ শান্তিপরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে বর্তমান একটি নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যার অর্থ কার্যকরভাবে ইউক্রেনীয় অঞ্চলকে বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে দেওয়া এবং ইউক্রেনকে ন্যাটোর বাইরে রাখা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এগুলো এমন ফলাফল যা রাশিয়াকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করে এবং ইঙ্গিত দেয় যে ট্রাম্প প্রশাসন ইউক্রেনকে অস্ত্র ও আর্থিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখবে না। রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞার অবসান বা অনেকটা কমিয়ে আনারও ইঙ্গিত দিচ্ছে এ বার্তা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প বিষয়ে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের নীতি আরও অস্থির হবে। ইউক্রেনকে সমর্থন করার জন্য মার্কিন প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে অনেক শোরগোল উঠবে এবং অনেক বেশি অনিশ্চয়তা থাকবে।

কমলা না ট্রাম্প

আলজাজিরা জানাচ্ছে, নির্বাচনের বিষয়ে ক্রেমলিনের সরকারি অবস্থান তুলনামূলকভাবে সংযত করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরে এক সম্মেলনে পুতিন তার চিরাচরিত হাসি দিয়ে হ্যারিসকে সমর্থন জানিয়ে কটাক্ষ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ পরে স্পষ্ট করেন যে, পুতিন রসিকতা করেছেন। তিনি আরও বলেন, রুশ-আমেরিকান সম্পর্ক এমন পর্যায়ে অবনতি হয়েছে যেখানে ওভাল অফিসে কে দখল করবে তা সামান্য পার্থক্য তৈরি করবে। কারণ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত যে কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থ দেখে নেওয়া হয়। তারপর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি পদের দুই শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে কূটনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করেছে রাশিয়া। রাশিয়ান অর্থনীতিবিদ এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কনস্ট্যান্টিন সোনিন বলেন, হ্যারিসের নীতি হবে বাইডেনের নীতি আরও জোরদার করা ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা এবং সামগ্রিক সমর্থনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করাতে সক্ষম হবেন তিনি। যদিও আমি মনে করি না যে যুদ্ধের সময় ইউক্রেনকে ন্যাটোতে নেওয়ার জন্য হ্যারিস যথেষ্ট সাহসী হবেন। অপরদিকে ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কিকে যুদ্ধ শুরুর জন্য দায়ী করেছেন। ট্রাম্প তাকে বিলিয়ন ডলার মার্কিন সহায়তা পাওয়ার জন্য ‘পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিক্রয়কর্মী’ বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্প দাবি করেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে একদিনের মধ্যে শান্তি আনবেন। তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভসহ মস্কোর মতে, ট্রাম্পের কোনো বিশ্বাস নেই। তুলনায় কমলা হ্যারিস আরও সহজে বুঝা যায় এমন প্রতিপক্ষ। সোভিয়েত ইউনিয়নের আমেরিকান ইতিহাসবিদ কিম্বার্লি সেন্ট জুলিয়ান-ভারনন বলেন, পুতিন এবং পেসকভ ধারণা করছেন হ্যারিস প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাদের পররাষ্ট্রনীতির পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়ার জন্য তুলনামূলক স্থিতিশীল। এ বিশ্লেষক বলছেন, পুতিন জানেন যে ট্রাম্প নীতির ক্ষেত্রে আরও আবেগপ্রবণ এবং প্রতিক্রিয়াশীল এবং তার কথা বিশ্বাস করা যায় না। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান পুতিনের থেকে একেবারে আলাদা এবং আমি মনে করি, এটিও দেখার বিষয় যে পুতিন এবং পেসকভ কীভাবে দ্বিতীয়বার ট্রাম্পের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বিষয়টিকে প্রভাবিত করে।

পুতিনের বিভ্রান্তি

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্প ইউক্রেনে সামরিক সাহায্যের প্রবাহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করবেন না। কংগ্রেসের ক্ষমতা আছে। তাই রাষ্ট্রপতিকে তার সিদ্ধান্তের পক্ষে সমর্থন তৈরি করতে হবে। মার্কিন জনগণ এবং মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যে ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্য জোরালো সমর্থন রয়েছে, তাই এমনকি রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পকেও ইউক্রেনকে সমর্থন করে যেতে হবে। তাই হ্যারিস বা ট্রাম্প যিনি আসুন না কেন তাদের বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করবে কংগ্রেস। যা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। এমনকি হ্যারিস জিতে গেলেও এবং ইউক্রেনে সহায়তা অব্যাহত রাখতে চাইলেও, একটি রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত বা আধিপত্যপূর্ণ হাউজ এবং সিনেট সহজেই সেই সহায়তা কমাতে বা স্থগিত করতে পারে, যা ২০২৪ সালের শীতকালে এবং বসন্তের শুরুতে ঘটেছিল। কিন্তু সাহায্য বন্ধ করা হলেও শান্তি যে আসবে তার নিশ্চয়তা নেই। কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনে মস্কোর লক্ষ্য অবাস্তব।

পুতিন ট্রাম্পের জয় এবং পরবর্তী সময়ে ইউক্রেনের ওপর আরোপিত একটি ‘শান্তি’ আশা করেন। কিন্তু এটি পুতিনের বিভ্রম। পুতিনের দর্শনে, ইউক্রেন একটি মার্কিন পুতুল। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাদের যা করতে বলবেন তারা তা করবে। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মিত্রকে পরীক্ষা করে দেখুন, তারা কি সত্যিই তা করে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের করতে বলে? অতএব সহজে অনুমেয়, ইউক্রেন পুতিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করবে না এবং ট্রাম্পের পক্ষে তাদের ওপর জোর করার কোনো উপায় নেই।

এদিকে সাধারণ রাশিয়ানরা তাদের নিজস্ব রাজনীতির প্রতি মূলত উদাসীন কারণ তারা ক্ষমতাহীন। হাজার হাজার মাইল দূরের বিদেশি নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবার কোনো কারণ তাদের নেই। তারপরও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রভাব তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। ভয়েজ অব আমেরিকার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘুরিয়ে দিতে চীন, ইরান ও রাশিয়া আগ্রাসীভাবে আমেরিকান ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে নতুন প্রমাণ পাওয়া গেছে। সফটওয়্যার সংস্থা মাইক্রোসফট থেকে ও সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা রেকর্ডেড ফিউচার এমন অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ হাজির করে। তাদের অভিযোগ, এসব দেশের লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের বুথে যাওয়ার আগে জনমতকে প্রভাবিত করা। মাইক্রোসফটের বক্তব্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় আঘাতটি এসেছে চীন-সম্পৃক্ত সাইবার কর্মীদের পক্ষ থেকে যারা গবেষকদের কাছে ‘স্প্যামোফ্লেজ’ বা ‘তাইজি ফ্লাড’ নামে পরিচিত। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, চীনের প্রভাবিত করার অভিযান সম্প্রতি নতুন মোড় নিয়েছে। তারা বেশ কয়েকজন ডাউন-ব্যালট প্রার্থী ও কংগ্রেসের সদস্যের দিকে নজর দিয়েছে। এ সংস্থা আরও উল্লেখ করেছে, চীন সেপ্টেম্বর থেকে এ কর্মকাণ্ড শুরু করেছে এবং কমপক্ষে চারজন উল্লেখযোগ্য রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাকে নিশানা করেছে তারা। এসব আইনপ্রণেতা বেইজিং সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত। গত মাসের শেষের দিকে আরেকটি স্প্যামোফ্ল্যাজ টেনেসির রিপাবলিকান সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্নকে নিশানা করেছিল বলে জানিয়েছে মাইক্রোসফট। চলতি বছরের শুরুতে একই রকম প্রচেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভয়েজ অব আমেরিকা আরও জানায়, মাইক্রোসফটের রিপোর্ট বলছে, দুই সপ্তাহেরও কম সময় আগে ইরান কর্র্তৃক পরিচালিত এক অনলাইন ব্যক্তিত্ব নিজেকে মিথ্যাভাবে আমেরিকান বলে পরিচয় দিতে শুরু করেন এবং উভয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে সমর্থন করছেন বলে আমেরিকানদের ভোট বয়কট করার আহ্বান জানান। অবশ্য চীনের মতো রাশিয়া ও ইরান বারবার দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগের সঙ্গে তারা কোনোভাবেই যুক্ত নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত