দ্বিতীয় দফায় জয়ী হয়ে দেশে-বিদেশে প্রশংসা আর অভিনন্দনে ভাসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গড়েছেন কয়েকটি ইতিহাসও। এজন্য তিনি তার সমর্থক, পরিবারের সদস্য ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ভোটের আগে কমলা হ্যারিসের সঙ্গে তার হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেলেও ভোটের পরে দেখা গেছে খুব সহজেই জয় পেয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তার এ বিজয়ে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ৫০ অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ব্যাটলগ্রাউন্ড হয়ে ওঠা সাত অঙ্গরাজ্য। আর এসব রাজ্য জয়ে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় সহায়ক হিসেবে কাজ করেছেন ধনকুবের ও প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের মালিক ইলন মাস্ক ট্রাম্পের হয়ে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোয় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তিনি এবারের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ১১ কোটি ৯০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছিলেন তিনি। সে বিষয়টির জন্যই গতকাল বিজয়ী ভাষণে ট্রাম্প তাকে রিপাবলিকান পার্টির ‘নতুন তারকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে বক্তব্য রাখার সময় মাস্ককে নিয়ে স্মৃতিচারণও করেন ট্রাম্প। তিনি জানান, একবার স্পেসএক্স রকেটের একটি ভিডিও দেখার সময় তিনি মাস্ককে ৪০ মিনিটের জন্য আটকে রেখেছিলেন। এ ছাড়াও, মাস্ককে ‘বিস্ময়কর’ ব্যক্তি হিসেবেও উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প।
এদিকে ট্রাম্পের জয়ের রাতটি ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন ইলন মাস্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেছেন, মার-এ লাগো রিসোর্টে ট্রাম্পের সঙ্গেই নির্বাচনের রাতটি কাটাতে চান তিনি।
চলতি বছরের শুরুর দিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন জানান ইলন মাস্ক। গত মঙ্গলবার মাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের একটি ছবি পোস্ট করেছেন। সেখানে এ ধনকুবের লিখেছেন, তিনি টেক্সাসের ক্যামেরুন কাউন্টিতে ভোট দিয়েছেন। সেখানে মাস্কের কয়েকটি কোম্পানির সদর দপ্তর অবস্থিত। পরে ফ্লোরিডার উদ্দেশে রওনা করেন মাস্ক।
ট্রাম্পের বিজয়ে মাস্ক কী ভূমিকা রেখেছেন সে বিষয়ে বিবিসির একটি পুরনো প্রতিবেদন নতুন করে সামনে এসেছে গতকাল। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি, কী চান ইলন মাস্কÑশিরোনামের ওই প্রতিবেদনে ভোটারদের ওপর মাস্কের প্রভাবের বিষয়টি উঠে আসে।
বিবিসির ওই প্রতিবেদনে জ্যান্ডার মুন্ডি নামের এক ভোটারের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। ২১ বছর বয়সী মি. মুন্ডি একটি অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এবারের নির্বাচনে তার ভোট দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু তার শহরে ট্রাম্পের হয়ে প্রচার চালাতে যান মাস্ক। আর সেটাই বদলে দেয় তার সিদ্ধান্ত।
বিবিসি বলছে, ইলন মাস্কের কথা শুনতে ভিড় তৈরি হতে দেখে উত্তেজনা অনুভব করেন মুন্ডি। মাস্কের কথা শুনে তিনি কমলা হ্যারিসের চেয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকেই বেশি ঝুঁকে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, যদি এ রকম কেউ আপনাকে বলে যে, এই নির্বাচনই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চলেছে, কেবল আগামী চার বছরের জন্য কে রাষ্ট্রপতি হবেন তা নয়, বরং বিশ্ব কেমন হতে চলেছে... আমি মনে করি এটি একটি বিশাল ব্যাপার। এটা গুরুত্বপূর্ণ, খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমেরিকার জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গিতে, ৫৩ বছর বয়সী এই ব্যক্তি রিপাবলিকানদের নির্বাচিত করতে চেষ্টা করছেন তার সময়, জ্ঞান আর যথেষ্ট বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশের অভিজাত ব্যবসায়ীদের মধ্যে এটা সত্যিই বিরল, কারণ তারা ঐতিহ্যগতভাবেই পেছনে থেকে রাজনীতিকে প্রভাবিত করতে পছন্দ করেন।
বিবিসি বলছে, এটি ঐতিহ্যবাহী বড় বড় ব্যবসায়িক ব্যক্তিত্ব বা সিইওদের প্রচলিত আচরণ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যারা তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্য দাতাদের খুশি করতে হ্যাম্পটনের বিশাল বাড়িতে ব্যয়বহুল ভোজ আয়োজনের জন্যই বেশি পরিচিত।
মিশিগান ইউনিভার্সিটির রস স্কুল অফ বিজনেসের উদ্যোক্তা বিভাগের চেয়ারম্যান এরিক গর্ডন ব্যাখ্যা করেন, সিইওদের ঐতিহ্যগত কার্যক্রম জনসাধারণের সম্মুখে হয় না। কিন্তু মাস্ক এটি বেশ জোরেশোরে, প্রকাশ্যে এবং গর্ব করে করেন, যা সম্ভবত নিজেকে আলোকিত করে তুলতেই করা।
তবে পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যানের মতো কিছু ডেমোক্র্যাট তাদের দলকে নির্বাচনের আগে মাস্কের তরফ থেকে আসা সম্ভাব্য ঝুঁকি উপেক্ষা না করতে অনুরোধ করেছিলেন। তাদের ভাষ্য, ইলন মাস্ক এমন একটি জনসংখ্যার কাছে আবেদন তৈরি করেছেন, যারা তাকে নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান মনে করেন এবং যাদের কাছে ঐতিহ্যগতভাবেই গণতান্ত্রিক প্রচার-প্রচেষ্টা চালানোটা কঠিন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
গত ১৩ই জুলাই পেনসিলভানিয়ার বাটলারে হত্যা প্রচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পকে প্রথম সমর্থন দেওয়ার পর থেকে, ইলন মাস্ক ট্রাম্পের প্রচারাভিযানের একটি অংশ হয়ে উঠেছেন, যেখানে তিনি প্রায়শই সতর্কবার্তা দিয়ে থাকেন যে শুধুমাত্র ট্রাম্পই আমেরিকার গণতন্ত্রকে বাঁচাতে পারেন।
