তখন বিকেল। সূর্য প্রায় হেলে পড়েছে। দেশ রূপান্তর অফিসে তিনি ঢুকছেন হেলেদুলে। হাসিমুখে বললেন কতদিন পর দেখা, তাই না! বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানকে নিয়ে বাড়তি বলার কিছু নেই। ইশারায় বললেন চলো, আলো চলে যাবে। দ্রুত গেলেন ছবি তুলতে। এরপর এলেন ডিজিটাল রুমে। শুরু হলো আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সিনিয়র সহ-সম্পাদক (অনলাইন ইনচার্জ) মাহতাব হোসেন, সিনিয়র সহ-সম্পাদক দীপংকর দীপক এবং প্রতিবেদক (মাল্টিমিডিয়া) নিহার সরকার অংকুর। ক্যামেরায় ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নুরুস সাফা।
তখন রোলিং হয়নি ক্যামেরা। আড্ডা চলছে এলোমেলো। মধ্যমণি নাসরীন জাহান। একে একে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। কখনো হাসিমুখে তৎক্ষণাৎ, কখনো একটু চিন্তা করে। এমন সময় ফোন এলো। তিনি কথা বলেছেন। ইশারায় জানালেন, একটু। তারপর শুরু হলো কথা বলা। প্রথমেই তাপস রায়হানের কাছে জানতে চাইলেন কী প্রশ্ন করবা, কী বিষয়ে? সাধারণ কোনো প্রশ্ন যেন না হয়, হিহিহি। মাহতার হোসেন বললেন না না আপা, একদম আর্কাইভ করার মতো হবে। নাসরীন জাহান অবাক হয়ে বললেন ওমা! তাহলে তো মুশকিল। কখন, কী বলি! তাকে অভয় দেওয়া হলো। বলা হলো, কোনো সমস্যা নেই। অব দ্য রেকর্ড যদি কোনো কথা হয়, সেটি বাদ দেওয়া হবে। আপনার অনুমতি ছাড়া কোনো কথা ছাপা হবে না। তিনি নিশ্চিন্ত হলেন।
তাপস রায়হান : আপনি তো একসময় ময়মনসিংহে সরকারি বিদ্যাময়ী স্কুলে থাকতেই লেখালেখি শুরু করেছিলেন? নাকি আগেই! সেই পথচলাটা একটু বলবেন?
নাসরীন জাহান : আমি যুক্ত ছিলাম ‘চাঁদের হাট’র সঙ্গে। তখন আমি স্কুলে পড়ি। ক্লাস সিক্স থেকে টেন পর্যন্ত ছিলাম। এরপর অনেক ঘটনা রয়েছে। কথা প্রসঙ্গে বলা যাবে। ক্লাস ফোরে থাকতেই প্রথম ছড়া লিখি। তখন ঢাকায় ফুপুর বাসায় থেকে বটলমলি হোমস স্কুলে পড়তাম। এক বছর পড়েছি। আব্বা চাইতেন, আমি লেখালেখি করি। একটু একটু ছড়া লিখতে পারতাম। তখন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশু পত্রিকার প্রথম সংখ্যার জন্য দেশের সব স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে শিশুদের ছড়া চেয়ে চিঠি পাঠাল। একদিন এক শিক্ষক আমাকে বললেন তুমি তো লেখালেখি করো। আমি বললাম আমি তো কোনো গল্প লিখিনি। শুধু ছড়া লিখতে পারি। তখন আপা বললেন যে ছড়া লিখতে পারে, সে গল্পও লিখতে পারবে। এরপর আপার চাপাচাপিতে একটা গল্প লিখি। তারপর ক্লাস সিক্সে চলে এলাম ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুলে। ক্লাস নাইন কী টেনে থাকতে, দৈনিক বাংলার বড়দের সাহিত্য পাতায় গল্প ছাপা হয়। হেসে বললেন, কবি আহসান হাবীব জানতেন না, আমি স্কুলে পড়ি। অনেকেই অবাক হতেন, ভাবতেন স্কুলে পড়া একটি মেয়ে এরকম গল্প কীভাবে লেখে! তখন তো রবীন্দ্র, নজরুল, মানিক, বিভূতি পড়া শেষ। আসলে আমি ছিলাম ‘ইঁচড়ে পাকা’, হিহিহি। স্কুল শেষ করে আবার ঢাকায় এসে ইন্টারমিডিয়েটে শিফট হলাম, সেখানেও ঘটনা আছে। এর মাঝখানেও কথা আছে।
মাহতাব হোসেন : আপনার যখন প্রথম বই প্রকাশিত হলো, তখন প্রকাশকদের পক্ষ থেকে কোনো সমস্যা হয়নি? এখন তো একজন নতুন লেখকের বই প্রকাশে অনেক প্রতিবন্ধকতা? হয়তো অনেক প্রকাশক ঠিকমতো পা-ুলিপি পড়েনও না। আপনাদের সময় পরিবেশ কেমন ছিল?
নাসরীন জাহান : আমাদের সময় ঠিক এ রকম ছিল না। আমার প্রথম বই বের হয় ১৯৮৫ সালে। সেই উপন্যাসের নাম ছিল স্থবির যৌবন। তখন প্রায়ই দৈনিক বাংলায় লেখা ছাপা হতো। দৈনিক সংবাদ, ইত্তেফাকে লেখা ছাপা হতো। একটা পরিচয় গড়ে উঠেছে। অনেকেই বলতেন, মেয়েদের পাতায় লেখেন। আমি বলতাম, লেখাটা আগে পড়েন। এরপর বলেন। আপনি বিবেচনা করে যা বলবেন, তাই হবে। আমার ইচ্ছাই ছিল বিভিন্ন পত্রিকায় লিখে একটা পরিচিতি পাওয়ার পর বই প্রকাশ করব। পা-ুলিপি করে ফেললাম, আর বই হয়ে গেল বিষয়টা এরকম না। আর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে লিটল ম্যাগের বন্ধু-বান্ধবদের একটা বড় আড্ডা ছিল আমাদের। সেখানে যারা আসতেন, এখন সবাই পরিচিত। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের সাহিত্য বিষয়ে দুর্দান্ত পঠন-পাঠন ছিল। সব মিলিয়ে সাংঘাতিক একটা পরিবেশ। তখন বিকেল প্রকাশনী আমাকে বলে নাসরীন আপা, আপনি একটা পা-ুলিপি দেন? এটা ’৮৪ সালের কথা। তখন বলেছিলাম, একটু পড়ে দিই। এরপর ১০-১২টা গল্প বাছাই করে ৫-৬টা গল্প দিয়েই বই হয় ’৮৫ সালে। এভাবেই প্রকাশনার পথচলা। কেউ কেউ টাকা দিয়ে বই প্রকাশ করছে, এটা আমাদের সময়েও ছিল। সেটা আমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। আমি ধৈর্য ধরেছি। ভেবেছি, আগে পাঠকের কাছে পরিচিতি হোক, তারপর বই প্রকাশ করব। সবসময় কিন্তু আমি এটাই বলি। তাড়াহুড়ার কিছু নেই।
মাহতাব হোসেন : আপনার জন্যই প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক। ম্যাজিক রিয়ালিজমের যে বিষয়টা...। এটা আমাদের সাহিত্যিকদের মধ্যে কেমন দেখেন?
নাসরীন জাহান : এটা ছিল না। আসলে ম্যাজিক রিয়ালিজমের বিষয়টা তো এরকম না যে, তুমি সিসার ওপর দিয়ে উড়ছ! এরকম কিছু না। তোমার দেশের মাটি ও মানুষের কথা তুমি সেøাগানের মধ্য দিয়ে নিয়ে আসবে কেন? সেটা যেন খড়খড়ে মনে না হয়। সেটা তুমি তোমার দেশের মতো নিয়ে আসো। এটা শিল্পের মধ্য দিয়ে আনলেই হয়। আমি তো এ পর্যন্ত আমার বাংলা সাহিত্যের মধ্য দিয়েই যা করার করেছি। এ দেশের মানুষ, চরিত্র সবই তো এ দেশের। আমাদের মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্তরাই। এর আগে দেখেছি, আব্দুল মান্নান সৈয়দের মধ্যে এটা ছিল। অনেকেই বলে, নাসরীন তো লাতিন আমেরিকার সাহিত্যকে অনুসরণ করে। ও তো এ দেশের মাটি-মানুষ নিয়ে তেমন বলে না! এই আঘাতটা আমি আগে পাইনি। এখন সিনিয়র অনেক লেখক বলেন।
দীপংকর দীপক : আপনার লেখা উপন্যাস ‘চন্দ্রলেখার জাদুবিস্তার’-এর প্রেক্ষাপটটা একটু বলা যাবে?
নাসরীন জাহান : সেটা ওই শাসনের সময় লেখা। না পড়লে বোঝা যাবে না।
মাহতাব হোসেন : লেখালেখির ক্ষেত্রে লেখকের একটা প্রস্তুতি থাকে। যেমন বুদ্ধদেব বসু ভোরবেলায় লিখতেন। সৈয়দ শামসুল হক গোসল করে, হাত-মুখ ধুয়ে লিখতেন। এরকম অনেকের অভ্যাস রয়েছে। আপনার কী সেরকম কিছু আছে?
নাসরীন জাহান : না। তবে লেখা শুরুর আগে অনেকক্ষণ মাথার মধ্যে বিষয়টা খেলতে থাকে। সঙ্গে সঙ্গে কিছু নোট করি। টুকরো টুকরো এরকম অনেক কিছু। এভাবেই চলতে থাকে। দিন কেটে যায়। কিন্তু চরিত্রের চেহারাটা আসে না। সেই চেহারাটা নিয়ে আসার জন্য একটা নাম দরকার। কিন্তু শুরু করার পর, যেকোনো সময় লিখতে পারি। নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। এমনকি মধ্যরাতেও লিখতে পারি। অবশ্য লিখতে লিখতে কোথায় গিয়ে শেষ হবে, সেটার কোনো মিল থাকে না টুকে রাখার সঙ্গে।
মাহতাব হোসেন : আমরা জানি, সাহিত্যের সঙ্গে আড্ডার একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় উঠে আসে। একসময় ‘চিঠি’ ছিল, খুবই জনপ্রিয় বিষয়। এই চিঠির মধ্য দিয়ে আপনার সঙ্গে কোনো সাহিত্যিকের পরিচয় হয়েছে?
নাসরীন জাহান : আমার এক বান্ধবী ছিল। আমরা একেকটা ম্যাগাজিন থেকে লেখকের নাম সংগ্রহ করতাম। সেখানে অনেক জনপ্রিয় কবি-লেখক আছেন। তখন অনেকের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে পরিচয় হয়। সাংঘাতিক একটা বিষয় ছিল তখন। পুরো বাংলাদেশে যারা লেখালেখি করেন, তাদের সঙ্গে একটা যোগাযোগ হয়। ওরাও লিখত, আমরাও লিখতাম। একটা চিঠির জন্য যে ভীষণ অপেক্ষা! প্রতিদিন পিয়নের জন্য অপেক্ষা করতাম। সেখানে কিন্তু সবই সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা।
নিহার সরকার অংকুর : আপনার কী মনে হয়, চিঠির এই রসবোধ হারিয়ে যাচ্ছে?
নাসরীন জাহান : যাচ্ছে মানে! কবেবেবেবেবে... চলে গেছে! একসময় মনে হতো, ডাকপিয়ন যখন চিঠির জন্য ডাকতেন তার চেয়ে মধুর ডাক পৃথিবীতে আর নেই। ওদের ডাক শুনেই শিহরিত হতাম। এরপর চিঠি খোলা, পড়া আহা, সেই সময়! চিঠির রসবোধটা কবে হারিয়ে গেছে। আমি যখন বাংলাবাজার পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলাম, তখন এই এত্তো (হাত উঁচু করে দেখালেন) চিঠি আসত। কিন্তু কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। আসলে সেই সময়টাই নেই।
তাপস রায়হান : আপনি যখন ময়মনসিংহের বিদ্যাময়ী স্কুলে পড়তেন, তখন আপনাদের একটা বড় বান্ধবী গ্রুপ ছিল। বিশেষ করে কোহিনূর আপা, ইয়াসমিন আপা (তসলিমা নাসরিনের ছোট বোন), শুক্লা আপা, কৃষ্টি হাফেজ আপা তসলিমা আপা তো তখন থেকে নিয়মিত লিখছেন। আপনার সঙ্গে তসলিমা আপার কেমন সম্পর্ক ছিল?
নাসরীন জাহান : আসলে আমরা করতাম চাঁদের হাট। আর আপা করতেন ময়মনসিংহের সাহিত্য সংঘ। তারা চলতেন একভাবে। আর আপা তো ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন দিতেন। ফলে আমরা সেই পথে যাইনি। চাইতাম, তিনি তার মতো চলুক। আমরা এর মধ্যে নেই।
মাহতাব হোসেন : এ সময় যারা লেখালেখি করছেন, তাদের লেখার মান নিয়ে যদি কিছু বলতেন?
নাসরীন জাহান : এ বিষয়ে শুধু বলব, এখন মেয়েরা অনেক ভালো লিখছে। আমাদের সময় তো তেমন ছিল না। খুব কম লেখালেখি করত। এখন সেই পরিবেশ নেই। অনেক ভালো করছে মেয়েরা।
তাপস রায়হান : আমাদের সাহিত্যের মান নিয়ে কিছু বলুন? বিশেষ করে গদ্য?
নাসরীন জাহান : যারা এখনো বইকেন্দ্রিক, ফেসবুককেন্দ্রিক না তারা কিন্তু ভালো করছে। তাদের অনেক পড়াশোনা আছে। আমি ফেসবুকে অনেক দেরিতে এসেছি। সেখানেও কিন্তু সাহিত্যই করি। এখন তো আর বাক্য শেখার কিছু নেই।
দীপংকর দীপক : ফেসবুকে প্রায়ই আপনার কবিতা দেখি? কবিতা নিয়ে আপনার ভাবনা?
নাসরীন জাহান : আসলে আমার গদ্যের মধ্যেই কাব্য আছে। এর বাইরে কবিতা কী লিখব? অনেকেই লিখতে বলেন। আসলে ফেসবুকে যা লিখি, তা কবিতা না। সেগুলো আমার অনুভূতি। অনেকে বলেন, আপনি তো দারুণ কবিতা লেখেন? আমি বলি এগুলো কবিতা না। আমার অনুভূতি। তখন তারা বলেন, ওই একই কথা। একটা কথা বলি আমি আমার গদ্যকে মনে করি এটা আমার জীবনের অংশ। এ ছাড়া আমার জীবন নাই। কোনো দিনই আমি শিল্পকে শখের মাধ্যম মনে করিনি। কবিতাটা আমি শখ করে লিখি। এটা শখের মাধ্যম।
নিহার সরকার অংকুর : অনেকেই কিছু লিখলেই, নামের সঙ্গে যুক্ত করে কথাসাহিত্যিক। অনেকে আবার পুরস্কারও নিয়ে যাচ্ছে?
নাসরীন জাহান : এটা কেন হবে? যদিও এটা দীর্ঘসময় ধরে চলছে। এই বাড়াবাড়ি সবসময়ই ছিল। এটা নতুন কিছু না। একজন মানুষ মনে করে, কেউ তাকে দেখবে না। আসলে সবাই সবাইকে দেখে। একজন লেখক যদি এসব থেকে বেরই না হতে পারে, তার তো সাহিত্যিক হওয়ারই যোগ্যতা নেই। সাহিত্য যখন প্রকাশ করবেন, তখন তো ড. লেখারও দরকার নেই। কই, আনিসুজ্জামান লিখেছেন? তিনি তো শুধুই ‘আনিসুজ্জামান’ লিখতেন। আসলে সাহিত্যের জন্য নিবেদিত হতে হয়। আমি যদি কোনো লোভই সামলাতে না পারলাম, তাহলে আর কী হলো!
মাহতাব হোসেন : আপনার লেখা নিয়ে একসময় নিয়মিত নাটক হতো। এর মধ্যে একটা ধারাবাহিক নাটক ছিল ‘দূরের বাতিঘর’।
নাসরীন জাহান : হ্যাঁ। ওটা ২৪ পর্ব পর্যন্ত হয়েছিল। তখন অনুষ্ঠানে খালেদ খান (যুবদা) ছিলেন, একুশে টিভিতে। তখন ওরা অফার করল। আমি তো কোনো দিন নাটক লিখিনি। আমাকে যুবদা বললেন তুমি পারবা। লিখে ফেলো? আমি বললাম, কত পর্ব? তিনি বললেন ১০০! তখন আমি বললাম, এত! তিনি বললেন : ২ লাখ টাকা দেওয়া হবে? আমি বললাম বাবা, সে তো অনেক টাকা। ওটাই কিন্তু আমার প্রথম কাজ। একদিন চলচ্চিত্রকার আবু সাঈদ বলল আরে, আপনি পারবেন। শুরু করেন। একসময় শুরু হলো। কিন্তু নাট্যরূপ দিতে গিয়ে দেখি, আরে এ তো মহাসর্বনাশের পথে পা দিয়েছি! আমার উপন্যাসের সঙ্গে কোনো মিল থাকছে না। আমার উপন্যাস শুরুর আগেই সারেন্ডার করেছি। বলেছি, আপনি অর্ধেক টাকা নিয়ে যান। আমাকে মাফ করেন। পারব না। এটা আমার কাজ না।
মাহতাব হোসেন : তাহলে কি নাটক অসমাপ্ত ছিল?
নাসরীন জাহান : না, এটা পরে বন্ধ হয়ে যায়। ২৫ পর্ব পর্যন্ত প্রচারিত হয়েছিল। এরপর মঞ্চনাটক লিখেছি। ওটা নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় মঞ্চায়ন করেছিল। নাটকটার নাম ছিল স্বপ্নবাজ। আরেকটা হয়েছিল রূপবতী। সেটা সুবচন করেছিল। যুব দা কিন্তু আমার লেখা নাটক দারুণ আনতে পারতেন। এ তো তৎসম শব্দ। সেগুলোকে যেভাবে বলতেন, দারুণ। এভাবে তিনটা মঞ্চনাটক লিখেছি।
তাপস রায়হান : আপনি মঞ্চ, টিভিতে নাটক লিখেছেন। চলচ্চিত্রে কাহিনি লিখছেন না কেন?
নাসরীন জাহান : কীভাবে লিখব? আমাদের সময়টা একবার ভাব, পরিবেশ কেমন ছিল! যখন স্ক্রিপ্ট লিখছি, তখন এই দেশে রুচিসম্মত সিনেমা সেই অর্থে হত না। ফলে কেউ স্ক্রিপ্ট চায়ওনি।
তাপস রায়হান : আপনি ফিলিপস, আলাউল, বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন। এ করণে লেখালেখিতে কোনো প্রভাব পড়েছে?
নাসরীন জাহান : আমি সমগ্র সাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলাম। এটা আমার বয়সী এর আগে কেউ পায়নি। এখনো মনে হয়নি, এ কারণে কোনো সমস্যা হয়েছে। সেটা অনেকের লেখায় প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে পড়েনি।
মাহতাব হোসেন : আপনার কবিতায় প্রায়ই হেমন্তকাল নিয়ে কথা থাকে। এই সময়টা আপনাকে কীভাবে আলোড়িত করে?
নাসরীন জাহান : এটা আসলে আমি অনুভব করি। কিন্তু কোনো দিন লিখিনি। একবার ভেবেছিলাম গল্প লিখব। এরপর ভাবলাম না, এখন কবিতাটাই লিখে ফেলি। হেমন্তের একটা আলাদা ঘ্রাণ আছে। আমার স্নায়ুর মধ্যে ঠিক টের পাই। সেই গন্ধ আমি পাই। ভোরবেলা যখন ঘুম থেকে ওঠি, তখন ফেরিওয়ালারা আওয়াজ করে রাস্তা দিয়ে যায় ঠিক সেই মুহূর্তটা, কেমন যেন একটা অনুভূতি হয়। শীত আসছে, গরমের বিদায় হচ্ছে। সময়টাই নস্টালজিক। অনেক স্মৃতি মনে পড়ে যায়। সেই ব্রহ্মপুত্র নদ, কাশফুল বছরের আর কোনো সময় কিন্তু এই অনুভূতি হয় না। কখনো মনে হয়, মা-বাবার সঙ্গে শুয়ে আছি ।
তাপস রায়হান : কেউ যদি বলে, তোমাকে আবার শৈশব, কৈশোর, যৌবনে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তুমি কি যাবে সেই সময়ে!
নাসরীন জাহান : না, যাব না। আমি তো সেই সময় পার হয়ে এসেছি। আমার মতো করে উপলব্ধি করেছি। আনন্দের সঙ্গে অনেক উন্মাদনা ছিল। শৈশব, কৈশোর, যৌবনের অনেক আনন্দ, যন্ত্রণা, পীড়ন মিলিয়ে একটা অসহ্য বোধও ছিল। কিন্তু এখন তো সেই বয়স নেই। অনেক বন্ধনে আটকে গেছি। আমি জানি, গেলে আবার এই পথেই আসতে হবে। তাই, আর না। কোথায় আসতে হবে, সেটা তো দেখে ফেলেছি। আবার রিপিট করার দরকার নেই।
নিহার সরকার অংকুর : চলচ্চিত্রে একটা ধারা আছে। বাণিজ্যিক ধারা, বিকল্পধারা। কিন্তু লেখকদের মধ্যেও এখন বলা হচ্ছে নতুনধারা। এ সম্পর্কে যদি একটু বলেন?
নাসরীন জাহান : মুক্তিযুদ্ধের পর একটা ধারা ছিল। আসলে আশির দশকে যখন আমরা লিখতে শুরু করি, তখনই আসলে ছিল নিরীক্ষা। এখন কেউ যদি বলে, আশির দশকের চেয়েও নতুন ধারা, তাহলে দুটোকে পাশে ফেলে পড়তে হবে। সে সময়ের চেয়ে এখন কী নতুন রয়েছে, তা তো জানি না। আমি পাইনি। আমি বারবার বলি পঠন, পঠন, পঠন। কোনো বিকল্প নেই। লিখতে হলে ধৈর্য নিয়ে ভালো বই পড়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কোনো পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।
নিহার সরকার অংকুর : ময়মনসিংহে এখন যারা জীবিত, তাদের মধ্যে গর্ব করার মত জীবিত কোনো লেখক আছেন?
নাসরীন জাহান : যতীন সরকার। এটা কিন্তু অহংকারের। আমাদের একজন যতীন সরকার রয়েছে। বিশাল বিষয়।
তাপস রায়হান : আপনি একজন সাহিত্যিক এই মুহূর্তে ভুলে যান। এবার বলুন, মানুষের সবচেয়ে বড় অর্জন কী?
নাসরীন জাহান : তুমি যাই হও, তোমাকে একজন মানুষ হিসেবে ‘মানবিক’ হতেই হবে।
তাপস রায়হান : সাপ্তাহিক ‘অন্যদিন' এর সাহিত্য সম্পাদক দীর্ঘদিন ধরে? নিয়মিত যেতে হয়?
নাসরীন জাহান : আরে নাহ!
তাপস রায়হান : পরিবার নিয়ে কিছু জানা হলো না?
নাসরীন জাহান : আমার আসলে বিরাট ভাগ্য। আব্বা প্রায়ই সম্পত্তি বিক্রি করে এদিক-ওদিক চলে যেতেন। ফলে আমরা নিদারুণ কষ্টের মধ্যে বড় হয়েছি। মা ছিলেন ভীষণ উদার। এটা আমার একটা বিরাট প্রাপ্তি। দুজনই এ বছর আগে-পরে চলে যান। এটা নিয়ে আমি কিছু বলতে পারি না। ভীষণ কষ্ট হয়। স্বামী কবি আশরাফ আহমেদ আর মেয়ে অর্চি অতন্দ্রিলা তো আছেই। এই তো চলছে...।
গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ