ফুটবল মাঠে গণহত্যার সংস্কৃতি আনা ইসরায়েলি হুলিগান

আপডেট : ১৩ নভেম্বর ২০২৪, ০২:৪৩ এএম

মানব ইতিহাসে নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর দ্বারা সংঘটিত গণহত্যার উদাহরণ কম নয়, বরং বলা ভালো যে অসংখ্য। তবে গাজায় যে গণহত্যা চলছে, তা আমাদের চোখের সামনে এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের গতির কারণে তার গুরুত্ব অন্যদের থেকে আলাদা। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ অবরুদ্ধ গাজায় যা ঘটছে তার লাইভ ও সেন্সরবিহীন দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন। ভুক্তভোগী ও আক্রমণকারী উভয়েই নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

আমরা তো ধ্বংস ও হত্যার দানবীয় যজ্ঞ প্রত্যক্ষ করছি। তো এখন এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, ইসরায়েলি সমাজে এই ‘গণহত্যার সংস্কৃতি’র বিকাশ কীভাবে ঘটছে, তা-ও যেন একটু খতিয়ে দেখি। এর সাম্প্রতিকতম উদাহরণ লক্ষ করা গেছে গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন ইসরায়েলি ফুটবল সমর্থকরা (হুলিগান), যারা মাকাবি তেল আবিব ক্লাবের সমর্থক তারা আমস্টারডামের ডাচ যুবকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তারা আরববিরোধী সেøাগান দেয়, ফিলিস্তিনি পতাকা ছিঁড়ে ফেলে এবং স্পেনের বন্যার শিকারদের জন্য নির্ধারিত এক মিনিট নীরবতা পালনের আহ্বানকে উপেক্ষা করে।

এই ইসরায়েলি সমর্থকদের মাথায় একবারের জন্যও আসেনি যে, বিদেশের মাটিতে বর্ণবাদী স্লোগান দেওয়া এবং কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভাঙচুর অগ্রহণযোগ্য আচরণ, এটা স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ উসকে দিতে পারে। আসলে গত ৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরায়েলি সমাজে গণহত্যার যে সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে, এই সব সমর্থকের মানসিকতায় তারই আঁচ লেগেছে। এই সংস্কৃতি তাদের এমন বোধের জন্ম দিয়েছে যে, ইসরায়েলিরা আইন ও নৈতিকতার ঊর্ধ্বে এবং তা কেবল ইসরায়েলের ভেতরেই নয়, বরং সারা বিশ্বে।

মাকাবি সমর্থকদের সহিংস সেøাগানকে একটি সমাজের প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। সেই সমাজ, যা গাজার ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের গণহত্যার যুদ্ধকে অব্যাহত ন্যায্যতা দিয়ে যাচ্ছে।

সহিংসতা বৃদ্ধি

এই সমর্থকদের উগ্রতা মূলত একটি সাংস্কৃতিক প্রতিফলন এবং এটি কেবল গুটিকয় বর্ণবাদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমস্টারডামে ইসরায়েলি সমর্থকদের আচরণেও নতুন কিছু ছিল না। বরং স্টেডিয়ামগুলোতে এই ঘটনা নিয়মিত হয়ে উঠেছে এবং ‘আরবদের মৃত্যু হোক’ বা ‘তোমার গ্রাম পুড়ুক’ এমনসব স্লোগান শোনা যাচ্ছে, যেগুলো গত বছর ৭ অক্টোবরের বহু আগে থেকেই ইসরায়েলে শোনা যাচ্ছিল।

নিউ ইসরায়েল ফান্ডের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩/২৪ মৌসুমে ফুটবল স্টেডিয়ামে সহিংসতার প্রকাশ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। অঙ্কের হিসাবে তা গত বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। গত এক দশকের মধ্যে এই সহিংসতা ও বর্ণবাদী আচরণের মাত্রা এখন সর্বোচ্চ। এখানে আসল কথা হলো, উদ্বেগের বিষয় এই বর্ণবাদী স্লোগান নয়, বরং ইসরায়েলি সমর্থকদের এই উপলব্ধির অভাব যে, তাদের দেশের সীমানার বাইরে এমন আচরণ সহ্য করা হয় না।

এই ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ইসরায়েলে সাংস্কৃতিক রীতিনীতি ও আচরণবিধি গণহত্যাকে প্রচার ও উৎসাহিত করতে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে সমালোচনাও খুব একটা দেখা যায় না। এমনকি ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা এবং গাজায় সাধারণ মানুষের দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির প্রতিও ব্যাপক সমর্থন দেখা গেছে। গত মাসে আলজাজিরা একটি তথ্যচিত্র প্রকাশ করেছে, যেখানে গাজায় ইসরায়েলি সৈন্যদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা যুদ্ধাপরাধের চিত্রগুলো তুলে ধরা হয়।

বিশ্বের অনেকেই এসব দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত। অথচ ইসরায়েলি সমাজ সৈন্যদের কর্মকাণ্ড সমর্থন করেছে এবং সমালোচকদের আক্রমণও করেছে। তাদের মতে, সমালোচকরা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। হ্যাঁ, ইসরায়েলি সমাজে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকট। তারা একটা প্যাঁচে আটকে আছে, ফলে যুক্তির মধ্যকার এসব ত্রুটি তাদের পক্ষে বোঝা কঠিন।

এখানে পৌঁছানোর পটভূমি বুঝতে হলে ওই জাতির গণহত্যার সংস্কৃতির দিকে নজর দিতে হবে। এমন এক বিশ্বাস, নৈতিকতা ও রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যা সৈন্যদের কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ জানায়, ন্যায্যতা দেয়, এমনকি উদযাপন করে।

গত এক বছরে আমরা গান, কমেডি পারফরম্যান্স, সাংবাদিকতা, সম্প্রচার এবং সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে গণহত্যার প্রচার দেখেছি, এমনকি শিশুদের হত্যার মতো কাজগুলোকেও তুলে ধরা হয়েছে। ইসরায়েলি বিশ্লেষকরা খোলাখুলিভাবে হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন, কিছু ব্যক্তি দাবি করেছেন যে, সেনাবাহিনীর আরও বেশি মানুষ হত্যা করা উচিত বা গাজায় সব মানবিক সাহায্য বন্ধ করা উচিত। এ ধরনের মন্তব্যের নিন্দা করার পরিবর্তে, শিক্ষাবিদ ও ভাষ্যকাররা কীভাবে একটি জনগোষ্ঠীকে অনাহারে রাখা যেতে পারে, তা নিয়ে যুক্তি প্রদান করেছেন।

তাই, গাজা থেকে আসা ভয়াবহ দৃশ্যগুলোর পাশাপাশি ইসরায়েলি সমাজের অভ্যন্তরে কাজ করা প্রক্রিয়াগুলো পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমরা একটি সমষ্টিগত মানসিক বৈকল্যের সাক্ষী হচ্ছি, যেখানে অনেকেই অন্যদের দুর্দশার প্রতি সহানুভূতি বা মমত্ববোধ অনুভব না করে বরং গণহত্যাকারীদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করছে।

জবাবদিহির অভাব

আরও খারাপ ব্যাপার হচ্ছে, এই ঘটনা জনসাধারণের মধ্যকার প্রায় সব পরিসরে বিদ্যমান। তেল আবিবের সৈকতে লাইফগার্ডরা প্রকাশ্যে হামাস ও হিজবুল্লাহ নেতাদের মৃত্যুর ঘটনা উদযাপন করেছে, সাধারণ জনতা তালি দিয়েছে এবং ‘টোস্ট’ বলে গ্লাসে গ্লাস ঠুকে উৎসব করেছে। অনেক বাসিন্দা এ উপলক্ষে বাকলাভা বিতরণ করেছে। এই সমস্ত এমন এক সমাজে ঘটছে, যেখানে অনেক বেসামরিক মানুষই নিয়মিত অস্ত্র বহন করে।

বোঝা যায়, ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেতারা জনসাধারণের মানসিকতার ভিত্তি তৈরি করার জন্য দায়ী। তারাই এই গণহত্যার সংস্কৃতির ভিত্তি স্থাপন করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গত প্রায় এক শতাব্দী ধরে ইসরায়েলকে বিনা বাধায় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করতে দিয়েছে, যার কোনো জবাবদিহি নেই। উপরন্তু বিশ্বের পক্ষ থেকে ইসরায়েলকে তার দমনমূলক ব্যবস্থার উদ্ভাবনের জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছে। দখলদারির মধ্যেই ইসরায়েলের অস্ত্রশিল্প সমৃদ্ধ হয়েছে, নিয়মিত যে অস্ত্র পরীক্ষার গিনিপিগ হয় ফিলিস্তিনিরা।

ইসরায়েলি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিকাশ লাভ করেছে ফিলিস্তিনিদের দমনের উপায়গুলোর ওপর গবেষণা এবং অবকাঠামো সরবরাহ করার মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকে সমর্থন করেছে। ফলে ইসরায়েলি সমাজ ধীরে ধীরে নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে মনে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তারা জানে, যত অপরাধই করুক, বিশ্বের সমর্থন তার পাশে রয়েছে। এই মনোভাবই ইসরায়েলের গণহত্যার সংস্কৃতির বিকাশে সহায়ক।

ট্রাম্পের প্রবেশ

ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার হোয়াইট হাউজে প্রবেশের পর এই সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে বলাই যায়। ট্রাম্প নিশ্চয়ই ইসরায়েলের যুদ্ধযন্ত্রকে অব্যাহত সমর্থন দেবেন। তাতে এই গণহত্যার সংস্কৃতি আরও ত্বরান্বিত হবে।

ইসরায়েলের মেসিয়ানিক ডানপন্থিদের ট্রাম্পের জয় উদযাপন যেন থামছেই না এটা কেবল ভবিষ্যৎ সামরিক বা কূটনৈতিক সহায়তার কারণে নয়, বরং ট্রাম্পের মতো একজন প্রেসিডেন্টের অধীনে নিশ্চয়ই আশা করা যায় যে, তিনি গাজার ফিলিস্তিনিদের ক্ষুধার্ত রাখার মেয়াদ বাড়িয়ে দেবেন এবং ইসরায়েলের সব অগণতান্ত্রিক আইনকে উপেক্ষা করবেন। ফিলিস্তিনি জনগণকে ক্ষতিগ্রস্ত করার কোনো পথই তিনি বন্ধ করবেন না।

এর মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-কে নিষিদ্ধ করা; ফিলিস্তিনি পরিবারের সদস্যদের দেশ থেকে বহিষ্কার করা, যাদের আত্মীয়রা ইসরায়েলের নিরাপত্তা লঙ্ঘন করেছে; এবং আরব রাজনীতিবিদরা যদি এমন বিবৃতি দেয় যা সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন করে বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, তাহলে তাদের নির্বাচিত পদে আসীন হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা।

এই যুদ্ধ একদিন শেষ হবে। তবে যতদিন ইসরায়েলের আচরণের মৌলিক সমালোচনা হবে না, ততদিনে এই গণহত্যার সংস্কৃতি এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চালানো ধ্বংসের সংস্কৃতি নিশ্চয় বুমেরাং হয়ে উঠবে। সেদিন ইসরায়েলিদের সুদে-আসলে তার মূল্য চুকাতে হবে।

মিডলইস্ট আই থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক

লেখক:  জাফাবাসী রাজনৈতিক কর্মী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত