ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান

আন্দোলনে গুলি-গ্রেনেড ছুড়তে নির্দেশকারী ১১০ ঊর্ধ্বতন পুলিশ চিহ্নিত

  • আন্দোলনে গুলি-গ্রেনেড-টিয়ারশেল নিক্ষেপকারী ১৭১৭ জন পুলিশকে চিহ্নিত 
  • নির্দেশকারী ১১০ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকেই লাপাত্তা, রয়েছেন লুকিয়ে
আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২৪, ১১:২৩ এএম

জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে নজিরবিহীন তাণ্ডব চালিয়েছে পুলিশ। গুলি করে হত্যা করা হয়েছে সাধারণ ছাত্র ও নিরীহ লোকজনকে। যেসব পুলিশ সদস্য গুলি চালানো, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও ক্ল্যাশ গ্রেনেড ছুড়েছেন তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন পর্যন্ত আন্দোলনে গুলি-গ্রেনেড-টিয়ারশেল নিক্ষেপকারী এক হাজার ৭১৭ জন পুলিশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্দেশদাতা হিসেবে ১১০ জন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, আন্দোলন চলাকালে ছাত্র-জনতাকে দমাতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের যেসব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নির্দেশ দিয়েছিলেন তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের হয়রানি, সমন্বয়কদের হেফাজতে নিয়ে নির্যাতনসহ নির্বিচারে গুলি করে শত শত ছাত্র-জনতা হত্যার নির্দেশদাতা বিতর্কিত ওইসব কর্মকর্তাদের অনেকে লাপাত্তা। তাদের অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নানা ধরনের কথাবার্তা, ছবি পাওয়া যায়।

নির্দেশদাতা কর্মকর্তাদের মধ্যে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মো. মনিরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, সিআইডির (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আব্দুল বাতেন, কৃষ্ণপদ রায়, খন্দকার লুৎফুল কবির ও মীর রেজাউল আলম, ডিএমপির গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সাবেক প্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার, অতিরিক্ত ডিআইজি প্রলয় কুমার জোয়ারদার, ঢাকা রেঞ্জের সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র, মো. আসাদুজ্জামান, মো. মনিরুজ্জামান, মো. মোজাম্মেল হক, সরদার রকিবুল ইসলাম ও মো. ইমাম হোসেন, অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফিসহ অনেকের নাম আছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ প্রবিধানের ১৫৩ ধারায় বলা আছে তিন ক্ষেত্রে পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে ব্যক্তির আত্মরক্ষা ও সম্পদ রক্ষার অধিকার প্রয়োগ, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করা ও গ্রেপ্তার কার্যকর করার জন্য। তাছাড়া দণ্ডবিধির ১০২ ধারায়  বলা হয়েছে যখনই ক্ষতির আশঙ্কা শেষ হবে, তখন আত্মরক্ষার জন্য শক্তিপ্রয়োগের অধিকারও শেষ হবে। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজনের ওপর গুলিবর্ষণের ক্ষেত্রে এসব ধারা মানেননি পুলিশ সদস্যরা। আর এ কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বেশি।

পুলিশ সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের সব ইউনিট আলাদাভাবে পুলিশের কর্মকান্ড নিয়ে তদন্ত করেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশ কী ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, কত সংখ্যক গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করেছে সে তথ্য বের করেছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে পুলিশের কোন কোন সদস্য অ্যাকশনে ছিল তাদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কারা নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিষয়েও তথ্য উদঘাটন করেছে।

সূত্রের মতে, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭১৭ জন পুলিশ সদস্য অস্বাভাবিক বলপ্রয়োগে জড়িত থাকার তথ্য অনেকটা নিশ্চিত করা গেছে। ভিডিও ফুটেজ, টিভি চ্যানেল ও পত্রপত্রিকায় আসা ছবি দেখে তাদের মধ্যে অনেককে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার ইউনিটের দায়িত্ব পালনের সূচি থেকেও মাঠ পর্যায়ে কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম জানা গেছে।

সূত্র জানায়, আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় সম্পৃক্তদের মধ্যে অতিরিক্ত কমিশনার, উপকমিশনার, সহকারী কমিশনার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), পরিদর্শক, উপপরিদর্শক, সহকারী উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলরা আছেন।

পুলিশের ওই সূত্রটি জানিয়েছে, আন্দোলনকারীদের রুখতে মাঠে ১৪৭৯টি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে। এছাড়া ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ১৪ হাজার ২২৩ রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এই আন্দোলনেই পুলিশ প্রথমবারের মতো ক্ল্যাশ গ্রেনেড (ভিড় ও দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র) ব্যবহার করেছে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে এই গ্রেনেডটি ব্যবহার করা হয়েছে ২৭৪টি।

সূত্রটির তথ্যমতে, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সারা দেশে ৫৭ হাজার ৬১৩ রাউন্ড বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের গুলি ব্যবহার করা হয়েছে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত