এতদিন আড়ালে রাখা হয়েছিল ব্যাংকগুলো থেকে বিভিন্ন লুটেরা গোষ্ঠীর লুটপাটের তথ্য। ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া নামে- বেনামে বিপুল ঋণ অনেক আগেই খেলাপি হয়ে গেছিল। কিন্তু অবলোপন, পুনঃ-পুনঃতফসিলের মাধ্যমে এসব ঋণকে নিয়মিত হিসেবে দেখানো হচ্ছিল। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসতে শুরু করে লুটপাটের প্রকৃত চিত্র। গত তিন মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ১৬ দশমিক ৯৩ শতাংশ। গতকাল রবিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হালনাগাদ বিবরণী থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর কোনো ঋণ বা ঋণের কিস্তি ফেরত না পেলে তা খেলাপি হয়ে যায়। দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এ সমস্যা পুঞ্জীভূত হয়ে বর্তমানে প্রকট আকার ধারণ করেছে। দুঃখজনক হলো, বিভিন্ন সময় খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ নানা অঙ্গীকার করলেও তা রক্ষা করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণ বেপরোয়া গতিতে বেড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ নিয়ে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। গত জুনে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। সে হিসাবে, গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ১১১ কোটি ৫২ লাখ টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া ৩০ সেপ্টেম্বর বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ। একই সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৮১৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্থিক খাতে সুশাসন না থাকায় বড় বড় জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ফলে বিতরণ করা ঋণের প্রায় সবই খেলাপি হয়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবেই মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। ২০০৯ সালের শুরু থেকে জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। আওয়ামী সরকারের আমলে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে খেলাপি ঋণের চিত্র পাওয়া গেছে। দেশে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়ংকর। অনেকে ঋণখেলাপি হওয়ার যোগ্য হলেও তাদের খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আবদুল আউয়াল সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব গাইডলাইন দেওয়া আছে, সেসব আন্তরিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলেই আদায় করা সম্ভব। গভর্নর কিছুদিন আগে অ্যাসেট অ্যাকুইজিশনের (সম্পদ অধিগ্রহণ) কথা বলেছিলেন। খেলাপিদের যাদের সম্পদ আছে, তা বিক্রি করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। এটা করতে পারলে খেলাপি ঋণের একটা বড় অংশ আদায় করা সম্ভব হবে। তারল্য আবারও স্বাভাবিক হবে।’
তিনি বলেন, ‘এখন তো খেলাপি ঋণের বড় অংশ শরিয়াহ ব্যাংকগুলোতে। অথচ শরিয়াহ ব্যাংকগুলোতে খেলাপির বিষয়ে আরও কঠোর পলিসি আছে। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী যদি কেউ ইচ্ছাকৃত খেলাপি হয়, তবে প্রথম পদক্ষেপেই তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। তাকে আটক রেখে খেলাপি আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হবে। এসবের আমরা কখনো বাস্তবায়ন দেখিনি। আমাদের দেশে একটা দেউলিয়া আইন আছে, সেটাও সাধারণত বাস্তবায়ন হয় না। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রিটের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ হ্যাংক করে রাখা। রিটের ব্যাপারে যদি একটা সুরাহা করা যায়, যদি ৩০-৪০ শতাংশ খেলাপি আদায় করার পরে রিটের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে রিটের হার কমে যাবে। খেলাপি আদায় বাড়বে।’
গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্স ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘কৌশলে লুকিয়ে রাখা গোপন তথ্য বেরিয়ে আসছে। এ কারণে খেলাপি বাড়ছে। এসব ঋণ তারা আগে নিয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোতে বহু দুর্নীতি হয়েছে। সেসব দুর্নীতি বেরিয়ে আসছে। সত্য বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে এটা আমাদের জন্য পজিটিভ। বারবার পুনঃতফসিলের নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যারা পাচার করেছে তাদের টাকা ফিরিয়ে আনতে হবে। সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। জনগণের টাকা জনগণকে ফিরিয়ে দিলে ব্যাংকের ওপর আস্থা ফিরবে।’
