হিলি স্থলবন্দরে আমদানি হচ্ছে না কাঙ্ক্ষিত পণ্য, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৩ পিএম

ব্যাপক সম্ভাবনা থাকার পরেও দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে পণ্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। কাস্টমসের দ্বিমুখি আচরণ ও নানা ধরনের হয়রানির কারণেই এই বন্দর দিয়ে ফলসহ অধিক শুল্ক যুক্ত পণ্য আমদানি দিন দিন কমছে বলে দাবি বন্দরের আমদানিকারকদের। বৈষম্য নিরসন করে সকল বন্দরকে একই নীয়ম নীতির মাধ্যমে পরিচালনা করা হলে আমদানি বাড়বে দাবি আমদানিকারকদের। এ দিকে অভিযোগ অস্বীকার করে বিধি অনুযায়ী পণ্য আমদানি করলে সহযোগিতার কথা জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। 

উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের বিশাল সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে ১৯৮৬ সালে হিলি স্থলবন্দরের যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে সরকার হিলিকে পুর্নাঙ্গ শুল্ক স্টেশন হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে পুর্নাঙ্গ স্থলবন্দর ঘোষণা করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ছেড়ে দেয় সরকার। এই বন্দরের সাথে ভারতের সড়কপথে ও রেলপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় ভারত থেকে আমদানিকৃত পণ্য সহজে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পৌঁছানোসহ ভোক্তারা কম দামে কিনতে পারেন। যার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানের আমদানিকারকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে হিলি স্থলবন্দর। পুর্বে এই বন্দর দিয়ে ফল, পার্টস,পাথরসহ সবধরনের পণ্য আমদানি হলেও এখন হাতে গোনা কয়েকটি পণ্য পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, আলু, জিরা, খৈল, ভুষি ও চাল আমদানি নিয়ে চলছে বন্দরের আমদানি বাণিজ্য। কাস্টমসের উদাসীনতা ও ফল আমদানিতে চাকার বার নির্ধারণ করায় মুখ থুবড়ে পড়েছে এসব পণ্যের আমদানি। 

হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক আবু তোরাব বলেন, বর্তমানে বন্দর দিয়ে যেসব পণ্য আমদানি হচ্ছে তাতে করে আমরা আমদানিকারকরা খুশি নয়। এর কারণ হলো বর্তমানে শুধুমাত্র বন্দর দিয়ে খৈল, ভুষি, ভুট্টা, পেঁয়াজ, আলু  ও চাল এই ধরনের কিছু খাদ্যদ্রব্য জাতীয় পণ্য আমদানি হচ্ছে। কিন্তু বন্দর দিয়ে পুর্বে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের ফল সাইকেল পার্টস স্টিল বিভিন্ন ধরনের অধিক শুল্ক যুক্ত পণ্য আমদানি হতো। যার কারণে এই বন্দরে শ্রমিক থেকে শুরু করে সিআ্যন্ডএফ এজেন্টরা উপকৃত হতো সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়তো সবমিলিয়ে পুরো বন্দরে একটা কর্মচাঞ্চ্যলতা ছিল। কিন্তু এখন বন্দর দিয়ে সেসব পণ্যের আমদানি একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে এর কারণ হলো কাস্টমসের কিছু জটিলতা রয়েছে। একই পণ্য অন্য বন্দর দিয়ে আমদানি হলেও হিলি স্থলবন্দরের ক্ষেত্রে আমদানিকৃত পণ্য পরীক্ষণ শুল্কায়নের নামে হয়রানি কালক্ষেপণ করা বাড়তি মূল্যে শুল্কায়ন করা এসব নানা কারণে পণ্য আমদানি হচ্ছে না। মূলত কাস্টমসের অসহযোগিতার কারণেই বন্দর দিয়ে অধিক শুল্ক যুক্ত পণ্য আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। যদি কাস্টমস সহযোগিতা করে তাহলে বন্দর দিয়ে আবারো ফলসহ অধিক শুল্ক যুক্ত পণ্য আমদানি শুরু হবে যাতে করে সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়বে।  

হিলি স্থলবন্দরের আমদানিকারক শহিদুল ইসলাম বলেন, হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরা এখনো বৈষম্যের শিকার হয়ে আছি। এর কারণ হলো বেনাপোল স্থলবন্দর, ভোমরা স্থলবন্দর ও হিলি স্থলবন্দর বাংলাদেশের মধ্যে। কিন্তু হিলি স্থলবন্দর দিয়ে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্য আমদানি হয়। এখানে কিছু কিছু কাস্টমস কর্মকর্তা একেবারে অদক্ষ যারা অন্য বন্দরে কাজ করতে পারে না তাদেরকে এই বন্দরে দেওয়া হয়। এরা এখানে এসে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে চাকার বার দেয় যে ফল তিন টন আমদানি করা যাবে না, আদা আমদানি করা যাবে না। আজকে বেনাপোল বা ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে প্রচুর পরিমাণে ফল আমদানি হচ্ছে কিন্তু হিলি স্থলবন্দর দিয়ে কেন আমদানি হবে না। আমার ৩টন ফল আমদানির জন্য এলসির টাকা রয়েছে আমি তো চাইলেই ১২ চাকার ট্রাকে সেই ফল আমদানি করতে পারবো না। আমি কি সেই পণ্য ৪ চাকার ছোট ট্রাকে আমদানি করতে পারবো না কেন আমাকে স্লাব অনুযায়ি পণ্য আমদানি করতে হবে। এখানে কাস্টমসের কর্মকর্তারা রয়েছে তারা চেক করুক কতটুকু পণ্য আমদানি করেছি সেই মোতাবেক শুল্ক নিয়ে ছেড়ে দিক। কিন্তু তারা কি বলছে ফল ঢোকানো যাবে না অন্যান্য অধিক শুল্ক যুক্ত পণ্য আমদানি করা যাবে না কেন। এই বন্দরটিকে ধীরে ধীরে নিশ্বেসের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র এই কাস্টমসের কারণেই। উত্তর বঙ্গের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশাল সম্ভাবনাময় এই হিলি স্থলবন্দর। তাই আমরা সরকারের নিকট অনুরোধ করবো বৈষম্য দূর করে এই বন্দর টিকে সচল করার ব্যবস্থা করুন। আর যদি এই বন্দর দিয়ে সবধরনের পণ্য আমদানি হত তাহলে পরিবহন খরচ কম হতো উত্তরবঙ্গের মানুষ কম দামে খেতে পারতো। সেই সাথে সরকারের রাজস্ব আয় অনেক বেড়ে যেত।

বাংলাহিলি কাস্টমস সিআ্যন্ডএফ এজেন্ট আ্যসোসিয়েশনের সভাপতি ফেরদৌস রহমান বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর আমরা চাই হিলি স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পূর্বের ন্যায় সচল থাক সেজন্য আমরা সর্বাত্নকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি বিগত দিনে এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেতে যে বৈষম্যের শিকার ছিলাম বিশেষ করে আমাদের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে আমরা বৈষম্যের শিকার হওয়ার জন্যই হিলি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য প্রসার ঘটছে না। সেই সাথে সরকারের রাজস্ব আয়ে বাধা সৃষ্টি করে আসছিলো। এই কারণে আমরা সার্বিকভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি আগামীতে হিলি স্থলবন্দর দিয়ে সবধরনের পণ্য আমদানি-রপ্তানি হবে সেই সাথে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।  

হিলি স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান পানামা হিলি পোর্ট লিংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী এসএম জোবায়ের বলেন, শুরু থেকেই কিন্তু হিলি স্থলবন্দর উত্তরাঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছিল। যার কারণে পূর্বে বন্দর দিয়ে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক বিভিন্ন পণ্য ভারত থেকে আমদানি হলেও তা কমে ৫০ থেকে ৬০ ট্রাকে নেমেছে। বর্তমানে সেই সংখ্যা একটু বেড়েছে তবে সেটা ১শ’ এর মধ্যে উঠানামা করছে। এছাড়া পূর্বে বন্দরে সাড়ে ৭শ’ থেকে ৯শ’ ট্রাক পণ্য লোড আনলোড হচ্ছিল। পূর্বে বন্দর দিয়ে ফল পাথর পার্টসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি হলেও বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি পণ্যের আমদানির কারণে বন্দরের কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে গেছে। আমদানি কমায় বন্দরের দৈনন্দিন আয় কমে গিয়েছে যাতে করে ব্যয়ভার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। সেই সাথে বন্দরে কর্মরত শ্রমিকরা মানবেতর জীবন যাপন করছেন। তবে আমাদের বন্দরের সবধরনের অবকাঠামো রয়েছে এখানে অধিগ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত তিন দফায় জায়গা বাড়ানো হয়েছে অবকাঠামো বাড়ানো হয়েছে। এখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে শেড রয়েছে ওপেন শেড ওপেন ইয়ার্ড রয়েছে। বন্দর দিয়ে বিপুল পরিমানে পণ্য আমদানি-রপ্তানি জন্য সবধরনের ব্যবস্থা রয়েছে সেক্ষেত্রে যদি আমদানি-রপ্তানি বাড়ে তাতে করে সরকারের রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি বন্দরের দৈনন্দিন আয় বাড়বে। 

হিলি স্থল শুল্ক স্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা শফিউল আলম অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, এই বন্দর দিয়ে কমলা, কেনু, মালটা ফল আমদানির ক্ষেত্রে ৬ চাকার গাড়িতে ১৮টন, ১০চাকার গাড়িতে ২০টন, ১২ চাকার গাড়িতে ২২টন, ১৪ চাকার গাড়িতে ২৫ টন, ১৬ চাকার গাড়িতে ২৬টন পণ্য হিসেবে শুল্কায়ন করতে হবে যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর থেকে এসআরও দিয়ে বলে দেওয়া হয়েছে। এর নিচে কোন ফল আমদানির ক্ষেত্রে কোনো প্রকার দিক নির্দেশনা নেই এনবিআর থেকে। এছাড়া হিলি স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানির সরকারি যে নির্দেশনা রয়েছে সেই মোতাবেক তারা পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করতে পারবেন। সেক্ষেত্রে আমাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার বাধা নিষেধ নেই ব্যবসায়ীরা অবাধে সেসব পণ্য আমদানি করতে পারবেন। এছাড়া বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে এবিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ীদের উদ্ভুদ্ধ করা হচ্ছে। যে কোনো অনৈতিক কাজ বাদ দিয়ে নৈতিকতার ভিত্তিতে কোন পণ্য আমদানি করলে আমাদের কাস্টমসের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার অসুবিধা নেই। বিধি অনুযায়ী পণ্য আমদানিতে সব ধরনের সহযোগিতার কথা জানিয়েছেন তিনি। বন্দর দিয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বন্দর দিয়ে ১২ লাখ ৯৬ হাজার ৮৮৩ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যা নেমে এসেছে ৬ লাখ ২৬ হাজার ৪৯ মেট্রিক টনে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত