বর্তমান সময়ে পত্র-পত্রিকা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, অসহনীয় মাত্রায় বেড়ে চলছে শিশু নির্যাতনসহ হত্যার মতো মারাত্মক ঘটনা। যা মহামারীর আকার ধারণ করছে। সমাজে এই ধরনের ঘৃণিত কাজ দিন দিন বেড়েই চলছে। অথচ আল্লাহতায়ালা শিশুর অধিকারের বিষয়ে তার জন্মের আগ থেকেই কল্যাণমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা করেছেন। কেননা ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। তাই মানুষের জাগতিক ও পারলৌকিক কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইসলামের আহ্বানে সাড়া দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই। প্রাপ্তবয়স্কদের অধিকারের স্বীকৃতির পাশাপাশি শিশুদের কল্যাণের সার্বিক দিকনির্দেশনা রয়েছে ইসলামে।
শিশুকে কোনো অবস্থাতেই হত্যা করা যাবে না : শিশুদের বেঁচে থাকার অধিকার ইসলাম কর্র্তৃক স্বীকৃত ও সুরক্ষিত। কোনো অবস্থাতেই পিতামাতা বা অন্য কেউ সন্তান হত্যা করতে পারে না। এমনকি চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন হলেও তা করা যাবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের দারিদ্র্যের ভয়ে হত্যা করো না। তাদের আমিই রিজিক দিই এবং তোমাদেরও। তাদের (শিশুদের) হত্যা করা মহাপাপ।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৩১) যারা শিশু সন্তানদের হত্যা করে তাদের উদ্দেশে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা নির্বুব্ধিতার দরুন অজ্ঞানতাবশত নিজেদের সন্তানদের হত্যা করেছে, তারা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ (সুরা আনআম ১৪০)
শিশুর প্রতি দয়া প্রদর্শনও ইবাদাত : শিশুরা নিষ্পাপ। শিশুদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া বিধেয় নয়। এমনভাবে প্রহার করা যাবে না, যাতে কেটে যায়, ফেটে যায়, ফুলে যায়, দাগ হয় বা বিবর্ণ হয়। রাগের বশীভূত হয়ে শাস্তি প্রদান করা যাবে না। শরীরের এমন কোনো জায়গায় আঘাত করা যাবে না, যাতে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি হতে পারে। আমাদের দেশে শিশুরা বঞ্চনা ও নিগ্রহের শিকার হয় গৃহে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও কর্মস্থলে। কোথাও তাদের নিরাপত্তা নেই। বিদ্যালয়ে অদক্ষ, অযোগ্য, মানহীন শিক্ষক কর্র্তৃক অবোধ শিশুদের অমানবিকভাবে প্রহারের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এ বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধান বা পরিচালক, কর্র্তৃপক্ষ বা কমিটি এবং দায়িত্বশীলদের আরও সচেতন ও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, শিশুর প্রতি দয়া প্রদর্শনও ইবাদত। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি একটি শিশু নিয়ে বিশ্বনবীর খেদমতে এসে শিশুটিকে চুমু দিতে লাগলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ দৃশ্য দেখে জিজ্ঞেস করলেন, শিশুটির প্রতি কি তোমার দয়া জেগে উঠেছে? সে বলল, হ্যাঁ। তারপর রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহতায়ালা তোমার প্রতি এর চেয়েও অধিক দয়াশীল। কেননা তিনি দয়ালুদের শ্রেষ্ঠ দয়ালু। (সহিহ বুখারি)
শিশুদের আদর-স্নেহ করা নবীর সুন্নত : শিশুরা আল্লাহর সাজানো বাগানের ফুল। ফুল দেখলেই যেমন মানুষ তার ঘ্রাণে মোহিত হয় তেমনি মানববাগানের ফুল দেখেও মানুষ আনন্দিত হয়। চক্ষু শীতল হয়। শিশুরা মমতার আধার। শিশুদের আদর-স্নেহ করা নবী (সা.)-এর সুন্নত। নবীজি (সা.) তার দৌহিত্রকে ভরা মজলিসে স্নেহের চুম্বন দিয়ে আমাদের তা শিখিয়েছেন। একদা নবীজি (সা.) নাতি হাসানকে চুমু দিচ্ছিলেন, তা দেখে আকবা ইবনে হারেস নামে এক সাহাবি নবী (সা.)-কে বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি শিশুদের দেখে এত আনন্দিত হন এবং আদর স্নেহ করেন তারাও আপনার আদরে আপ্লুত হয়। আমার তো অনেক সন্তান, কিন্তু তাদের আপনার মতো স্নেহ করতে পারি না, নবীজি (সা.) বললেন, তোমার হৃদয়ে স্নেহ-মমতা না থাকলে আমার কী করার আছে?
সুস্থভাবে বেঁচে থাকার অধিকার : মায়া, মমতা, সহানুভূতি এসব গুণ মহান আল্লাহই দিয়েছেন মানুষের হৃদয়ে। তবে নানা কারণে প্রকৃতিতে যেমন বিপর্যয় দেখা দেয়, তেমনই মানুষের চিন্তা-চেতনাতেও বৈকল্য ঘটে। বিপর্যয় দেখা দেয়। বর্তমানে এমন এক বিপর্যস্ত সময় অতিক্রান্ত করতে হচ্ছে আমাদের। দেশে শিশুহত্যা ও নির্যাতন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পাঠকমাত্রই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। সংবাদমাধ্যমগুলোর দিকে তাকালেই তা আঁচ কারা যায়। সম্প্রতি সিলেটে মুনতাহা নামের এক নিষ্পাপ শিশুহত্যার যে লোমহর্ষক ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে, তা খুবই ভয়াবহ। শিশুর প্রতি এমন নিষ্ঠুর আচরণ বনের হিংস্র জানোয়াররা করলে একটা কথা ছিল। মানুষ হয়ে এমন অমানুষের কাজ কি মেনে নেওয়া যায়? শিশুর নরম দেহকে যারা ক্ষতবিক্ষত করছে তাদের বাড়িতে কি কোনো শিশু নেই? শিশুর প্রতি কারও মনে যদি ভালোবাসার উদয় না হয় তাহলে তাকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করাই ভালো।
শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য রাসুল (সা.) তাদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার নিজে করেছেন এবং অন্যদেরও করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি চাইতেন শিশুরা যেন কোনো সময় কষ্ট না পায় বা নির্যাতনের শিকার না হয়। শিশুদের যেকোনো মৌলিক চাহিদা মেটাতে তিনি ছিলেন অত্যন্ত যতœশীল। কোনো শিশু দুষ্টুমি করলে তিনি তাকে কড়া শাসন না করে হাসিমুখে শোধরানোর কৌশল গ্রহণ করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন, যে ছোটকে স্নেহ-মমতা করে না এবং বড়কে শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (তিরমিজি)
তাই আসুন আমরা নিষ্ঠুরতা পরিহার করে শিশুদের সুন্দর মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলি। তাহলে ভবিষ্যৎ পৃথিবী হবে আরও সুন্দর। ইসলামের শিক্ষা হলো, সব শিশুই যেন নিরাপদে বেড়ে ওঠে। অথচ আজকের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও আমাদের দেশে শিশুরা কতই না অবহেলিত, নির্যাতিত ও নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার! সুতরাং ইসলামের সুমহান শিক্ষাকে সামনে রেখে যদি নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের আদর্শ ও শিক্ষা-দীক্ষায় শিশুদের যথাযথ স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে পিতা-মাতা, সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র তাদের সেবা লাভে উপকৃত হবে।
