অপরাধ-ছিনতাইয়ের জন্য কুখ্যাতি রয়েছে ব্রাজিলের। চুরি-ডাকাতি কিংবা ছিনতাইয়ের ঘটনা ব্রাজিলে নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। আর এসব ঘটনা সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় ব্রাজিলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। ব্রাজিলের সামরিক পুলিশ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আমাজন নদীর মোহনায় অবস্থিত মারাজো দ্বীপের একটি পুলিশ ব্যাটালিয়ন নতুন এক মাত্রা যোগ করেছে। তারা টহলের জন্য গাড়ি বা মোটরসাইকেল নয়, মহিষের পিঠে চড়ে রাস্তায় টহল দেয়।
বিশাল শিংওয়ালা ১ হাজার ৮০০ পাউন্ড ওজনের এই মহিষগুলো কাদামাখা জমি ও ঘন ম্যানগ্রোভ বন পাড়ি দিতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে সাঁতারও কাটতে পারে। বৃষ্টির মৌসুমে এই বিশাল দ্বীপে অপরাধীদের ধরার জন্য মহিষগুলোই একমাত্র ভরসা বলছেন পুলিশ সদস্যরা। মারাজো দ্বীপের সার্জেন্ট রোনালদো সুজা বলেন, কিছু জায়গায় মোটরসাইকেল বা নৌকাও পৌঁছাতে পারে না, কিন্তু মহিষ দিয়ে সবখানে যাওয়া সম্ভব। সওরি শহরের উত্তরপূর্ব কোণে প্রায় ২৪ হাজার বাসিন্দার শান্ত এই শহরে, বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও চামড়ার বুট পরা পুলিশ কর্মকর্তারা দিন শুরু করেন মহিষের পিঠে চড়ে। তাদের কোমরে বাঁধা থাকে পিস্তল, আর মহিষের এই অভিজাত দল টহল দিতে দিতে শহরের প্রধান চত্বরে গিয়ে হাজির হয়।
দ্বীপটির এই ব্যাটালিয়নের সাতটি জলমহিষ রয়েছে। যার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী মহিষের নাম মিনোতাউর। জলমহিষ এশিয়ার প্রাণী হলেও, ব্রাজিলের বেশিরভাগ জায়গায় বিরল। তবে মারাজো দ্বীপে প্রায় ছয় লাখ জলমহিষ রয়েছে, যা দ্বীপের জনসংখ্যার সমান। তবে কোথা থেকে এই দ্বীপে এশিয়ার জলমহিষ এসেছিল, সেটি নিশ্চিত করে জানা যায়নি। এ বিষয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্প থেকে জানা যায়, ১৯০০ শতকে ফরাসিরা এশিয়া থেকে মহিষ এনে গিনি অঞ্চলে তাদের উপনিবেশে সস্তা মাংস সরবরাহের জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু মাঝপথে জাহাজ ডুবে গেলে মহিষগুলো সাঁতরে মারাজো দ্বীপের তীরে উঠে আসে। এরপর থেকেই এই অঞ্চলটির ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে যায় এই জলমহিষরা। মারাজোর কার্নিভ্যাল এবং স্বাধীনতা দিবসের শোভাযাত্রার মূল আকর্ষণ এসব মহিষ। এমনকি দ্বীপের জনপ্রিয় মহিষদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্টও রয়েছে।
ব্রাজিলের অন্যান্য শহর ও অঞ্চল অপরাধপ্রবণ হলেও, মারাজো দ্বীপটিতে অপরাধের হার খুবই কম। মহিষদের নিয়ে পুলিশের টহল ছোটখাটো অপরাধীদের দূরে রাখার জন্য যথেষ্ট বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তারা গর্ব করে বলেন, এটাই হয়তো ব্রাজিলের একমাত্র জায়গা, যেখানে প্রকাশ্যে ঘড়ি পরেও ডাকাতির ভয় নেই। পর্যটকরা মারাজো দ্বীপে জলমহিষের সঙ্গে সময় কাটাতে ভিড় করেন। মারাজোর মানুষ এই মহিষদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছে। এখন এরা দ্বীপের ট্যাক্সি, আবর্জনা ট্রাক এবং মালবাহী যান হিসেবেও কাজ করে। মহিষের মাংসের বার্গার, দুধ থেকে তৈরি করা পুরস্কারজয়ী পনির এবং মহিষের দুধের আইসক্রিম এখানকার বিশেষ খাবার। এদের সম্পদ হিসেবেও ব্যবহার করা হয়। তার পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মহিষের চামড়া দিয়ে নানা সামগ্রী তৈরি করছে, যার মধ্যে মহিষের স্ক্রোটাম দিয়ে তৈরি করা ব্যাগ বিশেষভাবে জনপ্রিয়।
১৯৯০-এর দশকে সামরিক পুলিশ প্রথম মহিষকে কাজে লাগায়। তখন তাদের সম্পদের অভাব ছিল, হাতে ছিল শুধু একটি পুরনো ভ্যান। মহিষ এখন দ্বীপের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, ব্যবহারিক থেকে সাংস্কৃতিক সব কাজেই। মারাজো দ্বীপের সওরি শহরের মিলিটারি পুলিশ ব্যাটালিয়নের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৯০। তাদের মধ্যে অনেকেই এখন এসি-প্যাট্রল কারে টহল দেন। তবে প্রধান টহল দল হিসেবে পরিচিত বাফেলো স্কোয়াডই। আর এসব মহিষগুলোর সর্বোচ্চ যত্ন নেন পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে দ্বীপের বাসিন্দারা।
