শিশুটির নাম রাখারও কেউ নেই

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:০৯ এএম

১২ দিনের নবজাতক। পুরো শরীর মোটা কাপড়ে মোড়ানো। শুধু ঘুমন্ত কচি মুখটুকু দেখা যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই এমন নবজাতকের নিরাপত্তায় থাকে প্রসূতি মায়েদের আদুরে তৎপরতা আর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। বাড়ি ও ঘর জুড়ে থাকে খুশির হিল্লোল। যদিও ঘুমন্ত নবজাতকটি ঘিরে তেমন কোনো কিছুরই দেখা মিলল না। শুধু তার মাথার কাছে রাখা একটি দেশলাইয়ের বাক্স ও কয়েকটি কড়ির মালা। সামাজিক বিশ্বাসের কারণে, কোনো অশরীরি শক্তির ক্ষতিকর দৃষ্টি থেকে নবজাতককে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য এসব উপকরণ রাখা সেখানে। যদিও এগুলো বহুল প্রচলিত কুসংস্কার।

যে সময়ে মায়ের বুকের উষ্ণতায় সুরক্ষা পাওয়ার কথা, তখন এসব বায়বীয় উপায়ে নবজাতকটিকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রচেষ্টা কেন? তার মা কোথায়? নামই বা কী ফুটফুটে শিশুটির? গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর মগবাজারের গ্রিনওয়ে সড়কের বাসায় এসব প্রশ্ন করা হলে নবজাতকের চাচা নাঈম শিকদার প্রথমে কিছুটা সময় নির্বাক থাকলেন। এরপর চাপা গলায় বলতে শুরু করলেন, ‘গত ১০ নভেম্বর জন্মের পরেই তাকে (নবজাতক) এনআইসিইউতে (নিওনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) নেওয়া হয়। মায়ের অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে তাকেও জরুরি চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এ অবস্থায় তাদের চিকিৎসার টাকা তোলার জন্য ওর (নবজাতক) বাবা শাহীন শিকদার মগবাজার গ্র্যান্ড প্লাজার পাশে একটি এটিএম বুথে যায়। সেখানে পৌঁছালে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েকশ লোক তাকে আওয়ামী লীগ ও স্বৈরাচারের দোসর বলে গালাগাল শুরু করে, একপর্যায়ে মারধর করে। তারপর তাকে হাতিরঝিল থানা পুলিশের হাতে তুলে দেয়। পরে পুলিশ তাকে খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কোর্টে তোলে। এই খবর শুনে হাসপাতালে চিকিৎসারত শাহীনের স্ত্রী খাদিজা স্ট্রোক করে। তারপর মারা যায়। জন্মের দিন বাবাকে মেরে পুলিশে দেয় বিএনপির লোকজন, দুদিন পর মারা যায় মা। এই অবস্থায় ওর (নবজাতক) কোনো নাম রাখা হয়নি ভাই।’

কী অপরাধে শাহীনকে মারা হলো, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার পরে মামলায় গ্রেপ্তার করা হলো? এসব প্রশ্নের জবাবে ধরা গলায় নাঈম শিকদার বলেন, ‘আমরা চার ভাই। সবার ছোট নাদিম শিকদার। সে এক সময় হাতিরঝিল থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিল। এ ছাড়া আমরা বাকি তিন ভাইয়ের কেউই কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত না। নাদিম পটপরিবর্তনের পরে গা-ঢাকা দিয়েছে। হয়তো বা তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বলি হয়েছে শাহীন। বিএনপির লোকজন তাকে মেরে পুলিশে দিল। যাদের কাউকেই আমরা চিনি না। আর পুলিশও আগস্ট-পরবর্তী সময়ে হাতিরঝিল থানায় হওয়া ২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার গাড়ি বহরে হামলার ঘটনায় করা মামলায় শাহীনকে গ্রেপ্তার দেখাল। কোনোভাবেই তাকে আমরা মুক্ত করতে পারছি না।’

শাহীনের সদ্যজাত নামহীন সন্তানটি ছেলে। এ ছাড়া ফাতেমা শিকদার (১৪) ও আয়েশা শিকদার (১০) নামে আরও দুটি কন্যা সন্তান আছে তার। শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয়ে, মা হারা এই তিন সন্তানদের জীবনে যে মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে তা ব্যথিত করছে এলাকাবাসীকেও। এ প্রসঙ্গে বড় মগবাজার ১২ নম্বর কলোনির সামনে কথা হয় পান-সিগারেটের দোকানি মো. ফারুক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নাদিম ছাড়া হেগো আর কোনো ভাই রাজনীতি করত না। তার কারণে শাহীনের জীবনডা শ্যাষ হইল। বউ মরল, তিনডা সন্তান এতিম (মা হারা) হইল। এডি মাইনা নেওন কষ্টের। বড় দুইডার কথা বাদই দিলাম। মায়েরে ছাড়া ছোটডারে কেমনে মানুষ করব। বাপও (বাবা) তো জেলে!’

এ ধরনের ঘটনাকে অমানবিক আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মানবাধিকার কর্মী জেডআই খান পান্না। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এগুলো হচ্ছে আইনের অমানবিক অপব্যবহার। এগুলো যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে। যে অপরাধ করেছে শাস্তি সে পাবে। তার কারণে তার ভাই বা বাবা কেউই দায়ী হবে না। যে অপরাধী সেই শুধু দায়ী হবে। এটাই আইন। এই ঘটনার কারণে যে মায়ের মৃত্যু হয়েছে এবং যে শিশুটা আর কোনোদিন মায়ের ছায়া পাবে না। এজন্য আইনের অপব্যবহারটা দায়ী।’

শাহীন শিকদারকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেই মামলার এজাহারে ১৯৪ জন আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে আরও ২০০ জনকে। নাম উল্লেখ করা আসামিদের মধ্যে শাহীন শিকদারের নাম নেই। আসামি না হলেও শাহীনকে কীভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো? এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় হাতিরঝিল থানার ওসি মোহাম্মদ রাজুর কাছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি বলেন, ‘আমি এখন কিছু বলতে পারছি না। পরে খোঁজ নিয়ে জানাব।’

বাবা-মাকে নিয়ে প্রতিটি দিন স্বজনদের কাছে এমন হাজারটা প্রশ্ন করে শাহীনের দুই মেয়ে ফাতেমা ও আয়েশা। যেসব প্রশ্নের উত্তর হাতিরঝিল থানার ওসির মতোই এড়িয়ে যান পরিবারের সদস্যরা। তারপরও কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহীনের বড় মেয়ে ফাতেমার প্রশ্ন, ‘আমার আব্বু তো কখনো রাজনীতি করেনি। আমার আম্মু মারা গেছে, আব্বুকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে এই খবর শুনে। আমার ভাই তো এখনো অনেক ছোট, আমার ভাইয়ের কী হবে? আমাদের কী হবে?’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত