৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি 

বেকায়দায় পড়ে ভাস্কর্য ফিরিয়ে আনলেন রাবি অধ্যাপক

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০২৪, ০৫:৪৫ পিএম

নিজের বানানো মুক্তিযোদ্ধার দুটি ভাস্কর্য ভাঙাড়ি দোকানে বিক্রি করে বেকায়দায় পড়ে আবারও সেগুলো নিজের কাছে ফিরিয়ে আনলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গ্রাফিক্স ডিজাইন, কারুশিল্প এবং শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আমিরুল মোমেনিন জোসি। ভাস্কর্য দুটির আবারও জায়গা হয়েছে তার নিজের স্টুডিওতে। তিনি বলছেন, তার বানানো দুটি ভাস্কর্য প্রায় ১২ বছর তার স্টুডিওতে পড়েছিল। স্টুডিওটি তিনি সংস্কার করার জন্য এই দুটি ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেটি একটি ভাঙড়ির দোকানদার নিয়ে গিয়েছিলেন এবং দোকানের সামনে সেগুলো রেখেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। এটি নিয়ে তিনি চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে নানাভাবে আক্রমণাত্মক কথা বলা হচ্ছে, অশালীন ভাষায় কথা বলা হচ্ছে। এগুলো নিয়ে তিনি ও তার পরিবার চরম এক খারাপ সময় পার করছেন। 

অধ্যাপক জোসি বলেন, এটা নিয়ে অনেকেই রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলছেন, এগুলো ঠিক নয়। এর মধ্যে রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই। এটি আমি কোথাও স্থাপন করতে পারিনি তা নয় দাবি করে এই অধ্যাপক বলেন, আমি চাই এটি নিয়ে কেউ যেন রাজনীতি না করেন।

রাজশাহী নগরীর বিনোদপুর বাজারে ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী মো. মিলনের একটি দোকান রয়েছে। ‘খোকন আয়রন ঘর’ নামের এই দোকানটিতে বিভিন্ন পুরাতন কাগজপত্রসহ ভাঙাড়ি জিনিসপত্র কেনাবেচা করা হয়। এই দোকানের সামনে রাস্তার ওপরে দাঁড় করে রাখা ছিল দুটি ভাস্কর্য। দুজন মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র উঁচিয়ে বিজয়োল্লাস করছেন। তার সামনে আরেক মুক্তিযোদ্ধার এক হাতে অস্ত্র, অন্য হাতে উড়িয়ে দিচ্ছেন পায়রা। মুক্তিযুদ্ধের এমন থিমে বানানো এই দুটি ভাস্কর্য বানিয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) গ্রাফিক ডিজাইন, কারুশিল্প এবং শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আমিরুল মোমেনিন জোসি। ভাঙাড়ির দোকানের সামনে থাকা এই দুই ভাস্কর্য নিয়ে প্রতিবেদন সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ নিয়েই বেকায়দায় পড়েন অধ্যাপক আমিরুল মোমেনিন জোসি। আবার এই ভাস্কর্য কিনেও বেকায়দায় পড়েন ভাঙাড়ি ব্যবসায়ী মিলন। 

গত শনিবার (২৩ নভেম্বর) বিনোদপুরে খোকন আয়রন ঘর গিয়ে দেখা হয় মিলনের বাবা বদরউদ্দীনের সঙ্গে। তার মনেও অশান্তি চলছে এই ভাস্কর্য নিয়ে। একের পর এক মানুষ আসছে এটির খোঁজ নিয়ে। এসব নিয়ে তিনিও বিব্রত। এ নিয়ে কিছু বলতেও চান না বদরউদ্দীন। বললেন, এসবের তিনি কিছু জানেন না। তার ছেলে একজনের কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন এটুকুই তিনি জানেন। এর বেশি কিছু বলতে নারাজ তিনি। এ বিষয়ে কথা বলতে যেন বিরক্তির ছাপ বদরউদ্দীনের মুখে। এ নিয়ে রবিবার দুপুরে কথা হয় মিলনের সঙ্গে। মিলন জানান, ওই ভাস্কর্য দুটি তিনি জোসি স্যারের কাছ থেকে কিনে এনেছিলেন, তিনি আবার ফেরত নিতে চেয়েছিলেন। এ কারণে সেগুলো আবারও স্যারের স্টুডিওতে ফেরত দিয়ে এসেছি। ভাস্কর্য দুটির ভেতরে পুরো লোহার পাত দেওয়া রয়েছে। বাইরের অংশটা স্টিল দিয়ে তৈরি। উচ্চতা প্রায় ১৮ ফুট। 

এ নিয়ে কথা হয় অধ্যাপক আমিরুল মোমেনিন জোসি সঙ্গে। কথার শুরুতেই তিনি অনুরোধ করেন, ‘এটা নিয়ে কেউ রাজনীতি করো না। আমি খুবই বিব্রতকর অবস্থায় আছি। আমার পরিবার চরম অশান্তিতে আছে।’ 

অধ্যাপক আমিরুল মোমেনিন জোসি আরও জানান, এই ভাস্কর্য দুটি তিনি তৈরি করেছিলেন প্রায় ১২ বছর আগে। নওগাঁর মান্দা বাজারে স্থাপন করার জন্য এগুলো বানানো হয়েছিল। নগরের মেহেরচণ্ডিতে নিজের স্টুডিওতেই ভাস্কর্য দুটি তৈরি করেন তিনি। 

কেন বানিয়েছিলেন এই দুই ভাস্কর্য : অধ্যাপক আমিরুল মোমেনিন জোসি জানান, নওগাঁর মান্দায় স্থাপনের জন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে তিনি দুটি ভাস্কর্য বানানোর অর্ডার পান ২০১১/১২ সালের দিকে। কিন্তু তিনি ওই সময় সিডিউল ঠিকভাবে না দেখায় একটা ভুল হয়ে গিয়েছিল। তারা সিমেন্টের ভাস্কর্য চেয়েছিলেন। কিন্তু আমি বানিয়েছিলাম স্টিল দিয়ে। তারা এটিতে আপত্তি জানায় এবং স্টিলের তৈরি ভাস্কর্য নিতে রাজি হয়নি ঠিকাদারসহ সংশ্লিষ্টরা। শেষ পর্যন্ত এটি আর তাদের না দিয়ে আবারও সিমেন্ট দিয়ে নতুন করে ভাস্কর্য বানিয়ে দেওয়া হয়। আর এই দুটি ভাস্কর্য স্টুডিওর ভেতরেই রেখে দেওয়া হয়। 

এতদিন কেন কোথাও স্থাপন করা যায়নি : এতদিন কেন এগুলো কোথাও স্থাপন করা যায়নি এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক জোসি বলেন, এগুলো বানানোর পর আমার কাছেই মনে হয়েছিল এতে কিছু ত্রুটি আছে। মাথা ছোট হয়ে গিয়েছিল। আবার এগুলো মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য হলেও ঠিক সেভাবে ফুটে ওঠেনি। এ কারণে আমার মনে হয়েছে এগুলোতে আরও কাজ করতে হবে। এ ছাড়া যারা ভাস্কর্য অর্ডার দেন তারা তো নিজের মতো করে একটা সম্ভাব্য অবয়ব দিয়ে ভাস্কর্য নিতে চান। এ কারণে এটি নেওয়ার মতো কেউ আগ্রহ দেখায়নি। তিনি নিজেও এটি কোথাও বসানোর জন্য তেমন চেষ্টাও করেননি বলে জানান এই শিল্পী। তিনি জানান, এর আগেও অনেক ভাস্কর্য পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জে বসানোর জন্য বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের একটি ভাস্কর্য আমি বানিয়েছিলাম। কিন্তু তার প্রচলিত যে ছবি সে রকম না করে আমি তার দাড়িওয়ালা একটি ছবিকে কেন্দ্র করে এটি বানিয়েছিলাম। যারা অর্ডার দিয়েছিলেন সেটি তাদের পছন্দ না হওয়ায় এখনো আমার স্টুডিওতে পড়ে রয়েছে। 

ভাস্কর্য কেন ভাঙাড়ির দোকানে দিলেন : ভাস্কর্য কেন ভাঙাড়ির দোকানে গেল, এটি কি অসম্মান নয়? এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক জোসি বলেন, আমাদের একেকটি শিল্প একেকটি সন্তানের মতো। কিন্তু এটি কখন মূল্যবান হয় সেটি বুঝতে হবে। একটি ভাস্কর্য যতক্ষণ বেদিতে না বসানো হলো, তার একটা নাম দেওয়া না হলো ততক্ষণ তো এটি ভাস্কর্যই হলো না। তিনি বলেন, আমার যে স্টুডিওটিতে এটি এতদিন রেখেছিলাম সেটির সংস্কারকাজ করছি। এ কারণে এটি আর এখানে রাখা সম্ভব নয়। আমি এটি বিক্রি করতে চাওয়ায় মিলন নামের ছেলেটা নিতে চাইল। তাকে আমি ৪০ টাকা কেজি দরে এটি বিক্রি করেছিলাম। ওই ব্যবসায়ীকে বলেছিলাম ভেঙে লোহা হিসেবে যেন সে নিয়ে যায়। কিন্তু সে অক্ষত অবস্থায় নিয়ে গিয়ে দোকানের সামনে রাখে। এটি নিয়ে যখন হইচই হলো, এটি নিয়ে রাজনীতি শুরু হলো, তখন আমি তার কাছে এটি ফেরত চাই। ওরা ফিরিয়ে দিয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে রাজনৈতিক কোনো দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ না করার অনুরোধ জানান অধ্যাপক আমিরুল মোমেনিন জোসি। তিনি বলেন, আমার এই ভাস্কর্য নিয়ে খারাপ মেসেজ গেলে আমি কষ্ট পাব। এই সময়ে আমি এটি স্থাপনের সুযোগ পাচ্ছি না, ব্যাপারটা তো তেমন নয়। আমার কাছে এটা তো ১২ বছর ধরেই পড়ে রয়েছে। এতদিন তো এটি নেওয়ার জন্য কেউ আসেনি। 

এখন এগুলো কী করবেন জানতে চাইলে প্রবীণ এই শিক্ষক বলেন, আমার সমস্যার কারণেই আমি এটি বিক্রি করেছিলাম। যেহেতু এটি নিয়ে সমালোচনা এলো, সমস্যা হলেও আমি এটিকে আপাতত আমার কাছেই রাখব। আর কোথাও থেকে চাহিদা এলে, কেউ এটি স্থাপন করতে চাইলে যেসব কাজ বাকি আছে সেগুলো ঠিক করে আমি এগুলো দিয়ে দেব। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত