মানুষ কেন বিক্ষুব্ধ গণমাধ্যমের স্পষ্ট করা উচিত : নাহিদ

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ০৭:০৪ এএম

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিগত সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। নানা কারণে মানুষের অনেক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কেন মানুষ তাদের ওপর বিক্ষুব্ধ, এটি স্পষ্ট করা সাংবাদিকদের এবং ওই গণমাধ্যমের দায়িত্ব। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘তাদের উচিত আলোচনায় বসা। নিজেদের অবস্থান, কর্মকাণ্ড স্পষ্ট করা উচিত। গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব আছে। ল অ্যান্ড অর্ডারে গেলে সরকার অবশ্যই তার দায়িত্ব পালন করবে। পত্রিকা অফিস ভাঙচুর বা চাপ প্রয়োগ করা হলে আমরা মেনে নেব না। সেটা অবশ্যই আইনগতভাবে দেখা হবে। কিন্তু জনগণের ক্ষুব্ধতা থাকলে তারা সভা-সমাবেশ করবে। তবে সেটি যেন শান্তিপূর্ণভাবে করে।’

পুলিশও যাতে দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করতে দেয়, সরকারের পক্ষ থেকে সেই নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা। তবে সাংবাদিকরা তার কাছে ক্ষুব্ধতার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘কেন এই ক্ষুব্ধতা, তা আন্দোলনকারীরা ভালো বলতে পারবে।’

ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর অফিসের সামনে বিক্ষোভের প্রসঙ্গ টেনে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন এটা গণমাধ্যমের জন্য হুমকি কি না। জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, তিনি গতকালও (সোমবার) বলেছেন, এখানে একটি ল অ্যান্ড অর্ডার সিচুয়েশন (আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়) তৈরি হয়েছে। সে জায়গা থেকে সরকার ভূমিকা পালন করবে। পত্রিকা অফিসে ভাঙচুর হলে, সেটা অবশ্যই আইনগতভাবে দেখা হবে। কিন্তু এটা শুধু আইনি বিষয় নয়, বিগত সময়ে নানা গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের ওপর মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কাছে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করছেন জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘যেকোনো ধরনের সমালোচনা আমরা ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছি। আমাদের প্রধান উপদেষ্টাও সে কথাই বলেছেন। গঠনমূলক সমালোচনা হলে সেটি আমাদের জন্য উপকার হবে। এতে আমরা নিজেদের কাজের প্রতিফলন দেখতে পাই, শুধরে নিতে পারি। সেই জায়গা থেকে গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকতা থেকে আমরা গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন করেছি। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন স্বাধীনভাবেই কাজ করবে। তারা সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে একটা রূপরেখা উপস্থাপন করবে। সরকারের পক্ষ থেকে আবার বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে সেটা বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। ’

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সাংবাদিকতা কিংবা সংবাদমাধ্যম এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে বিভিন্ন অংশীজন একসঙ্গে ক্রিয়াশীল। এখানে অনেক পরস্পরবিরোধী অংশীজন থাকে। ওয়েজবোর্ডের কথাই যদি বলি, তাহলে সম্পাদক, মালিক এবং রিপোর্টাররা একেকজন একেকটা পক্ষ নেবে। সবাই মিলে এক জায়গায় আসতে হবে। তিনি বলেন, ‘সাইবার সিকিউরিটি আইন বিষয়ে আমরা এরই মধ্যে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অন্য আইনগুলো আমাদের পর্যালোচনার মধ্যে আছে। সংস্কার কমিটিরও প্রধান কাজ হবে আইনগুলোর বিষয়ে পর্যালোচনা করা। যত কমসংখ্যক আইন এবং কম বাধা তৈরি করা যায়, ততই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য ভালো।’

নাহিদ বলেন, বিগত ১৬ বছরে গণমাধ্যমের ভূমিকা আসলে কী ছিল, কারা জনগণের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, এটা সুস্পষ্ট থাকা উচিত। যদি কেউ ভুল করে থাকে কিংবা পরিস্থিতির শিকার হয়, তাহলে তাকে ভুল স্বীকার করে মানুষের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। ৫ আগস্টের পর কেউ যদি ভোল পাল্টে ফেলে, এটা তো হওয়া উচিত নয়, তাকে সত্যটা স্বীকার করা উচিত। সত্যের মধ্য দিয়ে আসলেই ‘রিকনসিলিয়েশন’ সম্ভব।

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘একটা মিথ্যা খবর, গুজব অনেক বড় ঘটনার জন্ম দিতে পারে। সেই জায়গায় গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রত্যাশা করছি। আমরা গণমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল। সেজন্য আমরা গণমাধ্যমের কাছে সহযোগিতা প্রত্যাশা করছি।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার যে টাকা লুটপাট করেছে, সে টাকা এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে দেশে এবং দেশের বাইরে এ সরকারের বিরুদ্ধে নানা ধরনের গুজব ছাড়ানোর জন্য। সেই জায়গায় সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের ভূমিকা অনেক বেশি। তারা যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের জনগণ মনে রাখবে।

সাংবাদিকতাকে নতুন করে গড়ে তোলার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকার গণমাধ্যমকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে। এই স্বাধীনতাকে কাজে লাগিয়ে সাংবাদিকতা কীভাবে গড়ে উঠবে, এ বিষয়টি বাংলাদেশের সাংবাদিকরা নির্ধারণ করবেন।

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাংবাদিকদের ভূমিকা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের অনেক সাংবাদিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যম কর্তৃপক্ষের কারণে সব ক্ষেত্রে আন্দোলনের সংবাদ গণমাধ্যমে প্রচার হয়নি।

গত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, বিগত সরকার গণমাধ্যমের ওপর নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। সে সময় অনেক সাংবাদিক দলীয় কর্মীর মতো কাজ করেছে। এসব কারণে গণমাধ্যমের ওপর জনগণের আস্থা অনেক কমে গিয়েছিল।

মতবিনিময় সভায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা বলেন, গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের আগে অবশ্যই সত্যতা যাচাই করতে হবে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর গণমাধ্যমের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন, সহসভাপতি শফিকুল ইসলাম শামীম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, অর্থ সম্পাদক জাকির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ সাইফফুল্লাহ প্রমুখ।

ডিআরইউ নেতারা বলেন, এখন গণমাধ্যমকে ফ্যাসিবাদমুক্ত করার সময় এসেছে। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত