সরাসরি এসআই নিয়োগ নয়

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৪, ১২:২৮ পিএম

অন্তর্বর্তী সরকারের পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারে গঠিত কমিশন পুলিশে নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ করতে যাচ্ছে। কমিশনের খসড়া সুপারিশে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও কনস্টেবল নিয়োগ ছাড়া আর কোনো নিয়োগ না করতে বলা হচ্ছে। এর ফলে কনস্টেবল থেকে বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে একজন এএসআই, এসআই হয়ে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পাবেন। এ ক্ষেত্রে কনস্টেবল নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির পরিবর্তে এইচএসসি করারও চিন্তাভাবনা চলছে বলে কমিশনের একটি সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া পুলিশ সার্জেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হচ্ছে। তবে চলমান এসআই নিয়োগ পরীক্ষা বলবৎ থাকবে।

কমিশনের একটি সূত্র জানায়, রাজনীতি ও দুর্নীতির বেড়াজাল থেকে পুলিশ বাহিনীকে রক্ষা করতে নিয়োগে এসব পরিবর্তনের সুপারিশ করা হচ্ছে। সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ও কনস্টেবল নিয়োগ ছাড়া অন্য নিয়োগ বন্ধ হলে সাব-ইন্সপেক্টর (এসআই) নিয়োগ না করলেও চলবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে চলমান এসআই নিয়োগ প্রক্রিয়াতে এ সুপারিশ বাধা হবে না।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারে উদ্যোগ নেয়। গঠন করা হয় সংস্কার কমিশন। ওই কমিশন কয়েক দফা বৈঠক করেছে। তাছাড়া পুলিশ সদর দপ্তরও ৩৯টি বিষয়ে প্রস্তাবনা দিয়েছে কমিশনের কাছে। তবে কমিশনের সুপারিশগুলো আমলে নেওয়া হবে কি না, তা নির্ভর করবে সরকারের ওপর। আগামী ৩১ ডিসেম্বর সংস্কার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানায়, খসড়া সুপারিশে মারণাস্ত্র হিসেবে পরিচিত চায়নিজ রাইফেল ব্যবহার করতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তবে আন্দোলন বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে পুলিশ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেডসহ অন্য সরঞ্জামাদি ব্যবহার করতে পারবে। এ ছাড়া হুটহাট গুলি করা যাবে না ও নিরপরাধ কাউকে আটক করা যাবে না। জনবান্ধব পুলিশ গড়ে তুলতে হবে। ব্রিটিশ আমলের আইনের ধারাগুলো পরিবর্তন করার উদ্যোগ থাকবে। একই সঙ্গে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের একাধিক সুপারিশ করছে কমিশন। পুলিশ কমিশনের প্রধান

থাকবেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। সংস্কার কমিশনের কয়েকজন সদস্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, কর্মসময় আট ঘণ্টা করার সুপারিশ করা হচ্ছে। বাতিল হবে না ‘পুলিশ নিবারণ আইন’। পুলিশ হেফাজতে কোনো ঘটনা ঘটলে তার দায় নিতে হবে পুলিশকেই। এ ছাড়া এসপি-ডিআইজি নিয়োগে কোনো এমপি-মন্ত্রীদের চাহিদাপত্র (ডিও লেটার) বন্ধ করার প্রস্তাব ও রাজনৈতিক তদবির হলেই পদোন্নতি বাতিল করা সুপারিশ করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে পুলিশের সংস্কার কমিশনের প্রধান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব সফর রাজ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কমিশনের কাজ শুরু হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। জনবান্ধব পুলিশ গঠন করতে যা যা করা দরকার সেই সুপারিশ করা হবে। সবার মতামত নিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবনাগুলোও আমরা পর্যালোচনা করছি। পুলিশও চাচ্ছে জনবান্ধব পুলিশ গঠন করতে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে পুলিশের ভূমিকা নেতিবাচক হওয়ায় পুলিশের অন্য সদস্যরাও বিব্রত।’ তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুলিশ যেমন কার্যপরিকল্পনা করে, আমরাও তেমন একটি সুপারিশ করব। ব্রিটিশ আমলের আইনের কিছু ধ্যান-ধারণা বাদ দিয়ে কীভাবে জনবান্ধব পুলিশ হতে পারে, সেদিকে জোর দেওয়া হচ্ছে। জুলাই-আগস্টে পুলিশের যে ভূমিকা দেখা গেছে, ভবিষ্যতে যাতে সেরকম আর না ঘটে, তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।’

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, জুলাই-আগস্টের ভয়াবহ পরিস্থিতির পর পুলিশের ভেতর-বাইরে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। একশ্রেণি পুলিশ কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক লাঠিয়াল হিসেবে পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করার ঘটনায় ইমেজ সংকটে পড়ে পুলিশ। বদনাম ও মানুষের নেতিবাচক ধারণার মুখোমুখি হয়ে অনেক পুলিশ সদস্য চাকরিতে যোগ দেননি।

জানা গেছে, কমিশন গঠনের পর গত ৩১ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য সচিব আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত এক ‘জনমত জরিপ বিজ্ঞপ্তি’ জারি করা হয়। ‘কেমন পুলিশ চাই’ শীর্ষক মতামতের জন্য সাধারণ নাগরিকদের কাছেও মতামত চায় পুলিশ সংস্কার কমিশন। পুলিশের বাইরেও অনেকে ব্যক্তিগতভাবে কমিশনে লিখিতভাবে নানা ধরনের প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। আইনি কাঠামো সংস্কার, পুলিশের জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ, পুলিশের পেশাদারি দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পুলিশের কল্যাণসংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে সংস্কার কমিটি কাজ করছে।

নাম প্রকাশ না করে কমিশনের কয়েকজন সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, খসড়া প্রস্তাবনা প্রায় গুছিয়ে আনা হচ্ছে। কমিশনের সদস্যরা নানা প্রস্তাব দিচ্ছেন। সুশীল সমাজ, গণ্যমান্য ব্যক্তিসহ নানা পেশার লোকজন পুলিশ সংস্কারের জন্য মতামত দিচ্ছেন। সবার মতামত আমলে নেওয়া হচ্ছে। তারা আরও বলেন, পুলিশ সদস্যদের সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে অভ্যন্তরীণ তদারকি সুসংহতকরণ, পুলিশের অপেশাদার কর্মকাণ্ড রোধ, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আইনের আলোকে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিতের লক্ষ্যে পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা শাখাকে সুবিন্যস্তকরণ, নারীদের যৌন হয়রানি, জেন্ডার বৈষম্য করাসহ অপেশাদার আচরণ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা, চাকরিবিধি যাতে যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা, আধুনিক দক্ষতামাপক সূচক নির্ণায়নের মাধ্যমে পুলিশের কাজের মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ থাকবে।

কমিশনের অপর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, আমরা অতীতে দেখেছি পুলিশকে রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ে রেখে দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশ যাতে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারে, আমরা সে বিষয়ে সুপারিশ করবো। এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কমিশন সদস্যদের সভাতেও বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত চাকরিতে পুলিশ ভেরিফিকেশনে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই তুলে দিতে। বর্তমানে আধাসরকারি কিংবা ব্যাংকের চাকরির জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশন করতে হয়। ১৮৬১ সালের ৫ নম্বর আইনে পুলিশ পরিচলিত হচ্ছে। তাছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধি (১৮৯৮ সালের ৫ নম্বর আইন), সাক্ষ্য আইন (১৮৭২ সালের ১ নম্বর আইন), পুলিশ প্রবিধানমালা বেঙ্গলসহ (১৯৪৩) অন্যান্য আইনে কার্য সম্পাদন করে থাকে পুলিশ। সবকটি আইনই ব্রিটিশ আমলের। এসব আইন পরিবর্তন করা জরুরী হয়ে পড়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিকভাবে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলো পুলিশের কোন কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তাহলেই দেখা যাবে পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আছে তা আর থাকবে না, হবে জনবান্ধব পুলিশ।  

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুর মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের সংস্কার করতেই হবে। কমিশন ভালো প্রস্তাব দেবে বলে আমি মনে করছি। ওয়ান ইলেভেনের সময় পুলিশের সংস্কার করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি। ২০০৯ সালেও চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সরকার বিষয়টি ভালোভাবে না নেওয়ায় তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ২০১৩ সালে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতাদের অন্যায় আবদার না মানলে তাদের জন্য চাকরি সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। আবার একশ্রেণির পুলিশ সদস্য লোভের কারণে বা ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে অপকর্ম করে থাকে। সেখানেও কঠোর জবাবদিহি থাকতে হবে।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত