সাময়িক বরখাস্তের (সাসপেন্ড) ৬ মাসের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি করার বিধান রয়েছে। এর মধ্যে সমাধান না পেলে বিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তি অব্যাহতি পেয়ে যান। কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মচারী মো. আব্দুর রশিদ সাময়িক বরখাস্ত আছেন ৬৭ মাস ধরে। চাকরি ফিরে পেতে তিনি মেয়র থেকে শুরু করে নগর ভবনের ‘প্রভাবশালী’ কর্মকর্তা-কর্মচারী কাউকে অনুরোধ করতে বাদ রাখেননি।
প্রতিকার না পেয়ে গিয়েছিলেন উচ্চ আদালতেও। কিন্তু কর্তাদের আশ্বাসে সেই মামলা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ওপর মহলে ধরনা দিতে দিতে কেটে যাচ্ছে কর্মজীবনের প্রায় ৬ বছর। চাকরির বয়স আছে আর মাত্র ৫ থেকে ৬ বছর। এই সময়ে ‘মিথ্যা অভিযোগ’ থেকে দায়মুক্তি নিয়ে অবসরে যেতে পারলেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে বাকি জীবন সম্মানের সঙ্গে কাটাতে পারবেন বলে মনে করেন আব্দুর রশিদ।
কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই বছরের পর বছর তার চাকরি ঝুলিয়ে রেখেছে ডিএনসিসি। এর ফলে মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। পরিবার-পরিজনের কাছেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছেলেমেয়ে এবং ঘরে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
সম্প্রতি ডিএনসিসি নগর ভবনে দেখা হয় আব্দুর রশিদের সঙ্গে। হাতে ফাইল, যাতে অসংখ্য কাগজ। আলাপ করতে করতে ফাইল থেকে একে একে বের করেন বরখাস্ত হওয়ার আদেশ থেকে শুরু করে নানা কাগজপত্র। কোনোটা তার পক্ষে, আবার কোনোটা তার বিপক্ষে। এসব কাগজ নিয়ে যখন যার কাছে পারছেন, ধরনা দিচ্ছেন সাময়িক বরখাস্ত এই কর্মচারী।
আক্ষেপ করে আব্দুর রশিদ বলেন, ‘নিয়ম মেনে তদন্ত করলে এতদিনে আমার চাকরি ফিরে পাওয়ার কথা। যদি আমাকে চাকরি ফিরিয়ে না দেওয়া হয়, তাহলে এটার সমাধান করত। কিন্তু কিছুই করছে না। যার জন্য আমি অন্য কোনো কাজও করতে পারছি না। আত্মীয়স্বজন এবং পরিবারের মানুষের কাছেও লজ্জিত হতে হচ্ছে।’
ধরে আসা গলায় তিনি আরও বলেন, ‘আমার তিন ছেলেমেয়ে। তারা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। ঘরে ৮১ বছর বয়সী অসুস্থ মা। তার ওষুধপত্র, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ এবং সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমি মেয়র থেকে শুরু করে সব স্যারকে অনুরোধ করেছি যাতে আমার ওপর অন্যায় না করা হয়।’
সাময়িক বরখাস্তের পর অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে সুস্পষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া আছে চাকরি বিধিমালায়। ঢাকা পৌর করপোরেশনের কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ১৯৮৯ এর ৪৩ (৮) বিধিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অভিযোগ সম্পর্কে অবহিত করার পর একশত আশিটি কার্যদিবসের মধ্যে এই বিধির অধীনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কর্র্তৃপক্ষ ব্যর্থ হইলে, অভিযুক্ত ব্যক্তি তাহার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ হইতে আপনা হইতেই অব্যাহতি পাইয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৫ সালে অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে ‘লেজার কিপার’ হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন আব্দুর রশিদ। বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করে ২০১২ সালে ডিএনসিসির অঞ্চল-৩ (মহাখালী)-এ লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ওই বছরের ১৬ এপ্রিল সাময়িক বরখাস্ত হন। এরপর ২০২০ সালের জানুয়ারি এবং ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে দুই দফা অভিযোগের তদন্ত করা হয়।
অভিযোগ প্রসঙ্গে আব্দুর রশিদ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ৯টি ট্রেড লাইসেন্সের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তদন্ত করে ৪টি অভিযোগের কোনো সত্যতা পায়নি। ৫টি ট্রেড লাইসেন্সের ফি জমা দিতে বিলম্ব হয়। কিন্তু ওই টাকাও ডিএনসিসির ফান্ডে ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল চালানের মাধ্যমে জমা করা হয়েছে। এরপর আমার বিরুদ্ধে আর কোনো অভিযোগ থাকার কথা না।’
ট্রেড লাইসেন্সের ফি জমা দিতে বিলম্ব ইচ্ছেকৃত নয় দাবি করে তিনি বলেন, ‘এই বিলম্বটি আমি ইচ্ছা করে করিনি। হাজার হাজার ট্রেড লাইসেন্স করতে হতো। কাজের ব্যস্ততার কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে এই টাকাগুলো জমা দেওয়া হয়নি। এটা কর্র্তৃপক্ষও বোঝেন। সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে একাধিকবার মেয়র, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু কেউ আমাকে সহযোগিতা করেননি।’
আব্দুর রশিদ বলেন, ‘সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর ২০১৯ সালের ৭ মে উচ্চ আদালতে যাই। সেখানে এই আদেশ স্থগিত করা হয়। তখন তৎকালীন মেয়র আতিকুল ইসলাম ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার মৌখিক আশ্বাসে ২০২১ সালের জুন মাসে মামলা প্রত্যাহার করে নিই। কিন্তু কোনো সুরাহা না হওয়ায় আবারও উচ্চ আদালতের দারস্থ হই।’
জানা গেছে, গত ১২ জুন উচ্চ আদালত এক রিটের (রিট পিটিশন নম্বর-৬১৪৯/২০২৪) পরিপ্রেক্ষিতে আব্দুর রশিদের চাকরি কেন ফিরিয়ে দেওয়া হবে না মর্মে রুল জারি করে। চার সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়। কিন্তু চার মাস পেরিয়ে গেলেও সিটি করপোরেশন এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএনসিসির সচিব মোহাম্মদ মাসুদ আলম সিদ্দিকী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি দীর্ঘদিনের মামলা। তদন্ত হয়েছে, বিভিন্ন কারণে নিষ্পত্তি হয়নি। উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। একটি ট্রেনিংয়ে থাকার কারণে বিষয়টির সর্বশেষ অবস্থা আমার জানা নেই।’
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আব্দুর রশিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও, ঢাকা পৌর করপোরেশন কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ১৯৮৯ এর ৪৫(২), ৪২(৪) ও ৪৩ (৮) অনুসরণ করা হয়নি। কাজেই আইন অনুযায়ী বর্তমানে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। তাকে সব সুবিধাসহ চাকরিতে ফিরিয়ে দেওয়া সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এমএ আজিজ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো কর্মচারীকে এত বছর সাময়িক বরখাস্ত করে রাখার নিয়ম নেই। মেয়ররা দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আইনবিধির কোনো তোয়াক্কা করে না। কোনো কর্মচারীর প্রতি বিরাগভাজন হয়ে, তাকে হেনস্তা করার জন্যই এমন করা হয়ে থাকে।’
এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘এটা স্রেফ তার (আব্দুর রশিদ) প্রতি অত্যাচার করা হচ্ছে। সব সুযোগ-সুবিধাসহ তার চাকরি কেন ফিরিয়ে দেওয়া হবে না এ নিয়ে উচ্চ আদালতও রুল জারি করেছে। চার সপ্তাহের মধ্যে সিটি করপোরেশনকে জবাব দিতে বলা হলেও আমার জানামতে এখনো জবাব দেয়নি।
