ঘাটতি ব্যাংক ঘাটতি বাজেট

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৪, ০২:৪৩ এএম

ছয়টি দুর্বল ব্যাংককে ২২,৫০০ কোটি টাকার সহায়তা ঋণ দিয়ে সরকার (বাংলাদেশ ব্যাংক) দুটি বড় ভুল করেছে। এতে করে ভালো ব্যাংকগুলো অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, যা তাদের খোলাবাজার অর্থনীতির একটি মৌলিক নীতি, তা বরখেলাপ হলো। দ্বিতীয়টি শুধু ভুল নয়, রীতিমতো অন্যায়। কথা ছিল দুর্বল ব্যাংকগুলো সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হবে। সেটি হলো না। কিন্তু দুর্বল ব্যাংকগুলো যেসব কারণে দুর্বল তার কোনো পর্যাপ্ত আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আগে এ ধরনের সহায়তা পুরো অর্থনৈতিক সুবিধাভোগীদের কাছে ত্রুটিযুক্ত বার্তা দেবে। ব্যাংকগুলো সরকারি বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ফলে এগুলোর সেবার ধরন হচ্ছে ‘জনসেবামূলক’। তাই এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ম ও আচরণ হবে অনেক সুশৃঙ্খল ও আইনসম্মত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর কীভাবে বলেন, এক হাতে টাকা দিয়ে আরেক হাতে টাকা তুলে নেবেন? এই চেষ্টা তো বিগত আওয়ামী লীগ সরকার করেছিল। তারা প্রায় ২ লাখ কোটি টাকা ছেপে বাজারে ছেড়েছিল, নানা স্থানে খরচ জুগিয়েছিল। আবার সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করে জনগণকে সান্ত্বনা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল অনেক বেশি। সে সময় জুলাই মাসে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে দেশে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও গত ১৬ বছরের মধ্যে রেকর্ড ছাড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি প্রথমবারের মতো দুই অঙ্ক টপকে ১১.৬৬ শতাংশ হয়, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ১৪.১ শতাংশ। আবার বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয় ১২ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ে ছিল ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ। অক্টোবরে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি নয় দশমিক ৩৪ শতাংশে ঠেকে, যা তার এক মাস আগে ছিল নয় দশমিক ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশের নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ প্রায় দুই বছর ধরে ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে টাকা ছাপিয়ে ব্যাংকগুলোকে, যারা কিনা লুটপাটের সঙ্গে কমবেশি জড়িত ছিল তাদের সহায়তা করা উচিত হয়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, যারা দীর্ঘদিন এসব ব্যাংকে চরকির মতো ঘুরে ঘুরে হতাশ হয়ে টাকা পাননি, তারা টাকা পাওয়া মাত্র ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রী কিনবেন এবং তাতে করে মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাবে। আর ব্যাংকগুলো যদি সরকারের বন্ড কিনে টাকা ফেরতই দেয় তাহলে তারা তারল্য সংকটে ভুগছে কেন? কোন টাকা দিয়ে তারা বন্ড কিনবে, এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ডিসট্রেসড অ্যাসেট বা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে শে^তপত্র প্রণয়ন কমিটি সূত্র একটি বাংলা দৈনিককে জানিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ অনেক বেশি। কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই  দৈনিককে জানিয়েছেন শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ হতে পারে প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক যে তথ্য দিয়েছে, শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ তার থেকে ঢের বেশি। আমাদের মনে রাখতে হবে, এ দেশে প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা অনেক বেশি।

ব্যাংকের দুর্বল হয়ে পড়া ও পুনরায় সবল হয়ে দুষ্টলোকদের ঋণ দেওয়া

পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় প্রকৃত সম্পদের বিপরীতে স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ারের মূল্য যেমন কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়, একইভাবে সরকারি ব্যাংকগুলোর বা যেসব ব্যাংকে রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত আছেন বা ছায়া প্রদান করছেন সেখানে সক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি ঋণ ইস্যু করা হয়। আবার দুর্বল ম্যানেজমেন্টওয়ালা ব্যাংকেও এই ঘটনা ঘটতে পারে এবং এতে করে কয়েক দশক পরে ব্যাংক ও শেয়ারবাজারে ধস নামে। আর সরকার জবপধঢ়রঃধষরংধঃরড়হ করে সেই ধস ঠেকানোর চেষ্টা করে। এভাবে এই দুষ্ট চক্রটি চলতেই থাকে। অর্থাৎ কিছু ব্যাংক তাদের সক্ষমতার চেয়ে বেশি ঋণ ইস্যু করবে, যা খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে দেবে, তারপর যাত্রাপালার মতো দৃশ্যে আসবে বাংলাদেশ ব্যাংক (বিবেক)। এসে দুর্বল ব্যাংকে পুঁজি সরবরাহ করবে। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি! এ তো গেল ব্যাংকের দুরবস্থার কথা। এবার ২০২৩-২৪ সালের সামগ্রিক বাজেটের অবস্থা জেনে নিই। গেল অর্থবছরে বাজেটে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছিল ৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে আয় ৪ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য সূত্র থেকে রাজস্ব কর ধরা হয়েছিল ৭০ হাজার কোটি টাকা। আরও লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে এনবিআর বহির্ভূত ২০ হাজার কোটি টাকা ও কর ব্যতীত প্রাপ্তি ৫০ হাজার কোটি টাকা ইত্যাদি।

কিন্তু সে সময় বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছিল, যা জিডিপির ৫ দশমিক ২ শতাংশ। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ৬ হাজার ৩৯০ কোটি ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা আহরণ করা হবে। আর অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৩২ হাজার ৩৯৫ কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে ২৩ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সংস্থান করার কথা ছিল। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে আবুল মাল আবদুল মুহিত স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের সময় ৩০ জুন, ১৯৮২ সলে বাজেটে বলেছিলেন, ১৯৮২-৮৩ অর্থবছরে মোট বাজেটের আকার ৪,৭৩৭.৬৩ কোটি টাকা, মোট আয় ২,৬৬৭.৮২ কোটি টাকা, মোট ঘাটতি ১,৯৬৯.৮১ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়গুলোতে ২০১৮ সালে আবুল মাল আবদুল মুহিতের বাজেটে, ২০১৮ সালে (২০১৮-১৯ অর্থবছরে) মোট বাজেট ছিল ৪,৬৪,৫৭৩ কোটি টাকার, মোট আয় ৩,৪৩,৩৩১ কোটি টাকা আর সামগ্রিক ঘাটতি ১,২১,২৪২ কোটি টাকা। এরপর, আ হ ম মুস্তফা কামালের ২০২৩ সালে যখন ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেট দেন, তখন মোট বাজেট ছিল ৭,৬১,৭৮৫ কোটি টাকার যেখানে মোট আয় ৫,০৩,৯০০ কোটি টাকা আর সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছিল ২,৬১,৭৮৫ কোটি টাকা।

আবার ফিরে আসি ব্যাংক প্রসঙ্গে

ব্যাংক একীভূত বা প্রয়োজনে অবসায়ন করা পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার একটি সর্বজনীন বাস্তবতা : একটি ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার চেয়ে অধিক পরিমাণে ঋণ দিলে ব্যাংকটি সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বাংলাদেশে ঈধঢ়রঃধষ অফবয়ঁধপু জধঃরড় বা মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত ১৩ শতাংশের কম। অর্থাৎ, কোনো ব্যাংক বিপদে পড়লে তার পতন প্রায় অনিবার্য। কিন্তু জোর করে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে ব্যাংক। এর কর্তাব্যক্তিরা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছেন। কই তাদের ব্যক্তিগত ঘুষের টাকা, যারা ঘুষ খেয়ে বটগাছ হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্র টাকা নিয়ে ওই দুর্বল ব্যাংকগুলোকে দিল না কেন? ব্যাংকের তারল্য সংকট কাটাতে একাধিকবার তাদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাই প্রথমেই ব্যাংকের দুর্বলতা রুখতে হবে।

এ জন্য ব্যাংকের বোর্ড ও ম্যানেজমেন্টকে পৃথক করে দিতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে প্রয়োজনে আইন পাস করতে হবে। অর্থঋণ আদালতকে আরও শক্তিশালী ও কার্যকরী করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে সত্যি সত্যি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। কারও গচ্ছিত টাকা অন্য কাউকে ঋণ দেওয়ার আগে টাকার মালিকের অনুমতি নেওয়া (তিনি ওই ব্যক্তি/কোম্পানিকে ঋণ দিতে সম্মত আছেন কি না)। ব্যাংকগুলো মানুষের গচ্ছিত টাকা কোথায় বিনিয়োগ করছে, তা সংশ্লিষ্ট আমানতকারীদের জানাতে হবে। ব্যাংকগুলো (ঋণ ইস্যুর মাধ্যমে) যে অর্থ তৈরি করতে পারে সেই দায়িত্বটি একটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর ন্যস্ত করা। সামান্য অর্থ পরিশোধ করে ঋণ রি-শিডিউলিং বন্ধ করতে হবে। এটি একটি শুভঙ্করের ফাঁকি! এক পরিবারের থেকে মাত্র একজন পরিচালক, স্বাধীন ও পেশাদারি পরিচালকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। এই খেলাটি বন্ধ করতে হবে যে একবার দুর্বল ব্যাংক ঋণ সহায়তা পাবে, আবার বাজেট ঘাটতিতে সরকার ব্যাংকগুলোর কাছে হাত পাতবে। এ জন্য ঋণ সংস্কৃতি ও ব্যাংকারসহ সুবিধাভোগীদের মানসিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে। সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কঠোর আইন প্রয়োগ না থাকলে অর্থ লোপাট, টাকা পাচার বন্ধ করা দুরূহ এবং ফলে ব্যাংক দুর্বল হয়ে যাওয়া বন্ধ হবে না।

একটি-দুটি দুর্বল ব্যাংক বন্ধ করে দৃষ্টান্ত রাখা উচিত

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাব খাটিয়ে লুটপাটের কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারী, ব্যবসায়ী ও গরিব এবং চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত আমানতকারীকে ব্যাপক ভুগতে হয়। অথচ ব্যাংকগুলো কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যায়। আর যখনই টাকা ছাপিয়ে তাদের সহায়তা দেওয়া হয়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যালান্সশিট আকারে বেড়ে যায়, তার সম্পদ ও দেনা দুটোই প্রসারিত হয়। যেহেতু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো খড়ধহধনষব ঋঁহফ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঋণ সরবরাহ করে থাকে, পরিশেষে দেখা যায়, তারা আবার তারল্য ঘাটটিতে পড়ছে। এভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক চাপের মধ্যে পড়ে, আবারও টাকা ছাপে যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়। দিন শেষে সরকারের কোষাগারে ঘাটতি বাড়তে থাকে (এদিকে যেহেতু রাজস্ব আদায়ও কম হচ্ছে)। বিগত সরকারের সময়ে হুবহু তাই হয়েছে। দিনে দিনে তাদের ঘাটতি গগনচুম্বী হয়েছিল।

এ ধরনের ঘাটতি কমাতে ব্যাংক মার্জার বা প্রয়োজনে বন্ধ করে দিতে হবে, না হলে এর দায়ভার পরবর্তী সরকারের ওপর পড়বে। বাড়াতে হবে রাজস্ব আদায়। রাজনৈতিক সরকার আসার পর তারা টাকা ছাপানোর তথ্য গণমাধ্যমকে সহজে নাও দিতে পারে। দুর্বল ব্যাংকগুলো ঋণ পরিশোধ ঠিকমতো না করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তার নেট ইকুইটি হ্রাস পেতে পারে। এ ছাড়াও নৈতিক বিপদের সম্ভাবনা থেকে যায়। ঘন ঘন ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করা হলে তারা মনে করে সরকার তো আছে, ফলে তাদের নিরাপত্তা জাল তাদেরকে রক্ষা করবে। সরকারের উচিত ছিল অতি দুর্বল ব্যাংক দু-একটি বন্ধ করে দিয়ে একটি নজির স্থাপন করা। সরকার পপুলিস্ট রাজনীতির দিকে হাঁটল।

লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত