সিরিয়ায় কি বৃহত্তর পালাবদলের সূচনা হলো?

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:০০ এএম

কয়েক মাস ধরে সবার নজর ছিল লেবানন, গাজা ও ইউক্রেনের দিকে। একনায়ক বাশার আল-আসাদের তখত উল্টে দেওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগটি সিরিয়ার বিদ্রোহীরা হাতছাড়া করেনি। উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় বিদ্যুৎগতিতে আচমকা আক্রমণ শুরু করার মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তারা আলেপ্পো দখল করে নিয়েছে এবং পৌঁছে গেছে হামা’র উপকণ্ঠে!

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে গত এক দশকে এটাই বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে রাশিয়া এবং ইরানের সযত্নে নির্মিত ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনা এলোমেলো করে দিতে পারে। অন্যদিকে বিদ্রোহীরা আলেপ্পো ও হামা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে অনেকটাই কাবু হয়ে পড়বেন বাশার আল-আসাদ। ফলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও ইসরায়েল।

ফিরে দেখা সিরিয়া গৃহযুদ্ধ

তিউনিসিয়া ও মিসরে একনায়কত্বের অবসান হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য জুড়েই আরব বসন্তের হাওয়া সঞ্চারিত হয়। টিভিতে আন্দোলনের খবর দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের প্রদেশ দারা’তে স্কুলপড়ুয়া কিছু কিশোর দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকে : জনগণ এই সরকারের পতন চায়। এটা ছিল মূলত আসাদ পরিবারের রাজত্বের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। গ্রাফিতি আঁকার অপরাধে নিরাপত্তা বাহিনী ১৫ জন কিশোরকে তুলে নিয়ে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন করে। বেদম পেটানোর পর কিশোরদের নখ উপড়ে ফেলা হয় এবং তাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ইলেকট্রিক শক দেয় গুপ্ত পুলিশ। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রতিটি শহরে ক্ষুব্ধ মানুষ মিছিল করে প্রতিবাদ জানায়। বিক্ষোভ দমনে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ সেনাবাহিনীকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন। যার প্রতিক্রিয়ায় সিরিয়ায় শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক পরাশক্তির পাশাপাশি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

বিদ্রোহীদের শক্ত ঘাঁটি ছিল সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেপ্পো। ২০১৬ সালে সিরিয়া সরকার এটি দখল করতে সক্ষম হয়। তীব্র রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি। আকাশ থেকে প্রবল বোমাবর্ষণ করে সহায়তা দিয়েছিল রুশ যুদ্ধবিমান। এরপর আলেপ্পোর বাসিন্দাদের বড় অংশকে নগরী থেকে বের করে দিয়ে বাশার আল-আসাদের অনুগত ও বিশ্বস্ত লোকদের সেখানে পুনর্বাসিত করা হয়।

গত ১৩ বছরে কমপক্ষে ছয় লাখ নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে। উদ্বাস্তু হয়েছে ৭০ লাখের বেশি মানুষ। ২০২০ সালে সিরিয়ার বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি সমঝোতা কার্যকর হয়। মধ্যস্থতা করে রাশিয়া ও তুরস্ক। যদিও নিজেদের স্বার্থরক্ষায় তারা ভিন্ন দুটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন করছে।

সাম্প্রতিক অভিযানের মধ্য দিয়ে বিদ্রোহীরা দীর্ঘ আট বছর পর আলেপ্পো উদ্ধার করেছে। এই সংবাদ শুনে উদ্বাস্তু বাসিন্দাদের অনেকেই আপন ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন।

দাবার বোর্ডে কোন ঘুঁটি কার পক্ষে

আলেপ্পোর সীমান্তবর্তী প্রদেশ ইদলিবের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে সশস্ত্র গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম। একসময় তারা আল-কায়েদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও হায়াত তাহরির আল-শাম বর্তমানে অপেক্ষাকৃত উদার মতাদর্শের গোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করার চেষ্টা করে থাকে। ২৭ নভেম্বর তারা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কামিকাজি ড্রোন দিয়ে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। অপ্রত্যাশিত আক্রমণের তোপ ঠেকাতে না পেরে বাশার আল-আসাদের সিরীয় আরব আর্মি অনেক জায়গায় বিনা প্রতিরোধে পিছু হটে। যেমন, কুয়েইরিস বিমান ঘাঁটিতে তারা প্রচুর ভারী অস্ত্রসমেত বিদ্রোহীদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মিগ-৮ হেলিকপ্টার, স্ট্রেলা-১০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং এস-২০০ বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা।

সিরীয় আরব আর্মির ছেড়ে যাওয়া বিস্তীর্ণ অঞ্চল কুর্দিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। কুর্দিদের আরও পূর্বদিকে ঠেলে দিতে এগিয়ে আসে সিরিয়া ন্যাশনাল আর্মি (এসএনএ)। ১ ডিসেম্বর বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর এই জোট দখল করে নেয় আলেপ্পো ও তুরস্ক সীমান্তের মধ্যখানে অবস্থিত শহর তেল রিফাত। কৌশলগত দিক দিয়ে শহরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৬ সালের পর থেকে এই এলাকা ছিল সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) নিয়ন্ত্রণে। এটি মূলত কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠী পিপলস ডিফেন্স ইউনিটস (ওয়াইপিজি) এবং কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-র জোট। এসডিএফকে পৃষ্ঠপোষকতা করছে যুক্তরাষ্ট্র। বাশারের সৈন্যদের পাল্টা আক্রমণ থেকে এসডিএফকে বাঁচাতে মার্কিন যুদ্ধবিমানের তৎপরতা গত কয়েকদিনে দেখা গেছে।

কিন্তু তুরস্ক সরকারের দৃষ্টিতে ওয়াইপিজি ও পিকেকে সন্ত্রাসী সংগঠন। জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার খাতিরে তুরস্ক কুর্দিদের চাপে রাখতে চায়। তাই তারা সমর্থন দেয় সিরিয়া ন্যাশনাল আর্মিকে। এদিকে হায়াত তাহরিরের সঙ্গে এসএনএ’র দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। মতাদর্শের পার্থক্য এবং পরস্পরের নিয়ন্ত্রণ বলয় বাড়ানোর সাংঘর্ষিক কৌশলই দ্বন্দ্বের নেপথ্য কারণ। তবে পুরনো বিবাদ মিটিয়ে তারা এবার হাত মিলিয়েছে বাশার আল-আসাদকে ধরাশয়ী করার জন্য।

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ছাড়াও সিরিয়াতে বিভিন্ন দেশের সেনাদল সক্রিয় রয়েছে। ইদলিব, আফরিন ও ফোরাত নদীর পূর্বাঞ্চলে তুরস্কের সৈন্যরা, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে তিন হাজার রুশ সৈন্য এবং উত্তর-পশ্চিম অংশে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৯০০ সৈন্য অবস্থান করছে। মার্কিন সামরিক জোট সিরিয়ায় প্রবেশ করে ২০১৫ সালে। তাদের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল আইসিসকে দমন করা। এক বছরের মাথায় দেখা গেল, ফোরাত নদীর দক্ষিণে সিরিয়া, ইরাক ও জর্ডান এই তিনটি দেশের মধ্যবর্তী সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত মহাগুরুত্বপূর্ণ আল-তানফ সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিনিরা শক্তভাবে থিতু হয়ে বসেছে। তেহরান থেকে দামেস্ক বা বৈরুত অভিমুখী যে-কোনো গতিবিধির ওপর এই ঘাঁটি থেকে অনায়াসে নজরদারি করা যায়। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশন থেকে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্নেল ড্যানিয়েল ম্যাগ্রুডার জানান, আল-তানফ ঘাঁটিতে য্ক্তুরাষ্ট্র তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। তবে এই ঘাঁটিতে আস্তানা গাড়ার মূল লক্ষ্য সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করা ছিল না। বরং আমেরিকা আল-তানফ থেকে পশ্চিম এশিয়ায় তার দূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। ২০১৮ সালে সিরিয়া তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া ইসরায়েলের একটি এফ-১৮ যুদ্ধবিমান গুলি করে ভূপাতিত করে। তারপর থেকে লেবানন বা অধিকৃত গোলান মালভূমি দিয়ে কোনো ইসরায়েলি বিমান সিরিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশের দুঃসাহস করেনি। বর্তমানে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান জর্ডান-সিরিয়া সীমান্ত দিয়ে সিরিয়ায় আক্রমণ করে। সিরিয়া সরকারের অভিযোগ রয়েছে, এ ঘাঁটি থেকে ইসরায়েলকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সরবরাহ করা হয়। যা কাজে লাগিয়ে তারা সিরিয়ার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে হামলা চালায়। ২০২১ সালে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও (দ্য ফিউচার অব আল-তানফ গ্যারিসন ইন সিরিয়া) এই অভিযোগের সত্যতা মেলে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের অপারেশন ট্রু প্রমিস-এর সময়ও আমেরিকা আল-তানফ ঘাঁটি থেকে ইরানি ড্রোন ও মিসাইল ভূপাতিত করেছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে একাধিকবার সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন। তৎকালীন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন স্পষ্টভাবে বলেন, সিরিয়া থেকে আমেরিকা সৈন্য প্রত্যাহার করলেও আল-তানফে তাদের কিংবা রাশিয়ার উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।

ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ জটিলতর হচ্ছে

বাশার আল-আসাদের ঘনিষ্ঠ মিত্ররা নিজেদের সংকট মোকাবিলায় ব্যস্ত। ইউক্রেন ও ন্যাটোকে পরাস্ত করার লক্ষ্যে রাশিয়া প্রায় তিন বছর ধরে লড়ছে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে হিজবুল্লাহ তাদের যোদ্ধাদের সিরিয়া থেকে সরিয়ে নিয়েছে। ইরানও তাদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সৈন্যদের বড় অংশকে ধাপে ধাপে সম্মুখসারি থেকে ফিরিয়ে আনে। মূলত মিত্রদের ওপর নির্ভর করে দেশের ৭০ ভাগ এলাকার ওপর এতদিন নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন প্রেসিডেন্ট বাশার।

জুলাই মাসে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বাশারের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সিরিয়া থেকে ৪৭ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে তুরস্কে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের সিরিয়ায় ফেরত পাঠাতে তুরস্ক নানাভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে প্রেসিডেন্ট বাশার রাখঢাক না রেখে সরাসরি জানিয়ে দেন, দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন করতে চাইলে তুরস্ককে তার সৈন্যদের সরিয়ে নিতে হবে। কুর্দি যোদ্ধাদের নিয়ে সদা ব্যতিব্যস্ত ইস্তাম্বুল স্বাভাবিকভাবেই দামেস্কের এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি। যে কারণে এখন প্রশ্ন উঠেছে, হায়াত তাহরির এই অভিযান চালানোর ব্যাপারে ইস্তাম্বুল থেকে সবুজ সংকেত পায়নি তো? আর এরদোয়ান যদি কলকাঠি নাও নাড়েন, বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের অগ্রাভিযান তুরস্কের জন্য সুসংবাদ। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিতে পারেন। পশ্চিম এশিয়ার রণক্ষেত্রে মার্কিনিদের সশরীরে অনুপস্থিতি তুরস্কের সামরিক অবস্থানকে নিশ্চিতভাবেই দৃঢ় করবে।

পক্ষান্তরে জোর ধাক্কা খেয়েছে রাশিয়া। সিরিয়ায় তাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ২০১৬ সালে আলেপ্পো বিজয়াভিযান। তখন থেকেই সিরিয়ার রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ককে টপকে রাশিয়া বনে যায় সবচেয়ে জাঁদরেল মহাজন। আলেপ্পো হাতছাড়া হওয়া তাই সামরিক ব্যর্থতা নয় বরং রুশ মোড়লিপনার প্রতি গুরুতর চ্যালেঞ্জ।

বিদ্রোহীরা এই মুহূর্তে হামা দখলের উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে লড়াই চালাচ্ছে। সফল হলে তারা উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে সক্ষম হবে। রুশদের জন্য যা মারাত্মক হতে পারে। কেননা হামা থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তারতাস। ভূমধ্যসাগরে সামরিক ও বাণিজ্যিক গতিবিধি বাড়াতে রুশরা সেখানে নৌ-ঘাঁটি গড়ে তুলেছে। আর তারতাস থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরের শহর হোমস-এর দিকে বিদ্রোহীরা অগ্রসর হলে ঝুঁকির মুখে পড়বে লাটাকিয়া। নিকটবর্তী খোমেইমিমে রয়েছে বিলুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে বৃহত্তম রুশ বিমান ঘাঁটি। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রতাপ অক্ষুণœ রাখার জন্য যা অপরিহার্য। তাই বিদ্রোহী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো তারতাস কিংবা লাটাকিয়ায় পৌঁছে গেলে সিরিয়া থেকে রুশদের তল্পিতল্পাসহ বিদায় নিতে হতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধও তাদের বেকায়দায় ফেলেছে। বসফরাস দিয়ে নৌ অভিযান ও পণ্য পরিবহন অব্যাহত রাখতে তুরস্কের মন জুগিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে রাশিয়া। সম্পর্কে ফাটল ধরলে তুরস্ক ইউক্রেনকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মারণাস্ত্র সরবরাহ করতে পারে, সেই সম্ভাবনাও তারা উড়িয়ে দিতে পারছে না।

ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আরেক পরত জটিল করে তুলবে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন। ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ট্রাম্প মস্কোকে প্রস্তাব দিতে পারেন দখলকৃত এলাকার ওপরে রাশিয়ার আধিপত্য মেনে নিচ্ছি, বিনিময়ে সিরিয়া থেকে ইরানকে হটাও এবং মার্কিন সেনা প্রত্যাহার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করো। পুতিনের জন্য সমস্যা হলো, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া যেভাবে ইরানের কাছ থেকে প্রযুক্তিগত ও সামরিক সহায়তা পেয়েছে, তাতে সিরিয়ায় ইরানের স্বার্থবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া তার জন্য ভীষণ মুশকিল হবে। ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার সময় নেতানিয়াহু বাশার আল-আসাদকে হুমকি দিয়েছিলেন এবং তার কয়েক ঘণ্টা পরই হায়াত তাহরির আল-শাম তাদের অভিযান শুরু করে। অনেক পর্যবেক্ষকই বিষয়টা পুরোপুরি কাকতালীয় মনে করছেন না।

বিদ্রোহীরা এই দফা সফল হলে সিরিয়ার প্রদেশগুলো একেক পরাশক্তি নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেবে। একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে সিরিয়া ছোট ছোট রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার তাগিদে ক্রুসেডারদের সঙ্গে আপস-সমঝোতা করে রাজ্যগুলোকে চলতে হতো। নুরুদ্দিন জেঙ্গির আবির্ভাবের আগ পর্যন্ত বৃহত্তর সিরিয়ায় অন্তর্কলহ ও অশান্তি লেগেই ছিল। তেমনটাই সম্ভবত আবারও ঘটতে যাচ্ছে। এর মাশুল গুনতে হবে সিরিয়ার সাধারণ মানুষকে। হাফিজ আল-আসাদের শাসনামলে চাপিয়ে দেওয়া জুলুমের প্রাচীর ভেঙে যারা ২০১১ সালে রাস্তায় নেমে এসেছিল বাকস্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারের দাবিতে তাদের মুক্তির স্বপ্ন ক্রমশ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচে তাদের জন্মভূমি আটকে গেছে কঠিন দুঃসময়ের চোরাবালিতে।

লেখক: অনুবাদক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত