অনাস্থা ভোটে সরকারের পতন, নতুন সংকটে ফ্রান্স

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৫:১৪ পিএম

পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে হেরে ক্ষমতা হারিয়েছেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী মিশেল বার্নিয়ে, এতে তার সরকারেরও পতন হয়েছে। বুধবার দেশটির আইনপ্রণেতারা ব্যাপকভাবে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন, এতে প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিয়োগ দেওয়ার তিন মাসের মাথায় বার্নিয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন। 

ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তির রাজনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বার্নিয়ের বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবে কট্টর ডানপন্থি ও বামপন্থি আইপ্রণেতারাও সমর্থন দেন, এতে প্রস্তাবটির পক্ষে ৩৩১ ভোট পড়ে।

এই ভোটাভুটির পর বার্নিয়েরকে এখন তার ও তার সরকারের পদত্যাগপত্র প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর কাছে পেশ করতে হবে। এর মাধ্যমে ১৯৫৮ সাল থেকে শুরু হওয়া ফ্রান্সের পঞ্চম রিপাবলিকে সবচেয়ে স্বল্পস্থায়ী হলো তার তিন মাস মেয়াদের সংখ্যালঘু সরকার।

ফ্রান্সের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালেই বার্নিয়ে তার ও তার সরকারের পদত্যাগপত্র জমা দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। বার্নিয়ে পার্লামেন্টে কোনো চূড়ান্ত ভোট ছাড়াই অজনপ্রিয় একটি বাজেটের অংশ বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে পাস করিয়ে নেন। পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই এর বিরুদ্ধে ছিল। 

প্রস্তাবিত বাজেটে ৬ হাজার কোটি ইউরো কর বাড়িয়ে এবং ব্যয় কাটছাঁট করে ফ্রান্সের বাড়তে থাকা বাজেট ঘাটতি কমানো লক্ষ্য নিয়েছিল। নভেম্বরে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৬৭ শতাংশ মানুষ এই বাজেটের বিরোধিতা করেছে। এই বাজেট পাস করাতে পার্লামেন্টে ভোটাভুটি এড়িয়ে বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করেই বার্নিয়ে অনাস্থা ভোটের মুখে পড়ার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। অতি বাম ও কট্টর ডানরা তাকে পার্লামেন্টের ভোটাভুটি এড়ানোর শাস্তিই দিল।

ফ্রান্সের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনীতি এখন দেশটির নাগরিকদের জন্যই শুধু গভীর উদ্বেগের নয়, বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ইউরোপে সম্ভাব্য অস্থিরতা তৈরির পেছনেও রয়েছে এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব।

ফ্রান্স ও জার্মানির অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এরই মধ্যে জোট হিসেবে ইইউকে প্রভাবিত করেছে। এ অবস্থায় সম্প্রসারণবাদী ও আক্রমণাত্মক ক্রেমলিনের সামনে নিজেদের শক্তি এবং ঐক্য বজায় রাখার প্রতিজ্ঞা ইউরোপ দেখাতে পারবে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।

দুই দেশের মধ্যে ফ্রান্সই শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে বিভক্ত ও লক্ষ্যচ্যুত নয়। সম্প্রতি জার্মানিতেও বৈরিতায় জড়ানো জোট সরকারের পতন হয়েছে। এর জেরে আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশটিতে আগাম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

১৯৬২ সালে জর্জে পম্পিদুর সময় থেকে ফ্রান্সের কোনো সরকার আর আস্থা ভোটে হারেনি। জুনে ম্যাক্রোঁ একটি আগাম নির্বাচন ডেকে ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংকটের সূচনা করেন। ওই জাতীয় নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠাতা কোনও দলই পায়নি। ফলে রাজনৈতিকভাবে বড় তিনটি ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে পার্লামেন্টের জাতীয় পরিষদ। এই বিভক্তি এড়িয়ে টেকসই সরকার গঠনের চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছিল বার্নিয়েকে।

তবে ফ্রান্সে প্রকৃত অর্থেই রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ হওয়ার দৃশ্যত লক্ষণ নেই। প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নতুন আরেকজনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেবেন। তবে এরপরও পার্লামেন্ট তিনটি রাজনৈতিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে থাকবে। সংস্কার ও নতুন বাজেট নিয়ে ব্লকগুলো একে অপরকে জিম্মি করার ক্ষমতা রাখবে।

ফ্রান্সে বর্তমানে যা ঘটছে, বহির্বিশ্বে তার প্রভাব ফেলার আরও কারণ আছে। ইউরোজোনের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি ফ্রান্স। দেশটির বাজেট ঘাটতি ইউরোপের অন্যান্য দেশের অর্থনীতিকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। একইভাবে ফরাসি সরকারের ঋণও ইউরোপকে ভাবাচ্ছে।

রয়টার্স বলছে, ফ্রান্স এখন গভীর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ম্যাক্রোঁকে এখন অবশ্যই একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইলিজি প্যালাস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় (স্থানীয় সময়) জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ম্যাক্রোঁর অনেক রাজনৈতিক বিরোধী তার পদত্যাগের জন্য ক্রমে আরও বেশি সোচ্চার হচ্ছেন। তাদের দাবি, তার পদত্যাগ দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত