পারমাণবিক বিদ্যুৎ পেতে আরও ১ বছর

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৭:০৮ এএম

সর্বশেষ পরিকল্পনায় সময়সীমা পেছানো হয়েছিল; সে অনুযায়ী দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালুর কথা ছিল এ বছর। কিন্তু বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ পিছিয়ে থাকায় এ বছরও তা হচ্ছে না। এখন আশা করা হচ্ছে, আগামী বছরের শেষ দিকে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ কথাই বলছেন।

নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু করতে না পারায় সাশ্রয়ী দামে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে; পাশাপাশি প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত সঞ্চালন লাইন নির্মাণের কাজ শেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

কেন্দ্রটি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে এখনো ক্রয়চুক্তি হয়নি। চুক্তির একটি খসড়া তৈরি হয়েছে। এটি চূড়ান্ত হওয়ার পর আগামী বছরের মাঝামাঝি সই হতে পারে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদনব্যয় ৫ থেকে সাড়ে ৫ টাকা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। বিদ্যুতের দাম যাই হোক না কেন, গ্যাস ও জলশক্তি বাদে অন্য জ্বালানির কেন্দ্রের তুলনায় তা অনেক কম পড়বে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাছান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ ৯৩ শতাংশ শেষ হয়েছে। এখন ফুয়েল (ইউরেনিয়ামপূর্ণ দ-) লোড করা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সঞ্চালন লাইন দরকার। কারণ এটি অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো নয়। ফুয়েল লোড করার আগে সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত থাকতে হবে। না হলে নিরাপত্তার কারণে ফুয়েল লোড করার অনুমতি দেবে না আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। ফুয়েল লোড করার পর এর রিঅ্যাকশন শুরু হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য লাইনের অপেক্ষায় বসে থাকা যাবে না।’ তিনি বলেন, ‘মার্চে সঞ্চালন লাইন হলে ফুয়েল লোডিং ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে আরও পাঁচ-ছয় মাস সময় লেগে যাবে।’

পাশাপাশি দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও এগিয়ে চলছে জানিয়ে জাহেদুল বলেন, ‘এটির কাজ ৭০ শতাংশের বেশি শেষ হয়েছে। প্রথম ইউনিট চালুর এক বছর পর চালু হবে দ্বিতীয় ইউনিট। সঞ্চালন লাইনের কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজও পিছিয়ে যাচ্ছে।’

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ফুয়েল লোড করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে তিন মাস লাগবে। আস্তে আস্তে উৎপাদন বাড়াতে হবে। পূর্ণ ক্ষমতায় যেতে আরও সাত মাস লাগবে। সব মিলে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে ১০ মাস সময় লাগবে। এ হিসেবে আগামী বছরের শেষে আংশিক বিদ্যুৎ মিললেও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে ২০২৬ সাল নাগাদ।

রূপপুর কেন্দ্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। প্রতিষ্ঠানটির দুজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রথম ইউনিটের জন্য যে সঞ্চালন লাইন দরকার, তা আগামী মার্চে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এক মাস পেছাতেও পারে। চেষ্টার কোনো কমতি হচ্ছে না।

দ্বিতীয় ইউনিটের সঞ্চালন লাইনের কাজ শেষ হবে এরও এক বছর পর, অর্থাৎ ২০২৬ সালের মার্চে। ২০১৮ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়া এ লাইনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালের মধ্যে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্বালানির সংকট মোকাবিলা, জ্বালানি রূপান্তর ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার্থে পারমাণবিক বিদ্যুতের বিকল্প নেই। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে দীর্ঘ মেয়াদে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এটির নির্মাণে সময় বেশি লেগে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নে যত দেরি হবে, ততই কর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় বাড়বে। সাশ্রয়ী দামে বিদ্যুৎ উৎপাদন যত আগে শুরু হবে, ততই রাজস্ব আয়ে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং দেশের বিদ্যুৎ সংকট কমবে। যত দেরি, তত ক্ষতি। আগামী বছরের মধ্যে এ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু না হলে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়বে।’

রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ২০২৩ সালে ও দ্বিতীয় ইউনিটে ২০২৪ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ছিল। পরে সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রথম ইউনিটের উৎপাদন শুরুর সময় নির্ধারণ করা হয়।

চুক্তি অনুসারে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও খরচ বাড়াতে পারবে না ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া ‘চুক্তি রিভিউ’ করার কারণে কমিটমেন্ট ফি বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে কোনো জরিমানা দিতে হবে না।

রূপপুর প্রকল্পের খরচের জন্য বছরে বরাদ্দ করা মোট অর্থের ১০ শতাংশ দিতে হয় বাংলাদেশ সরকারকে। ডলার সংকটের কারণে এটি নিয়মিত পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এতে ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার জরিমানা হয়। যদিও তা মওকুফ করে দিয়েছে রুশ ঠিকাদার। কাজে গতি আনতে ডলারের পরিবর্তে টাকায় বিল পরিশোধের বিষয়ে মূল চুক্তির অধীন একটি অতিরিক্ত চুক্তি হয়েছে।

ধীর গতিতে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন : পিজিসিবি সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য রূপপুর-বগুড়া ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। রূপপুর-গোপালগঞ্জ ৪০০ কেভি সঞ্চালন লাইনের স্থলভাগের কাজ শেষে এখন চলছে পদ্মা রিভার ক্রসিংয়ের কাজ। এটির ৫০ শতাংশের বেশি কাজ হয়েছে। আগামী মার্চে এ লাইনের পুরো কাজ শেষ করার কথা রয়েছে।

প্রাথমিক পর্যায়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন প্রস্তুতির জন্য যে বিদ্যুৎ লাগে, তাকে ব্যাকফিড পাওয়ার বলে। এই বিদ্যুৎ দিতে রূপপুর-বাঘাবাড়ী ২৩০ কেভি সঞ্চালন লাইনের কাজ ২০২২ সালের জুনে শেষ করেছে পিজিসিবি। কিন্তু বিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ব্যাকফিড নেওয়া শুরু করেছে এ বছর। এ লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালনও করা যাবে।

কালিয়াকৈর-আমিনবাজার ৪০০ কেভি লাইনেরও স্থলভাগের কাজ শেষ হয়েছে। রূপপুর-ধামরাই (২৩০ কেভি) ও রূপপুর-ঢাকা (৪০০ কেভি) সঞ্চালন লাইনের স্থলভাগের কাজ এ মাসে শেষ হবে। এই দুই লাইনের রিভার ক্রসিংয়ের কাজ ২০২৬ সালের মার্চে শেষ করবে পিজিসিবি। তখন দ্বিতীয় ইউনিটের বিদ্যুৎ সঞ্চালন করতে আর বাধা থাকবে না।

পিজিসিবির একজন কর্মকর্তা জানান, ‘গত এপ্রিলে পদ্মা রিভার ক্রসিংয়ের কাজ শেষ করার পরিকল্পনা থাকলেও ভারত ফারাক্কা বাদ খুলে দেওয়ায় নদীর পানি অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে তা সম্ভব হয়নি। এ মাসে পদ্মা রিভার ক্রসিংয়ের কাজ শেষে যমুনার ক্রসিংয়ের কাজ শুরু হবে।’

যেসব কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীর গতি : ২০১৮ সালের এপ্রিলে সঞ্চালন লাইনের কাজ শুরুর কথা থাকলেও অর্থায়ন এবং অন্যান্য জটিলতায় কাজ শুরু হয়েছে প্রায় তিন বছর পর। ডলার সংকটের কারণে পণ্য আমদানির ঋণপত্র খোলা ও ঠিকাদারের অগ্রিম প্রদানে দেরি হয়েছে। পদ্মা ও যমুনা রিভার ক্রসিংয়ের কাজও কিছুটা চ্যালেঞ্জে ফেলেছে। সঞ্চালন লাইন নির্মাণে নিয়োজিত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ধীর গতির কারণেও কিছুটা দেরি হয়েছে।

আবার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন নির্মাণকাজের ভারতীয় ঠিকাদার চলে যাওয়ায় পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর নির্মাণাধীর বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কাজ বেশ কিছুদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

করোনা মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক কারণেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। যুদ্ধের কারণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রভাব রূপপুরে পড়েছে। রাশিয়া থেকে রূপপুরের পণ্যবাহী জাহাজ আসা নিয়েও জটিলতা ছিল।

গত বছরের ৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের হাতে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান তুলে দেয় রাশিয়া। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক স্থাপনার স্বীকৃতি পায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। ৩৩তম সদস্য হিসেবে পারমাণবিক ক্লাবে যুক্ত হয় বাংলাদেশ। প্রথম ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি এখন রূপপুরে মজুদ আছে।

২০১৩ সালের ২ অক্টোবর রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজ উদ্বোধন করা হয়। মূল কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পাবনার ঈশ^রদী উপজেলার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়। ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। কেন্দ্রে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট থাকছে। এটির নির্মাণ করছে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত