সিলেটের আরেক সম্ভাবনাময়ী পেসার ইমন

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৩:৫৬ পিএম

দেশের ক্রিকেটে গত কয়েক বছর ধরে পেস বিপ্লব ঘটিয়েছে সিলেট বিভাগ। এবাদত হোসেন, সৈয়দ খালেদ ও রেজাউর রহমান রাজার পর উঠে আসছেন আরেকজন। যিনি ইতোমধ্যে মাতিয়েছেন যুব এশিয়া কাপ। তার সুইংয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তানের ব্যাটসম্যানরা। হয়েছেন সেই টুর্নামেন্টের সেরা ক্রিকেটার। যা দিয়ে তিনি জানিয়ে দিলেন আগমনীর বার্তা। সেই পেসারের নাম ইকবাল হোসেন ইমন।

দুবাইতে যুব এশিয়া কাপের ফাইনালে চার উইকেট হারানোর পরও যুবাদের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ছিল ভারতের। তবে তাদের ভুলগুলো ড্রেসিংরুমে বসে ঠিকই ধরে ফেলেছিলেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের কোচ নাভিদ নেওয়াজ ও সহকারী কোচ তালহা জোবায়ের। ম্যাচের ২১তম ওভারে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে যখন মাঠে নামলেন নিখিল কুমার, তখন ছিল পানি পানের বিরতি। এমন সময় দুই কোচ ছোটো এক বৈঠক করেন অধিনায়ক আজিজুল হাকিম তামিমের সঙ্গে। সেই বৈঠকের পরই বদলে যায় লাল সবুজদের বোলিং আক্রমণ। পেসাররা এরপর চতুর্থ স্টাম্প বরাবর বল করতে থাকেন। একে একে আসতে থাকে সাফল্য। শেষ পর্যন্ত এই লাইনে বল করেই টানা দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের শিরোপা ঘরে তুলেছে বাংলাদেশের যুবারা।

কোচ আর অধিনায়কের সেই বৈঠকে কী কথা হয়েছিল? জবাবটা ম্যাচ শেষে দিয়েছিলেন অধিনায়ক তামিমই। তিনি বলেছিলেন, ‘ভারতের ব্যাটসম্যানরা অফসাইডে একটু লড়াই করছিল। আমাদের কোচরা বলেছিলেন চতুর্থ বা পঞ্চম স্টাম্প বরাবর বল করতে। পরিকল্পনা ছিল, অফসাইডে বোলিং করে তাদের ঝামেলায় ফেলা।’

এক্ষেত্রে টানা একই জায়গায় সবচেয়ে বেশি বল করতে দেখা গিয়েছিল ইকবাল হোসেন ইমনকে। পেয়েছেন সফলতাও। করিডোর অব আনসার্টিনিটিতে টানা বল করে শেষ দুই বাহাতি ব্যাটসম্যানের উইকেট আদায় করেছেন তিনি। ঝুলিতে ৩ উইকেট নিয়ে ভারতের ব্যাটিং অর্ডারে রীতিমতো ধস নামিয়ে দেন তিনি। ফলে বাকি কাজটা সহজেই সেরে ফেলেন অধিনায়ক তামিম। শেষ তিন উইকেট শিকার করে বাংলাদেশকে এনে জেতান এশিয়া কাপের শিরোপা। ইমন জিতেছেন ফাইনাল সেরার পুরস্কার। পাশাপাশি ১৩ উইকেট নিয়ে হয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা ক্রিকেটারও।

এই করিডোর অব আনসার্টিনিটি পয়েন্টে বল যাওয়া মানেই ব্যাটারদের জন্য দুর্বোধ্য একটা বিষয়। কোন দিকে শট খেলবেন সেটা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান তারা। সেটাই ফাইনালে ইমন করে গেছেন। শুধু ভারতের বিপক্ষেই নয়। সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষেও তিনি একই জায়গায় বল করে গেছেন ধৈর্য ধরে। সেই ধৈর্যের ফল তিনি পেয়েছেন উইকেট শিকারের মধ্য দিয়ে। তার নিখুঁত লাইন-লেন্থ-সুইংয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন ব্যাটসম্যানরা। রান খরচের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বেশ হিসেবি। সেই ধারাবাহিতকাতাটা ফাইনালেও রাখতে পেরেছেন বলেই তার হাতে উঠেছে টুর্নামেন্টে সেরার পুরস্কার।

উইকেট শিকারের পর ইমন।

ইমন নজর কেড়েছিলেন মূলত যুব ক্রিকেট লিগ থেকে। পূর্বাঞ্চলের হয়ে একটি ম্যাচে তিনি তিন উইকেট শিকার করেছিলেন। যেখানে তার বলের ডিসিপ্লিন, পেস এবং অফ দ্যা পিচ মুভমেন্টের দক্ষতা দেখিয়েছিলেন তিনি। সেই পারফরম্যান্সের সুবাদে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে পেয়েছিলেন গাজী ট্যাংক একাডেমির হয়ে খেলার সুযোগ তবে। সব শেষ আসরটিতে অবশ্য খুব একটা নজর কাড়তে পারেননি তিনি। ৮ ম্যাচ খেলে মাত্র ৪ উইকেট নিয়েছিলেন। বেশ খরুচেও দেখা গিয়েছিল তাকে। লিস্ট এ ক্রিকেটে নিজের অভিষেক ম্যাচে আবাহনীর বিপক্ষে ৯ ওভারে ১০৪ রান খরচ করেছিলেন তিনি। অবশ্য দুটি উইকেট পেয়েছিলেন। সেটাও মোহাম্মদ নাঈম শেখ ও মাহমুদুল হাসান জয়ের উইকেট। ভুলে যাওয়ার মতো ম্যাচ হলেও উইকেটের কারণে সেটা তিনি ভুলতে পারবেন না।

দুঃসহ স্মৃতি পেছনে ফেলে মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সুইংয়ে মাত করে এশিয়া সেরা ইমনের বাড়ি সিলেটের মৌলভীবাজার জেলায়। সিলেট অঞ্চল থেকে যেমন ক্রিকেটাঙ্গন পায় পেসার, তেমনি দেশের অর্থনীতি পায় রেমিটেন্স। কারণ এখানকার বেশিরভাগ তারুণ্যের স্বপ্ন যুক্তরাজ্যের শহর লন্ডনে স্থায়ী হওয়া। পরিবারেরও ইচ্ছে থাকে সেটাই। তেমনি ইমনের মা বাবাও চাইছিলেন ছেলে পাড়ি জমাক বিলেতে। কিন্তু বাড়ির অমতে তিনি বিলেতের বিমান না ধরে বেছে নিলেন ২২ গজকে। আর সেখানেই তিনি বাজিমাত করে দেশকে করেছেন এশিয়ার সেরা।

ঐ সময়ে তিনি পাশে পেয়েছিলেন মৌলভীবাজার ক্রিকেট একাডেমির কোচ রাসেল আহমেদকে। ভরসা দিয়েছিলেন পরিবারকে। সেই রাসেল নিজেও এখন যুক্তরাজ্য প্রবাসী। শিষ্যের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে তিনি বলেছেন, ‘ইমনের এমন পারফরম্যান্স আমাদেরকে আনন্দে ভাসিয়েছে। আমার কাছে গর্বের, কারণ সে আমার ছাত্র।’

লম্বা রান আপে বল যখন ছুঁড়েন তিনি তখন পিঠে জার্সিতে লেখা ‘২ নম্বর’টা ভেসে ওঠে। যা মনে করায় মাশরাফী বিন মোর্ত্তজাকে। ফাইনাল শেষে ইমন জানালেন তিনি নিজে মাশরাফী ভক্ত। হতে চান তার মতোই দেশ সেরা পেসার। সেই বার্তাই তো দিয়ে রাখলেন ইমন।

যদিও দেশের ক্রিকেটের বাস্তবতা ভিন্ন। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে দ্যুতি ছড়ালেও বিসিবির উদাসীনতায় অনেকেই হারিয়ে গেছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বোর্ড পেসারদের বাড়তি যত্ন নিচ্ছে। তাছাড়া সিলেট থেকে আসা পেসাররা অবশ্য নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ প্রতি মুহূর্তে করে যাচ্ছেন। তাই ইমনকে নিয়ে প্রত্যাশা বাড়ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত