ইউরোপের অনেক দেশের ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের ভারত গিয়ে ভিসা নিতে হয়। কিন্তু ভারত বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সীমিত করায় অনেক শিক্ষার্থীকে বিপাকে পড়তে হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী দিল্লি গিয়ে ইউরোপের ভিসা নিতে পারছেন না। এই অনিশ্চয়তা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে সরিয়ে ঢাকায় অথবা প্রতিবেশী অন্য কোনো দেশে স্থানান্তরের অনুরোধ করেছেন। গতকাল সোমবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ অনুরোধ জানিয়েছেন।
গতকাল দুপুর ১২টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই বৈঠক হয়। ১৯ সদস্যের প্রতিনিধিদলটির নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের হেড অব ডেলিগেশন মাইকেল মিলার। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। আড়াই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠকে ১৫ জন প্রতিনিধি তাদের মতামত তুলে ধরেন। বৈঠকে শ্রম অধিকার, বাণিজ্য সুবিধা, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে উভয়ের অঙ্গীকার এবং করণীয় সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এ সময় সেখানে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিংয়ে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের বিষয়ে আমরা যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি, এ ব্যাপারে আমরা তাদের অবহিত করেছি। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। এর আগে কখনো ইউরোপীয় ইউনিয়নের এত রাষ্ট্রদূত, এত প্রতিনিধি নিয়ে কোনো সরকারপ্রধানের সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। নতুন বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে এটা একটা বড় ভূমিকা রাখবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটাবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের কিছু বাণিজ্য সুবিধা ইউরোপিয়ান বাজারে প্রাপ্তির কথা আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও কথা হয়েছে। তারা আমাদের কাছে মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। নির্বাচন নিয়ে কথা বলেছেন। শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। এর উত্তরে আমরা জানিয়েছি, প্রত্যেকটি বিষয়ই প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।’
পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, ‘নির্বাচন প্রসঙ্গে তাদের বলা হয়েছে, আমরা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে যাব। আমরা বিচারের কথা বলেছি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কথা জানিয়েছি। বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন এবং কী কী সংস্কারে তারা কাজ করছে, সে বিষয়টি তাদের জানিয়েছি।’
ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক : বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি করেন প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে। ওই বৈঠক সম্পর্কে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘ভারত বারবার বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক রয়েছে, সেটি এগিয়ে নিতে তারা আগ্রহী। আমাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে আমরা সার্ককে শক্তিশালী ভূমিকায় দেখতে চাই। আমরা একসঙ্গে বিমসটেকে আছি এবং সেটা থাকাটা জরুরি। বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের যে প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে, সেটা নিয়ে আগের মতোই উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারতে আশ্রয় নিয়ে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলছেন এবং এসব কথাবার্তা বলার কারণে একধরনের উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটার ব্যাপারে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।’ তিনি বলেন, জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সম্পর্কে যে অপপ্রচার হচ্ছে, সে বিষয়ে ভারত সরকার মোটেও দায়ী না। সরকার এটা ধারণও করে। এগুলো বিভিন্ন মিডিয়া ও সংগঠনের পক্ষ থেকে করা হচ্ছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘অপপ্রচারের জবাব লিখিত ও মৌখিক বহুভাবেই বলেছি, যতগুলো ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো সাম্প্রদায়িক দেখানোর সুযোগ খুবই কম। সেগুলো কখনো কখনো ব্যক্তিগত, বেশিরভাগই রাজনৈতিক। আমাদের স্পষ্ট অবস্থান হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার না এটির অংশ, না এটি কোনোভাবেই বরদাশত করছে। যেখানে যেখানে এ রকম অভিযোগ এসেছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সচিবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তারা সম্পর্ক জোরদার করতে চান। বিভিন্ন কারণে যে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে একটি মেঘ এসেছে, এই মেঘটি দূর করতে হবে। আমরাও বলেছি, এই মেঘটি দূর করতে হবে।’
