স্বৈরশাসনের অন্যতম কুপ্রভাব হচ্ছে ন্যায্যতা এবং জবাবদিহিতা নেই হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশও দীর্ঘ স্বৈরশাসনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই দুটি প্রায় নেই হয়ে গেছে। এর সবচেয়ে খারাপ ফলাফল দেখা গেছে অর্থনৈতিক খাতে। ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাবে খেলাপি ঋণ মহামারীর আকার ধারণ করেছে। অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থাটাও প্রায় একই রকম। শুধু যে বেশুমার খেলাপি ঋণ হয়েছে তাই নয়, এসব ঋণ সম্পর্কে সঠিক তথ্যও পাওয়া যায়নি। সত্যিকারের শোচনীয় অবস্থা কমিয়ে দেখানো হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর খেলাপি ঋণ নিয়ে ভয়াবহ সব তথ্য বেরিয়ে আসছে। মোট ঋণের ছয় ভাগের এক ভাগই খেলাপি। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে জানা গেছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। অথচ ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার যখন ক্ষমতা গ্রহণ করে তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগের টানা তিন মেয়াদে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ২ লাখ ৬২ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, এই অবস্থার আরও অবনতি ঘটবে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানান, আগামীতে খেলাপি ঋণ ২৫-৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা নিয়ে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৮২১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। গত জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। ওই সময় দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশ খেলাপি ছিল। গত মার্চে খেলাপি ঋণ ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা এবং এর আগে ডিসেম্বরে ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৬ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খেলাপি ঋণ কমার তো কোনো লক্ষণ নেই-ই, বরং বৈশ্বিক মানদ- মানলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। কত দিনের মধ্যে তা কমবে তাও অনুমান করা কঠিন। তবে একটি ভালো দিক হচ্ছে, এখন অন্তত প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। সাবেক সরকারের আমলে ব্যাংক থেকে প্রভাবশালীদের বড় অঙ্কের ঋণ দিতে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। খেলাপি ঋণ কাগজে-কলমে কম দেখাতেও নেওয়া হয়েছিল একের পর এক নীতি। এখন সেই নীতি থেকে সরে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ঋণ খেলাপের পরিস্থিতি উন্নয়নে প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে নতুন করে যেন খেলাপি ঋণ না হয় সে ব্যবস্থা নেওয়া। নতুন যেসব ঋণ দেওয়া হচ্ছে সেগুলোও যদি খেলাপি হতে শুরু করে তবে খেলাপি ঋণের নিম্নগতি আশা করা কঠিন। আর খেলাপি ঋণ কত দ্রুত এবং ক্ষিপ্রতার সঙ্গে আদায় করা যায় তার ওপর নির্ভর করছে খেলাপি ঋণ কমে আসার গতি। এজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ও তফসিলি ব্যাংক সবাইকে একত্রে কাজ করতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তরফ থেকে কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি ব্যাংকঋণের মান নির্ধারণে আবারও আন্তর্জাতিক চর্চা শুরু করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকটি। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঋণ পরিশোধ না করলে তা মেয়াদোত্তীর্ণ হিসেবে গণ্য হবে। এরপর অনাদায়ী হিসেবে ওই ঋণ ৯০ দিন পর খেলাপি হয়ে যাবে। খেলাপি ঋণের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান কঠোর করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিস্থিতি নাজুক, তবে সমস্যাকে পাশ না কাটিয়ে এর গভীরতা নির্ণয় করা ভালো ইঙ্গিত দিচ্ছে। এরপর দরকার, দীর্ঘদিনের অপচর্চা বন্ধ করে ন্যায্যতা ও জবাবদিহিতার প্রয়োগ। তা করতে পারলে, সময় লাগলেও খেলাপি ফাঁস থেকে দেশের অর্থনীতি মুক্ত হবে।
