বিশ্বরাজনীতির হালহকিকত সম্পর্কে যারা খোঁজ রাখেন, তারা ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন, ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েল সিরিয়ার সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ৫০০-এর বেশি বিমান হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, সিরিয়ার ৮০ শতাংশ কৌশলগত সামরিক সক্ষমতা তারা নিশ্চিহ্ন করতে সফল হয়েছে। এ হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে আরব দেশগুলো এবং জাতিসংঘ যথারীতি নিষ্ফলা বক্তব্য রেখেছে। হামলা বন্ধ করতে ইসরায়েলের প্রতি রাশিয়া ও ইরানের আহ্বানও প্রত্যাশিত ছিল, যা অপ্রত্যাশিত তা হলো, এ ঘটনায় মূলধারার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এবং তাদের সূত্র ধরে বাংলাদেশি পত্রপত্রিকার প্রতিক্রিয়া। ইসরায়েলের তড়িৎগতির তীব্র অভিযান দেখে তারা যে বিস্মিত হচ্ছে, সেটাই বরং আশ্চর্যের বিষয়! সিরিয়ার মানুষ কিন্তু মোটেই বিস্মিত হয়নি। ইসরায়েল যে তাদের দেশের বেশ কিছু অঞ্চল দখল করার পাঁয়তারা কষছে, তাদের মনে সেই আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছে।
আসাদের পতনে ইসরায়েলি মিডিয়াতেও হতচকিত প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। আরব বিশে^ যেকোনো তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটলে ইসরায়েলিরা সাধারণত সবার আগে বিবেচনা করে তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা-বলয়ে কোথাও ফাটল ধরল কি না। যেমন ২০১১ সালে মিসরে হোসনি মোবারকের স্বৈরশাসনের অবসানের দাবিতে আন্দোলন যখন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছিল, ইসরায়েলি টিভি চ্যানেলগুলো আরব বসন্তের ওপর লাগাতার প্রোগ্রাম প্রচার করছিল। টিভি পর্দায় হাজির হন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ১৯৬৭ ও ১৯৭৩ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা। কপালে ভাঁজ ফেলে উত্তেজিত কণ্ঠে তারা হুঁশিয়ার করেন, বিক্ষোভকারীরা যদি হোসনি মোবারককে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করতে সফল হয়, তারা থিতু হওয়ার পর অবশ্যই একদিন ইসরায়েলে আক্রমণ চালাবে। অথচ ইসরায়েলের ব্যাপারে মিসরের নিরস্ত্র তরুণ আন্দোলনকারীদের কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। তাদের দাবি ছিল নাগরিক অধিকার ও রুটি রোজগারের নিশ্চয়তা।
ঘটনাটা যাদের মনে আছে, সিরিয়ায় পটপরিবর্তনের পর ইসরায়েলি মিডিয়ার আচরণ তাদের কাছে অদ্ভুত ঠেকতে পারে। ইসলামপন্থি বিদ্রোহীদের ব্যাপারে ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের খুব একটা উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে না। বরং তারা যেন কিছুটা উৎফুল্ল। ইসরায়েলি টিভি চ্যানেলগুলো ১৯৭৩ সালে গোলানে সংঘটিত লড়াইয়ের কিছু সাদা-কালো ফুটেজ প্রচার করেছে বটে কিন্তু কোনো উপস্থাপক বাশারমুক্ত সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ লাগার আশঙ্কা জানায়নি।
অধিকাংশ হিব্রু পত্রিকার মতে, বাশার ক্ষমতায় টিকে ছিলেন ইরানের প্রক্সি হিজবুল্লাহর ওপর নির্ভর করে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সঙ্গে লড়াইয়ে হিজবুল্লাহ দুর্বল হওয়ার ফলে বাশারবিরোধী বিদ্রোহীদের সাফল্যের পটভূমি তৈরি হয়। সম্প্রতি এক পডকাস্টে প্রভাবশালী ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিনিধি আমোস হারেলের কাছে সঞ্চালনাকারী জানতে চান, জিহাদি মিলিশিয়া দলগুলোর পরিবর্তে সিরিয়ায় যদি একটি শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, আমাদের জন্য কি তা উত্তম হবে? হারেল জবাব দেন, প্রথমত, আমাদের কাছে কেউ করণীয় জানতে চায়নি। দ্বিতীয়ত, ১৫ বছর ধরে সিরিয়ায় কোনো শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার নেই। আসাদ যুগের অবসান ইহুদিদের জন্য মঙ্গলজনক, নাকি খারাপ হবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নয়। দেখতে হবে, ঘটনাটি ইরানকে বেকায়দায় ফেলেছে কি না। কেননা ইরানের জন্য যা খারাপ, তা ইসরায়েলের জন্য ভালো হবে।
আলেপ্পো, লাটাকিয়া ও তারতুসে ইসরায়েলি বিমান হামলার খবরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সয়লাব। তবে সোমবার থেকে সিরিয়াবিষয়ক সংবাদ ইসরায়েলি পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলে শীর্ষ খবর হিসেবে জায়গা পাচ্ছে না। গাজায় নিহত ইসরায়েলি সৈন্যদের নামধাম, হামাসের হাতে বন্দি জিম্মিদের ভিডিও বার্তা এবং তাদের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলার সর্বশেষ তথ্য পাঠক-শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে ব্যস্ত হিব্রু মিডিয়া। সিরিয়ায় সক্রিয় ইসলামপন্থি সশস্ত্র দলগুলোর ব্যাপারে ইসরায়েলের এই নির্ভার অভিব্যক্তির রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা করছেন অনুসন্ধানী গবেষকরা।
পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলের আধিপত্য বিস্তারে বাধা ছিলেন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাশার। ফলে তার বিরুদ্ধে লড়াইরত হায়াত তাহরির আল-শাম ও সিরিয়ান ডিফেন্স ফোর্সের মতো গোষ্ঠীগুলো শত্রুর শত্রু হিসেবে ইসরায়েলের পরোক্ষ সমর্থন পেয়েছে। প্রত্যক্ষ সহায়তা প্রদানের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এদিকে বুধবার ইসরায়েলের ট্যাংকবহর দামেস্কের ২০ কিলোমিটার দূরে পৌঁছে গিয়েছিল। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কখনো সিরিয়ার এত ভেতরে স্থল অভিযান চালানোর দুঃসাহস দেখায়নি। তাদের দাবি, ৭ অক্টোবরের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসবাসরত ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তারা অভিযান পরিচালনা করছে। জিহাদি গোষ্ঠীগুলো যদি বাশারের অস্ত্রভা-ার কবজা করে, তাহলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
প্রকৃত চিত্র যদিও ভিন্ন। ইসরায়েলিদের কাছে অবকাশযাপনের জনপ্রিয় গন্তব্য হলো গোলান। গত সপ্তাহে কোনো হোটেল বা বিনোদন কেন্দ্রের বুকিং বাতিল হয়নি। অধিকৃত গোলান মালভূমিতে সংঘর্ষের আশু সম্ভাবনা থাকলে আইডিএফ নাগরিকদের উদ্দেশে সতর্কতা জারি করত। অর্থাৎ বাশারকে উৎখাতে নেতৃত্বদানকারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দিক থেকে আপাতত ইসরায়েলের তেমন নিরাপত্তা ঝুঁকি নেই। তাহলে ৪৮ ঘণ্টায় ৫০০ বার বিমান হামলার কারণ কী?
সিরিয়ায় চলমান ইসরায়েলি অভিযানের নামের মধ্যে রহস্যভেদের ইঙ্গিত রয়েছে। শনিবার রাতে ইসরায়েলি সেনাপ্রধান হারজি হালেভি ‘অপারেশন বাশান অ্যারো’ শুরুর নির্দেশ দেন। বাইবেলে বাশান নামে একটি রাজ্যের উল্লেখ আছে। রাজ্যটি কেনানের অংশ ছিল। ধারণা করা হয়, দক্ষিণ সিরিয়া ও পূর্ব জর্ডান জুড়ে বিস্তৃত ছিল বাশান রাজ্যের সীমানা। হিব্রু ভাষায় ‘বাশান’ শব্দটির অর্থ সমতল বা বাঁধানো জমিন। দক্ষিণ সিরিয়ায় অবস্থিত জাবলে আল-আরব বা জাবলে আল-দ্রুজের আরেকটি নাম হলো মাউন্ট বাশান। সিরিয়ার সঙ্গে ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত চুক্তির আওতায় এই এলাকাটিকে বাফার জোন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। বাশারের পতনের পর দ্রুততার সঙ্গে ইসরায়েলি সৈন্যরা নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চলটিতে অনুপ্রবেশ করে ও দখল কায়েম করেছে। উদ্দেশ্য বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা করা।
বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার অভিলাষ: বাশার আল-আসাদ পৈতৃক সূত্রে পাওয়া তার সিংহাসনটি যেদিন হারান, সেদিনই ইসরায়েলের ডানপন্থি আইনজীবী ও মিডিয়ার পরিচিত মুখ গাই বসি টকশোতে বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য এক দারুণ সুযোগ। ইসরায়েলের উচিত হবে খুব দ্রুত সিরিয়ার যতখানি সম্ভব এলাকা দখল করে নেওয়া। সাময়িকভাবে না, ওই এলাকা পুরোপুরি আমাদের অধীনে হওয়া উচিত।’
মিসরের নীলনদ থেকে ফোরাত নদী পর্যন্ত ইসরায়েলের সীমানা বাড়ানোর পরিকল্পনা বেশ পুরনো। একশ বছর আগে জায়নবাদের জনক থিওডোর হার্জল প্রতিশ্রুত ভূমির ধারণা দেন। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে সিরিয়ার গোলান মালভূমি এবং এই সপ্তাহে হার্মন পর্বতচূড়া দখল সেই পরিকল্পনারই অংশ বলে অনেকে মনে করছেন। কেননা কথিত বৃহত্তর ইসরায়েলের সীমানার মধ্যে দামেস্কেও পড়ে। হার্মন পর্বতচূড়ায় অবস্থান নিতে পারলে মাত্র ৪০ কিলোমিটার দূরের দামেস্ক এবং হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি লেবাননের বেকা উপত্যকার ওপর ইসরায়েলি গোলন্দাজ বাহিনী সহজে নজর রাখতে পারবে।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এ ধারণাটি বেশ জনপ্রিয়। জুন মাসে আইডিএফের এক সৈন্য বৃহত্তর ইসরায়েলের মানচিত্রখচিত ব্যাজ পরে ছবি পোস্ট করার পর এ নিয়ে আরববিশে^ শোরগোল শুরু হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত এক ভিডিওতে ইসরায়েলি লেখক ও রাজনীতিবিদ আভি লিপকিনকে বলতে শোনা যায়, ‘একসময় আমাদের সীমানা লেবানন থেকে সৌদি আরব পর্যন্ত প্রসারিত হবে। তারপর ভূ-মধ্যসাগর থেকে ফোরাত অব্দি। ফোরাতের অপর পাড়ে কারা আছে? কুর্দিরা আছে। কুর্দিরা আমাদের বন্ধু। অতএব আমাদের পেছনে ভূমধ্যসাগর, সামনে আছে কুর্দিরা। লেবাননকে ইসরায়েলের ছায়াতলে থাকতে হবে।’ (মিডল ইস্ট মনিটর, ১১ জানুয়ারি ২০২৪)
নেতানিয়াহু সরকারের কট্টর ডানপন্থি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মটরিচ একাধিকবার প্রকাশ্যে বৃহত্তর ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তার অভিলাষ ব্যক্ত করেছেন। কট্টরপন্থিদের বিরুদ্ধে গিয়ে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগে নেতানিয়াহু এই মুহূর্তে কিছুটা কোণঠাসা। আসাদের পতনের পর মিডিয়ার সামনে নিজের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার সুবর্ণ সুযোগ তাই তিনি হাতছাড়া করেননি। রাশিয়ায় বাশারের পলায়ন নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তিনি ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে গোলান পরিদর্শন করেন এবং সংবাদ সম্মেলনে জোর দিয়ে বলেন, গোলান চিরকাল ইসরায়েলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে। ফিলিস্তিনের গাজা ও পশ্চিমতীর এবং লেবাননের পর সিরিয়ায় আইডিএফের স্থল অভিযানের নেপথ্যে রয়েছে সীমানা প্রসারিত করার খায়েশ। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজও সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে বৃহত্তর ইসরায়েলের ধারণা।
এদিকে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও উসমানীয় খেলাফতের ঐতিহ্য ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ফিরিয়ে আনতে সংকল্পবদ্ধ। স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর ইসরায়েল ধারণার সঙ্গে যা সাংঘর্ষিক। আসাদবিহীন সিরিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের খেলায় আমেরিকা কিংবা ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। উদ্ভূত পরিস্থিতি বলছে, সাইকস-পিকট সমঝোতার ফলে সৃষ্ট মানচিত্রের অন্তিমকাল উপস্থিত।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
