মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিন। রক্তক্ষয়ী ৯ মাস যুদ্ধ শেষে এই দিন বাংলাদেশ স্বাধীন। ওইদিন বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন। ওই দলিলে পাকিস্তানি নৌ-পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার রিয়ার-অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরিফ, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার ভাইস মার্শাল প্যাট্রিক ডেসমন্ড কালাঘানও সই করেন। আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন এ কে খন্দকার। তিনি এ সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ভারতের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় চতুর্থ কোরের কমান্ডার লে. জেনারেল সগত সিং, পূর্বাঞ্চলীয় বিমানবাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চাঁদ দেওয়ান ও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব। আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক নানা গ্রন্থে পাওয়া যায় ঢাকার এমন বিবরণ।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ছিল বৃহস্পতিবার। সকাল সাড়ে ১০টার পর সাভার-মিরপুর সড়ক দিয়ে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী বিপুল করতালি আর স্লোগান দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করতে থাকে। পথে-পথে মুক্তিকামী মানুষ মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর বিজয় উদযাপনের প্রধান সঙ্গী। একদিকে পারস্পরিক জয়োচ্ছ্বাস, অন্যদিকে হানাদার বাহিনীকে আত্মসর্মপণ করানোর প্রস্তুতি। সেদিন সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। পৃথিবীর বুকে ‘বাংলাদেশ’ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম তখন সময়ের ব্যাপার। সূর্য প্রায় ডুবি-ডুবি। পূর্ববাংলার যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর ঢাকা তখন থমথমে। শহরের আশপাশে কোথাও থেমে-থেমে যুদ্ধও চলছিল, এমনকি শহরের প্রাণকেন্দ্রেও চলছিল বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ। এমন পরিবেশের মধ্যেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ‘ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নিয়াজি। এরপরই মুক্তিযোদ্ধাদের শহরের পথে-পথে, আকাশে রাইফেলের ফাঁকা গুলি ও স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়। সন্ধ্যার পর থেকেই থমথমে ঢাকা তখন বিজয় উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়। নারী-পুরুষ-শিশু নির্বিবাদে বেরিয়ে আসে পথে। রাতভর আলো জ্বলে নির্ঘুম ঢাকা নগরীর ঘরে-ঘরে।
জেএফআর জ্যাকব তার ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ গ্রন্থে লিখেছেন যৌথ বাহিনীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আত্মসমর্পণের দায়িত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব। তিনি ভারত থেকে যশোরে এসে হেলিকপ্টার পরিবর্তন করে ঢাকা এয়ারফিল্ডে আসেন। সেখান থেকে তিনি ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিকী, কর্নেল এমএস খারা নিয়াজির সঙ্গে হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশে রওনা দেন। তারা দুপুর ১টা নাগাদ পাকিস্তানি আর্মির হেডকোয়ার্টারে পৌঁছান। এরপর আত্মসমর্পণের আনুষঙ্গিক কার্যক্রম গোছাতে শুরু করেন জ্যাকব। সেখানে কর্নেল খারা আত্মসমপর্ণের শর্তাবলি পাঠ করে শোনান। তখন নিয়াজির চোখ থেকে দরদর করে পানি পড়তে থাকে, সেই সঙ্গে ঘরে নেমে আসে পিনপতন নিস্তব্ধতা। হানাদার বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান নিয়াজির হেডকোয়ার্টারে পিনপতন নীরবতা থাকলেও, বাইরের পরিবেশ ছিল তার উল্টো। ভারতীয় বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা ঢুকছেন শহরে, পথে-পথে মানুষের ভিড় আর আনন্দ-উল্লাস। একই সঙ্গে প্রতীক্ষা আত্মসমর্পণের।
তিনি আত্মসমর্পণ প্রসঙ্গে আরও লিখছেন, ‘গার্ড অব অনার পরিদর্শনের পর অরোরা ও নিয়াজি টেবিলের দিকে এগিয়ে যান। অরোরার নিয়ে আসা আত্মসমর্পণের দলিল টেবিলের ওপরে রাখা হয়। নিয়াজি সেটার ওপর কৌতূহলী চোখ বুলিয়ে নিয়ে সই করেন। অরোরাও সই করেন। ... তখন সময় বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিট। এরপর নিয়াজি তার কাঁধ থেকে অ্যাপলেট (সেনাধিনায়কদের সম্মানসূচক ব্যাজ) খুলে ফেলেন এবং ল্যানিয়াড (ছোট দড়ি বিশেষ)-সহ পয়েন্ট ৩৮ রিভলবার অরোরার হাতে ন্যস্ত করেন। তার চোখে অশ্রু দেখা যাচ্ছে। সন্ধ্যা হয়ে আসছিল। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা তখন নিয়াজিবিরোধী ও পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান ও গালাগাল দিতে থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও মাহফুজ উল্লাহ (প্রয়াত সাংবাদিক)। রণাঙ্গনের খবরাখবর নিয়ে ‘পূর্ববাংলা’ নামে একটি পত্রিকা বের করতেন। ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তখনকার পরিবেশের কথা উল্লেখ করে গণমাধ্যমকে জানান, তিনি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের শুরু থেকে ঢাকার ইস্কাটনে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর সকালেই আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। ‘আত্মগোপন থেকে বের হয়ে দেখেন মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢুকছেন, যারা ফিল্ডে ছিলেন। যারা ঢুকছেন কৃষক, সাধারণ মানুষের সন্তানদেরই দেখলাম। যুদ্ধে কৃষক-শ্রমিক তারাই ছিলেন বেশি।
তিনি জানান, ‘পাকিস্তানিরা গুটিয়ে যাচ্ছে, রাস্তা খালি হয়ে যাচ্ছে, আর আমাদের বাঙালি সাধারণ মানুষও রাস্তায় উঁকিঝুঁকি করছে। চারদিকে থমথমে ভাব, আমার যতদূর মনে পড়ে, কারফিউ দিয়েছিল ওরা। তারপর যখন ঘোষণা হলো রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ হবে, তখন মানুষ একবারে স্রোতের মতো বের হয়ে আসছে। ঢাকার সারা শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত জুড়ে মুক্তিযুদ্ধের গানগুলো বাজছে। শহর জুড়ে আনন্দ আর আনন্দ। কেউ কেউ মিষ্টিও দিচ্ছে ঘরে-ঘরে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, তখনকার অনুভূতিটা ভাষায় বলা যায় না। উই আর সো এক্সাইটেড। ষাটের দশক থেকে আন্দোলন করতে করতে করতে ৭১ এসে মুক্তিযুদ্ধ। ‘একদিকে যেমন বিজয়ের উল্লাস, অন্যদিকে সুযোগসন্ধানীদের অরাজকতাও ছিল’, বলছিলেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আগের কদিন কারফিউ থাকলেও বিজয়ের পর ল’ অ্যান্ড অর্ডার তো নেই। সুযোগসন্ধানীরা যে যার মতো লুটপাট করেছে, বাড়িঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে।’
মোহাম্মদ হান্নান রচিত ‘ঢাকার রাজনৈতিক ইতিহাস’ গ্রন্থের তথ্য, ‘১৬ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় মেজর জেনারেল নাগরার নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনী সাভার-মিরপুর সড়ক দিয়ে বিপুল করতালি ও মুহুর্মুহু স্লোগানের ধ্বনির মধ্য দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। জেনারেল নাগরার সঙ্গে ছিল মুক্তিবাহিনীর বিভিন্ন গ্রুপ-দল। এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় জেনারেল নাগরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় নায়ক জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজির কাছে একটি চিঠি পাঠান। এতে দ্রুত পাকিস্তানি বাহিনীকে ঢাকায় আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকার বাসিন্দা রফিক আহমেদ ১৬ ডিসেম্বরের পরিবেশ সম্পর্কে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে তো আমরা জাইনা-ই গেছি, দেশ স্বাধীন হইতাছে। কিন্তু ঝামেলা তখনো আশপাশ ধরে চলছিল। ইংলিশ রোডে মারামারি হইতাছে। নয়াবাজারে তখন আগুন জ্বলতাছে। সন্ধ্যার পর পাড়া থেইকা ছোট-ছোট মিছিল হইছে। ওপরের দিকে গোলাগুলি হইছে।’
